গণমাধ্যমে ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ (ব্ল্যাক সুগার কেইন) এর সাফল্য দেখে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে বাজিমাত করেছেন নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ‘বরেন্দ্র অ্যাগ্রো পার্কের তরুণ উদ্যোক্তা সোহেল রানা। ইত্যেমধ্যে জেলায় ব্ল্যাক সুগার কেইন চাষ করে সারা ফেলেছেন।
জেলার বিভিন্ন উপজেলার পাশাপাশি বিভিন্ন জেলার এই আখ চাষে আগ্রহীরা পরামর্শের পাশাপাশি চারা সংগ্রহ করছেন।
ব্ল্যাক সুগার কেইনের রঙ কিছুটা কালো খয়েরি। দেশীয় আখের মতো হলেও রয়েছে বেশকিছু ভিন্নতা। এ আখের কাণ্ড নরম, রস বেশি, মিষ্টি বেশি। লম্বায় সাধারণত ১২-১৬ ফুট হয়ে থাকে। জৈব সার এবং গোরায় পানি রাখলেই দ্রুত বেড়ে ওঠে। কীটনাশকের তেমন প্রয়োজন হয় না।
জানা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে ফিলিপাইনের ব্ল্যাক সুগার কেইন জাতের জয়পুরহাট জেলা থেকে ৮শ’ বীজ সংগ্রহ করেন। সেই বীজ থেকে নতুন করে গজে ওঠা চারা আবার রোপণ করে সাফল্য পান তিনি।
সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, উপজেলার গোডাউনপাড়া এলাকায় প্রায় ১৩৫ বিঘা জমিতে ‘বরেন্দ্র অ্যাগ্রো পার্ক’ নামে একটি মিশ্র ফলবাগান গড়ে তুলেছেন সোহেল রানা। তার এই বাগানে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির ফল চাষ করে সফলও হয়েছেন তিনি। এবার তিনি চাষ করেছেন ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ (ব্ল্যাক সুগার কেইন)। বর্তমানে তার বাগানের চলাচলের রাস্তার দুই ধারে লাগানো ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ এখন তার বাগানে শোভা পাচ্ছে।
আখ লম্বায় বড় হওয়ায় যেন ভেঙে না যায় সে জন্য বাঁশ, সুতা দিয়ে মাচা তৈরি করে আটকে রাখা হয়েছে। আখগুলো সাধারণভাবে দেখতে দেশীয় আখের মতো হলেও ভিন্নতা রয়েছে। গোড়া থেকে পুরো কাণ্ডই মোটা ও নরম। আঙুলে একটু চাপ দিলে রস পাওয়া যায়। রস যেমন রয়েছে, তেমনি মিষ্টিও বেশি। আখের গায়ের রঙ কালো হলেও ভেতরের রঙ সাদা। লালচে বা কালো খয়েরি বা কালো রঙের আখটি চাষের পর আশপাশের গ্রামের লোকজন দেখতে ভিড় করছেন। অনেকে এই আখ চাষের কৌশল ও চারা নেওয়ার জন্য আগ্রহ দেখাচ্ছেন। অনেকে খাওয়ার জন্যে নিয়ে এসেছেন।
উদ্যোক্তা সোহেল রানা জানান, বিভিন্ন টিভি-পত্রিকায় দেখে মূলত তিনি ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ (ব্ল্যাক সুগার কেইন) চাষের উদ্যোগ নেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর প্রায় দুই বছর আগে জয়পুরহাট থেকে ফিলিপাইনের ব্ল্যাক সুগার কেইন জাতের ৮০০ চারা সংগ্রহ করেন। সেখান থেকে প্রায় ৫ হাজারের মত চারা তৈরি করেন। সব চারা তিনি বাগানে পায়ে হাঁটা পথগুলোতে রোপণ করেছেন। গড়ে সাড়ে চার বিঘার মতো হবে। বর্তমানে প্রতিটি আখ বাগান থেকে পাইকারি ৫০ টাকা ও খুচরা ৬০-৭০ টাকা করে বিক্রি করছেন। অল্প খরচে বেশি লাভজনক হওয়ায় নতুন করে এক বিঘা জমিতে চাষ সম্পন্ন হয়েছে। অন্য ফল-ফলাদির গাছ কেটে আরো দুই বিঘার মাটি আখ চষের জন্যে তৈরি করা সম্পন্ন হয়েছে।
