নীলফামারীর সৈয়দপুরের হতদিরদ্র পরিবারের সন্তান আবুল বাশার (১৮)। শৈশব থেকেই স্বপ্ন দেখেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পড়ার। সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে দারিদ্রতাই ছিল বড় বাধা। কিন্তু হার মানেননি তিনি। নিজের অদশ্য ইচ্ছা শক্তি আর বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণায় চলতি বছর বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সফল হয়েছেন বাশার।
আবুল বাশার ভর্তি হবেন বুয়েট নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। তার শৈশবের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হওয়ায় আনন্দে আত্মহারা বাশারের পরিবারের সকলেই।
নীলফামারীর সৈয়দপুর পৌর শহরের ওয়াপদা খলিফাপাড়া মহল্লার হতদরিদ্র তসলিম উদ্দিন-বিউটি বেগম দম্পতির এক ছেলে আবুল বাশার ও এক মেয়ে তাজমিম আক্তার।
তসলিম উদ্দিন পেশায় একজন দর্জি এবং বিউটি বেগম গৃহীনি। ওই দম্পতির প্রথম সন্তান আবুল বাশার। প্রাথমিক সমাপনী, জেএসসি, এসএসসি এবং এইচএসসি সবখানেই মেধার বিকাশ দিয়েছে সে। প্রাথমিক সমাপনী, জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রত্যেকটি পরীক্ষার ফলাফলে জিপিএ-৫ পেয়েছে আবুল বাশার।
এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পড়তে ভর্তি হন সৈয়দপুর সানফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে। সেখানে থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে জিপিএ-৫ অর্জন করে বাশার। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে প্রস্তুতি নেয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির জন্য।
প্রথমে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে সে। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফলে মেধাতালিকায় ১৭০২ তম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফলে মেধাতালিকায় ষষ্ঠ তম স্থান অর্জন করে।

এরপর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রকৌশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে আবুল বাশার। পরীক্ষা শেষে প্রকাশিত ফলাফলে মেধাতালিতায় স্থান না হলেও অপেক্ষামান তালিকায় স্থান করে নেয় সে। ওই অপেক্ষামান তালিকা থেকে নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে হতদিরদ্র পরিবারের এই মেধাবী সন্তান।
আবুল বাশারের বাবা তসলিম উদ্দিন বলেন, চার সদস্যের পরিবার। পেশায় দর্জির কাজ করি। এই পেশা আমার একমাত্র সম্বল। তেমন জমি জমাও নেই শুধু মাত্র ভিটে টুকু আছে। দর্জির পেশায় যেটুকু আয় হয় তাই দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ করি। আমার সন্তান বলতে বড় ছেলে আবুল বাশার আর ছোট মেয়ে তাজমিম আক্তার।
তসলিম উদ্দিন আরও বলেন, ছেলে আবুল বাশার শৈশব থেকেই মেধাবী। তার সেই মেধাকে বিকাশিত করতে আমারা স্বামী-স্ত্রী সবসময় তাকে উৎসাহ জুগিয়েছি। তার প্রচেষ্টা, শিক্ষকদের সহযোগীতা আজ সে সফল হয়েছে। এজন্য আমি আনন্দিত।
আরও পড়ুন: অবশেষে খোলাবাজারে কমলো ডলারের দাম
মা বিউটি বেগম বলেন, সে ছোট বেলায় কাগজ কেটে ঘরবাড়ি, উড়োজাহাজসহ বিভিন্ন জিনিস বানাতো। আকাশে উড়োজাহাজ দেখলেই ঘর থেকে দৌড়ে বাহিরে এসে আকাশের দিকে তাকিয়ে উড়জাহাজ দেখতো আর বলতো; মা আমি বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবো।
বিউটি বেগম আরও বলেন, আবুল বাশার যখন ছোট তখন আমাদের সংসারে অনেক অভাব ছিল। সে যখন বলতো আমি ইঞ্জিনিয়ার হবো, তখন আমি খুব কষ্ট পেতাম। তার সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ হওয়ায় আজ আমি অনেক খুশি, জীবনের সব দুঃখ কষ্ট ভুলে গেছি।
বাবা-মায়ের জীবনসংগ্রামের স্মৃতিচারণা করে আবুল বাশার জানায়, ছোটবেলা থেকেই দারিদ্রতার সাথে লড়াই করে বেড়ে ওঠেছি। বাবা-মা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন। সকাল হলে বাবা চলে যান কাজে, আর মা সংসারের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। যদিও আমাদের অভাবের সংসার। কিন্তু বাবা-মা কখনই আমার পড়ালেখায় সামান্য বাধাগ্রস্ত হতে দেননি।
আরও পড়ুন: করোনা: ২৪ ঘণ্টায় একজনের মৃত্যু
বাশারের কথায়, অর্থাভাব ও শত কষ্টের মাঝেও নিজেকে প্রস্তুত রাখার সাহস জুগিয়েছেন। তাদের অনুপ্রেরনায় নিজেকে প্রস্তুত করেছি। আমি শৈশব থেকেই স্বপ্ন বুনেছি, বুয়েটে ভর্তি হবো এবং একজন প্রকৌশলী হবো। আল্লাহর মেহেরবানীতে আজ বুয়েটে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি। বুয়েটের নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হবো।
আমার এই সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের যেমন অবদান রয়েছে, তেমনি অবদান রয়েছে আমার শিক্ষকদেরও উল্লেখ করে বাশার আরও বলে, আমার এ পথে অগ্রসর হতে নানা পর্যায়ে আমাকে সহযোগিতা করছেন আমার শিক্ষকরা।
সৈয়দপুর সানফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোখলেছুর রহমান জুয়েলে বলেন, আবুল বাশারের এ সাফল্যে আমরা শিক্ষকরা সবাই অনেক খুশি ও গর্বিত। তার অদম্য ইচ্ছা শক্তিই তাকে এ সফলতা এনে দিয়েছে।
একাত্তর/আরবিএস
