চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে মসজিদ নির্মাণের বিষয়টি ‘গুজব’ বলে মন্তব্য করেছেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। তার দাবি, দেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করতে এ ধরণের অপপ্রচার চলছে।
রোববার (২৪ আগস্ট) দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ মিলনায়তনে বেদখল ওয়াকফ সম্পত্তি উদ্ধার বিষয়ক ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে তিনি এসব কথা জানান।
এসময় ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয় এ রকম কোনো চেষ্টা সরকার করতে দেবে না।
বৈঠকে দেশে বর্তমানে বিপুল পরিমাণ ওয়াকফ সম্পত্তি বেদখল হয়ে আছে উল্লেখ করে খালিদ হোসেন বলেন, সারাদেশের ওয়াকফ সম্পত্তি উদ্ধারে সরকার অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরমধ্যে বেশকিছু বেদখল ওয়াকফ সম্পত্তি উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া সরকার খরচ কমাতে জাহাজে করে হজযাত্রীদের পরিবহনের সিদ্ধান্ত নিলেও বড় কোনো জাহাজ কোম্পানি এগিয়ে না আসায় এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ জাহাজে করে হজযাত্রীদের আনা-নেওয়া করা গেলে ৪০ শতাংশ খরচ কমে যাবে।
ঘটনার শুরু যেখান থেকে
সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে মসজিদ নির্মাণ নিয়ে একটি তথ্য গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
মূলত সাইফুল ইসলাম নামের এক যুবকের ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করেই আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে।
বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদনে জানায়, পরে ওই যুবক এ নিয়ে বেশ কয়েকটি পোস্ট দেন। সেসব পোস্টে তিনি দাবি করেন, চন্দ্রনাথ পাহাড়ে মসজিদ নির্মাণের বিভিন্ন উদ্যোগ ও এ নিয়ে স্থানীয় আলেম সমাজের প্রতিনিধিদের সাথেও সাক্ষাৎ করেছেন।
মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে ওই যুবক লেখক ও হেফাজতে ইসলামের নেতা হারুন ইজহারের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। এই ঘটনার পরই বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মসজিদ নির্মাণের জন্য আর্থিকভাবে সহযোগিতার উদ্যোগও নিতে দেখা যায়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, সম্প্রতি একজন পর্যটক ওই পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়ার পর নামাজে লেট হয়েছিলো। যে কারণে তিনি মসজিদ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। তবে আমরা বলেছি- মন্দির এলাকায় মসজিদ নির্মাণের কোনো সুযোগ নাই।
চন্দ্রনাথ পাহাড়ের ইতিহাস
চন্দ্রনাথ পাহাড় হিমালয় হতে বিচ্ছিন্ন পূর্বাঞ্চলীয় অংশ। এ পাহাড় হিমালয়ের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ঘুরে ভারতের আসাম এবং ত্রিপুরা রাজ্যের মধ্য দিয়ে ফেনী নদী পার হয়ে চট্টগ্রামের সঙ্গে মিশেছে।
শক্তিপীঠ চন্দ্রনাথ পাহাড়
সত্যযুগে দক্ষ যজ্ঞে স্বামী মহাদেবের অপমান সহ্য করতে না পের দেহ ত্যাগ করেন সতী। পরে ক্ষুব্ধ মহাদেব সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রলয় নৃত্য শুরু করেন। তখন মহাদেবকে শান্ত করতে বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর মৃতদেহ ছেদন করেছিলেন। এই মৃতদেহের ৫১ খণ্ড হয়। সতীর একেকটি দেহখণ্ড যেখানে পড়ে, সেখানে সৃষ্টি হয় একেকটি শক্তিপীঠ। সীতাকুণ্ডে সতীর বাম হাত পড়েছিলো।
চন্দ্রনাথ পাহাড়ের শিবমন্দির
যদিও কিছু কিছু ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায়, ৮০০ বছর পূর্বে গৌরের বিখ্যাত আদিশূরের বংশধর রাজা বিশ্বম্ভর সমুদ্রপথে চন্দ্রনাথে পৌঁছার চেষ্টা করেছিলেন। সে সময় ত্রিপুরার শাসক রাজা ধন মানিক্য এ মন্দির থেকে শিবের মূর্তি তার রাজ্যে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। প্রচলিত আছে, নেপালের এক রাজা স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে পৃথিবীর পাঁচ কোণে পাঁচটি শিবমন্দির নির্মাণ করেন। এর মধ্যে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের শিবমন্দির অন্যতম। সতীর দেহখণ্ড যেসব স্থানে পড়েছিলো, সে সব স্থানে পূজিত হন মহাদেবও। একান্ন পীঠের কোনো স্থানে তিনি পূজিত হন মহাদেব আবার কোনো স্থানে পূজিত হন কাল ভৈরবসহ বিভিন্ন নামে।
সীতাকুণ্ড
পৌরাণিক কাহিনী বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ ও ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, এখানে মহামুনি ভার্গব বসবাস করতেন। সত্যযুগে অযোদ্ধার রাজা দশরথের পুত্র রামচন্দ্র তার বনবাসের সময় এখানে এসেছিলেন। রাম সীতার বনবাস এর কিছু চিহ্ন পাওয়া যায় সীতাকুণ্ডে। তারা আসবেন জানতে পেরে মহামুনি ভার্গব এখানে স্নানের জন্য তিনটি কুণ্ড (কুয়া) সৃষ্টি করেন। এরপর রামচন্দ্রের স্ত্রী সীতা এই কুণ্ডে স্নান করেন। এরপর থেকেই স্থানের নামকরণ করা হয় সীতাকুণ্ড। যেটিতে রাম স্নান করেছিলেন সেটির নামকরণ করা হয় রামকুণ্ড। রয়েছে লক্ষণ কুণ্ড ও রামের ভক্ত হনুমান জির মন্দির। তবে বর্তমানে কুণ্ডগুলো শুকিয়ে গেছে। ঐতিহাসিক কাল থেকে ইটের দেয়ালে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে এই সমস্ত পৌরাণিক স্থানগুলোকে।
পৌরাণিক স্মৃতিবিজড়িত অসংখ্য মঠ-মন্দির আছে এই পাহাড়ে। এখানে রয়েছে স্বয়ম্ভুনাথ মন্দির যা স্বয়ং (নিজেই) ভূ (মাটি) থেকে উৎপত্তি হয়েছিল। এটিকে ক্রমদিশ্বর স্বয়ম্ভুনাথ শিব মন্দিরও বলা হয়ে থাকে। মূলত এই মন্দির দর্শন করে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে আরোহন করে তীর্থযাত্রীরা। এছাড়া চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পূর্ব পাশে গহীন অরণ্যে রয়েছে পাতাল কালীবাড়ি।
