অপ্রতিম হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত তুহিনসহ তিন আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে তারা হত্যার দায় স্বীকার করলেও ঘটনার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো মিলছে না।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন বিকেল পৌনে তিনটা থেকে পরবর্তী প্রায় তিন ঘণ্টা অপ্রতিমকে আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলেও এ সময়টাতে তারা কোথায় কী করছিলো, সে সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া তুহিনের সঙ্গে ওই সন্ধ্যায় পাহাড়ে অপ্রতিমের যাওয়ার মূল কারণ নিয়েও দেখা দিয়েছে ধোঁয়াশা।
ঘটনাস্থল সানন্দা এলাকার লালমাই পাহাড় লোকালয় থেকে প্রায় ২০ মিনিটের হাঁটা পথ। জঙ্গলঘেরা এই নির্জন পাহাড়ে বিকেলের পর মূলত মাদকসেবীদের বিচরণ থাকে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সাধারণ কোনো পর্যটক বা দর্শনার্থীকে সেখানে কখনো ঘুরতে কিংবা ছবি তুলতে দেখা যায়নি। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত তুহিনের সঙ্গেই লোকালয়ে ছিলেন অপ্রতিম।
হত্যার সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে ধারণ পাওয়া যায় অভিযুক্ত তুহিনের মায়ের বক্তব্যেও। তিনি জানান, ওই দিন সন্ধ্যায় তুহিন বাসায় ফিরেছিরো, তবে রাত আটটার দিকে সে আবারও বাসা থেকে বের হয়ে যায়।
তুহিনের বিরুদ্ধে পূর্বেও অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, কৌশলে নিজের এক বন্ধুর মোটরসাইকেল ছিনতাই করেছিলো তুহিন। ওই ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হলেও পুলিশ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো ভুক্তভোগীকে ঘটনাটি চেপে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
অপ্রতিমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চে খোদাই করা তার নামের ওপর শ্রদ্ধা জানিয়ে ফুল দিয়ে রেখেছে সহপাঠীরা। অপ্রতিম বয়সে ছোট হলেও সমবয়সীদের চেয়ে জ্যেষ্ঠদের সঙ্গেই বেশি চলাফেরা করত বলে জানিয়েছে তার সহপাঠীরা।
অন্যদিকে, শোকার্ত বাবা আক্ষেপ করে বলেন, একই এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরে বেড়ে ওঠার কারণে ছোট-বডড়ো সবার সঙ্গেই অপ্রতিমের বেশ সুসম্পর্ক ও মেলামেশা ছিলো। সেই সুসম্পর্কের ইতি এমন নৃশংসভাবে ঘটবে, তা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না পরিবার।
এর আগে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে শিশু অপ্রতিম হত্যার ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন ও আসামিদের গ্রেপ্তারের তথ্য জানান কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান।
তিনি জানান, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশে নির্জন পাহাড়ি জঙ্গলে ডেকে নিয়ে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে পিটিয়ে হত্যা করা হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষকের ১৩ বছর বয়সী সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমকে।
এই ঘটনায় কুমিল্লা সিটির ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সানন্দা এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫), কোতোয়ালি থানার হাতিগাড়া এলাকার মো. কামরুল হাসান এবং আফজাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র মো. সিয়ামকে (১৯) গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পর ঘাতকেরা অত্যন্ত নির্ভার থাকে। শনিবার সকাল আটটার দিকে তুহিন, আনাস ও ফাহিম নামের কয়েকজন অপ্রতীমের বাসায় গিয়ে তার ক্রন্দনরত মা ড. নাহিদা বেগমকে সান্ত্বনা পর্যন্ত দেয়। সেখান থেকে ফিরে তুহিন নিজ বাসায় স্বাভাবিক সময় কাটাতে থাকে। পরবর্তীতে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে বিকেলেই তুহিনকে আটক করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রযুক্তির সহায়তায় ঢাকা ও কুমিল্লা থেকে অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করে। তুহিনের দেখানো স্থান থেকেই নিহত অপ্রতীমের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ।
