স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের অপেক্ষা আর মাত্র ছয় দিন বাকি। নির্মাণের পুরোটা সময় জুড়েই এই সেতু ঘিরে অপপ্রচারের কমতি ছিল না।
যেমন তিন বছর আগে দেশজুড়ে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল 'সেতুতে মাথা লাগবে'। এই গুজবের জেরেই ওই সময় ছেলেধরা সন্দেহে ঢাকায় স্থানীয় জনতার অতর্কিত হামলায় প্রাণ হারান লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর গ্রামের তাসলিমা বেগম রেনু।
মেয়ের নির্মম প্রাণহানির ঘটনায় আজও কাঁদছেন নিহত রেনুর ৭৫বছরের বৃদ্ধা মা ছবুরা খাতুন। অপরদিকে মাকে আর খুজেঁ পাওয়া যাবে না সেই আক্ষেপে নানির সাথে কাঁদছেন দুই সন্তান তাহসিন আল মাহির (১৩) ও তাসমিম মাহিরা তুবা (৭)।
মায়ের মৃত্যুর পর থেকেই তুবা বড় খালার সঙ্গে ঢাকায় থাকছে। মায়ের মতো দেখতেই খালাকেই মা বলে ডাকে তুবা। এখন পড়ালেখা করছে প্রথম শ্রেণিতে। আর মাহিরকে ভর্তি করা হয়েছে ঢাকা মাইলস্টোন স্কুলে। সেখানে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছে সে।
তাসলিমা আক্তার রেনু ইডেন কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেছিলেন। ব্র্যাক এবং পরে আড়ংয়ে চাকরি করতেন। ছেলে মাহিরের বয়স যখন দেড় বছর, তখন চাকরি ছেড়ে দেন। তুবার জন্মের পর স্বামীর সঙ্গে রেনুর ছাড়াছাড়ি হয়। একলা রেনু দুই সন্তানকে সামলাতেন। রেখেছিলেন আগলেও। তাদেরকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্ন ছিলো রেনুর। সেই স্বপ্ন গুজবের কাছে হেরে গেল। তবে যেই সেতুর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে ছিল এই গুজবের আয়োজন সেই পদ্মাসেতু আজ পুরোপুরি বাস্তবতা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৯ সালে ছেলেধরার গুজবে সারা দেশে ২১টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারান পাঁচজন।
ওই বছরের ২০ জুলাই রাজধানীর উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়ে তুবাকে ভর্তি বিষয়ে তথ্য জানতে যান তাছলিমা আক্তার রেনু। সেখানে উপস্থিত কয়েকজন নারী তাঁকে ছেলেধরা সন্দেহ করলে তাৎক্ষণিক ওই এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে। মুহুর্তেই বিভিন্ন বয়সী কয়েক শ নারী-পুরুষ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়েন। উন্মত্ত জনতার হাত থেকে রক্ষা করতে রেনুকে দোতলায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। লোকজন সেখানকার লোহার গেট ভেঙে রেনুকে টেনে-হিঁচড়ে নিচে নামিয়ে এনে এলোপাতাড়ি লাথি, কিল, ঘুষি ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। সেই ঘটনায় আজও বিচার হয়নি।
আরও জানা যায়,ওই ঘটনায় রেনুর ভাগনে সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু বাদী হয়ে অজ্ঞাত ৫০০ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক আব্দুল হক ১৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট ও অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই জনের বিরুদ্ধে দোষীপত্র দাখিল করেন। ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক ফাতিমা ইমরোজ নিকার আদালতে মামলার বিচারকাজ চলছে। মামলায় এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। বিচারের রায়ের অপেক্ষা গুণছে তার পরিবার।
এদিকে রেনুর বৃদ্ধা মা ছবুরা খাতুন বলেন, তিনি তার মৃত মেয়ের নিকট যাওয়ার কথা ভাবছেন। তিনি মৃত্যু পথযাত্রী। তার পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ রেনু ছিল অতি আদরের। তার নাড়িছেঁড়া ধনকে হারিয়ে আজ তিনি নিঃস্ব। পদ্মা সেতু চালু হচ্ছে ২৫ জুন জেনে খুব খুশি হলেও গুজবে যারা তার মেয়েকে পিটিয়ে হত্যা করেছে তাদের বিচার দেখে যাওয়ার আশায় আছেন তিনি। তিনি তার মেয়ের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখে যেতে চান এমন দাবী তুলে বিচারের জন্য প্রতিশ্রুতি আশা করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে।
মামলার বাদী তাসলিমা আক্তার রেনুর ভাগনে সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু বলেন,গুজবে তার খালার প্রাণ কেড়ে নিলেও ষড়যন্ত্রকারীরা পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ থামিয়ে রাখতে পারেনি। যে পদ্মা সেতুর জন্য তার খালাকে জীবন দিতে হয়েছে, আজ সেই সেতু উদ্বোধনের ক্ষণ গণনা চলছে। ২৫ জুন তা উদ্ধোধন হবে। কাঙ্ক্ষিত সেতু উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে গুজব রটনাকারী ও তার খালার হত্যাকারীদের ফাঁসি দেখতে পারলে আরও বেশি খুশি হতেন। এছাড়া তার রেনুর খালার অবুঝ দুই শিশুসন্তানকে সান্ত্বনা দিতে পারতেন বলে সেই কথা জানান তিনি। স্বপ্নের পদ্মা সেতু পাড়ি দিতে গেলে খালার বিচার না পাওয়ার বিষয়টি আরও কষ্ট দেবে। তারা চান দ্রুত মামলাটির বিচার কার্যক্রম শেষ করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।’
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের শুরুর দিকে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজের জন্য মানুষের মাথা লাগবে বলে যে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। এ নিয়ে সারা দেশে বেশ কয়েকটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। গণপিটুনিতে প্রাণ হারান অন্তত পাঁচজন। অবশেষে পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে মানুষকে এই গুজবের ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
একাত্তর/এসএ
