দীর্ঘ এক মাস পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালত চত্বরে পা পড়লো আইনজীবীদের। জেলা আইনজীবী সমিতি জানিয়েছে, রোববারের (১২ ফেব্রুয়ারি) সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নারী ও শিশু-১ আদালতের বিচারক ছুটিতে যাওয়ায় তাদের কর্মসূচি প্রত্যহার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিন, সকাল থেকে জেলা জজ আদালত ও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতও চিরচেনা রূপে ফিরেছে। বিচারাঙ্গনে ছিল বিচারপ্রার্থীদের ভিড়।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, বর্তমানে আদালত স্বাভাবিকভাবে চলছে। এছাড়াও আইনমন্ত্রী জেলা জজের বিষয়ে নমনীয় হতে বলায় সাধারণ সভায় সে বিষয়টি বিবেচনা করে আইনজীবীরা আদালত বর্জন প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

এদিকে একই দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনজীবীদের একহাত নিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালতটি বলেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতি দেশের আইন ইতিহাসে কালো দাগ সৃষ্টি করেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মোহাম্মদ ফারুককে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও অশালীন আচরণের ঘটনার তিন আইনজীবী তলবে হাজির হলে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিল সমন্বয়ে গঠিত একটি হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ এই মন্তব্য করেন।
আদালতে তিন আইনজীবীর পক্ষে ছিলেন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মোমতাজ উদ্দিন ফকির, সম্পাদক আবদুন নূর দুলাল, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা।
আদালতে মোমতাজ উদ্দিন ফকির বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিষয়টির শান্তিপূর্ণ ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে। আজ থেকে সব কোর্ট চলছে। আমাদের আরো কিছু কাজ আছে। সবকিছুর সমাধান হবে আমাদের এক মাস সময় দেন।

এ সময় আদালত বলেন, কিছুই হয়নি। হাইকোর্টে এটার তারিখের আগে ওখানে একটু নাড়াচাড়া করেন। আমরা বুঝি। দিন যাচ্ছে আর টাইম নষ্ট করছেন। এটার (কনসিকুয়েন্স ফেস) পরিণতি ভোগ করতে হবে। আপনারা (রুলের) জবাব দিলে দেন, না দিলে না দেন। আমরা আমাদের মতো আগাবো। একটা কোর্টকে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে অচল করে রেখেছেন। সমস্ত কিছু আমরা দেখছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বার (আইনজীবী সমিতি) বাংলাদেশের লিগ্যাল ইতিহাসে কালো দাগ সৃষ্টি করেছে, সমস্ত আইনজীবীদের কলঙ্কিত করেছে।
আদালত বলেন, আইনজীবী সমিতির প্রেসিডেন্ট হোক আর সদস্য হোক, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে না। বার কাউন্সিল আছে। তবে বার কাউন্সিল কিছু না করলে আমরা এখান থেকেই করবো। প্রতিদিন আমরা খবরের কাগজে চোখ রাখি যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বারে কি হচ্ছে। আপনারা কোর্ট বর্জন করছেন করেন, কিন্তু বিচার প্রার্থীরা কোর্টে গেলে তাদের ডিস্টার্ব করা হচ্ছে থ্রেট দেয়া হচ্ছে। আপনারা একতরফা (এক্সপার্টি) গেলে আমরা (এক্সট্রিম) এ যাবো। কে বারের সভাপতি, কে বিজ্ঞ আইনজীবী তা আমরা দেখবো না। এরা বাংলাদেশে প্রাকটিস (আইন পেশা পরিচালনা) করার যোগ্য কি না সেটাও আমরা দেখবো।
উল্লেখ্য, আইনজীবীদের অভিযোগ, গত এক ডিসেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এ আইনজীবীরা মামলা দাখিল করতে গেলে বিচারক মোহাম্মদ ফারুক মামলা না নিয়ে আইনজীবীদের সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করেন।

এ ঘটনায় ২৬ ডিসেম্বর সমিতির সভা করে আইনজীবীরা এক জানুয়ারি থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক মোহাম্মদ ফারুকের আদালত বর্জনের ঘোষণা দেয়। এদিকে বিচারকের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগে চার জানুয়ারি কর্মবিরতি পালন করেন আদালতের কর্মচারীরা।
এ অবস্থায় জেলা জজ শারমিন নিগার, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক মো. ফারুক ও আদালতের নাজির মোমিনুল ইসলামের অপসারণ চেয়ে পাঁচ জানুয়ারি থেকে পুরো আদালত বর্জনের লাগাতার কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন আইনজীবীরা।
এক পর্যায়ে আইনমন্ত্রীর আশ্বাসে জেলা ও দায়রা জজ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর আদালত বর্জন অব্যাহত রেখে বাকি সব আদালতের কার্যক্রমে অংশ নেয় আইনজীবীরা।
আরও পড়ুন: প্রাথমিকে শ্রুতিকটু নাম বদল, জেলা-বিভাগে শিক্ষক বদলি এ মাসেই
তবে সাত ফ্রেব্রুয়ারি ষষ্ঠ দফায় বাড়ানো কর্মসূচির শেষ দিনেও তাদের অপসারণ না হওয়ায় আবারো সব আদালত বর্জনের ঘোষণা দেয় আইনজীবীরা। তবে বুধবার আদালতের নাজির মোমিনুল ইসলামের বদলির আদেশ হওয়ায় আইনজীবীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
১২ ফেব্রুয়ারি আইনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পরিপ্রেক্ষিতে আইনজীবীরা আদালত পাড়ায় অচলাবস্থা নিরসনে ১৩ ফেব্রুয়ারি সাধারণ সভায় মিলিত হন। সাধারণ সভার সিদ্ধান্তে অনুযায়ী তাদের দাবি পূরণ হওয়ায় তারা আদালতের সব কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।
একাত্তর/এসি