এ আখের কাণ্ড নরম, রস বেশি ও মিষ্টি বেশি। আঙুলে একটু চাপ দিলে রস পাওয়া যায়। অন্য ফসলের চেয়ে এই আখ চাষ লাভজনক। তেমন কোন খরচ হয় না। শুধু জৈব সার ও নিয়মিত পানি দিয়ে পরিচর্যা করলেই ভালো করা সম্ভব। রোগবালাই কম। একেকটি আখ থেকে ৫ কেজি থেকে ৬ কেজি রস পাওয়া যায়। লম্বায় সাধারণত ১২-১৬ ফুট হয়ে থাকে। এই আখের সবচেয়ে আরো ভালো দিক হলো, কাণ্ড নরম হওয়ায় বৃদ্ধরাও খেতে পারেন।
সোহেল বলেন, আখ চাষের জন্য সবচেয়ে বেলে-দোআঁশ মাটি উপযুক্ত। কিন্তু আমাদের এলাকার মাটি লাল-এটেল হওয়ার পরেও খুব ভালো হয়েছে। আগামীতে বাগানের চলাচলের রাস্তার দুইপাশে আরো বেশি পরিমাণে এই আখ চাষ করবো। এছাড়াও অনেকে খবর পেয়ে এই আখ দেখতে আসছেন। দেখে ভালো লাগায় অনেকে কিভাবে চাষ করা যায় পরামর্শ নিচ্ছেন ও চারা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। ইতোমধ্যে চারা তৈরি করে বিক্রি করছি। অনেক বেকার যুবক এই আখ চাষ করে লাভবান হতে পারবেন।

বাগানে কথা হয় পাশের পত্নীতলা উপজেলার বনগ্রামের ছালাউদ্দিনের সাথে। তিনি জানালেন, তার নাতিরা এই আখ খাওয়ার জেদ করলে তিনি কিনতে এসেছেন। দুটি ৭০ টাকা দরে কিনে নিয়েছেন। সেই সাথে তার কিছু এক ফসলি জমিতে চাষ করার জন্যে পরামর্শও নিয়েছেন।
সোহেলের কাছ থেকে আখের চারা নিয়ে এসেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবপুর উপজেলার সোনা মসজিদ এলাকার আসিফ উদ্দিন। তিনি জানালেন, তাদের এলাকায় প্রচুর দেশীয় আখ চাষ করা হয়। তবে সেগুলো চাষে তেমন লাভ হয়নি। এমতাবস্থায় ব্ল্যাক সুগার কেইন চাষের লাভের বিষয়টি গণমাধ্যমে জানতে পেরে তিনি প্রথম অবস্থায় তার ৫ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিক ভাবে এই আখ চাষের জন্যে চারা নিতে এসেছেন। প্রতিটি আখ ৫০ টাকা দরে কিনেছেন। আগামীতে চারা তৈরি করে আরো ৫ বিঘায় চাষের পাশাপাশি বিক্রি করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
আরও পড়ুন: কলা বাগান থেকে অটোরিকশা চালকের মরদেহ উদ্ধার
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু হোসেন জানান, সোহেল রানা একজন সফল উদ্যোক্তা। তিনি তার বাগানে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ফল চাষ করে সফলও হয়েছেন। এবার তিনি ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ চাষেও সফল। অন্য চাষিরাও চাইলে এই আখ চাষ করে বাণিজ্যিকভাবে সফল হতে পারেন। কেউ নতুন এ জাতের আখ চাষে করতে ইচ্ছুক প্রকাশ করলে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।
একাত্তর/আরএ
