বিশ্বজুড়ে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত লাখ লাখ রোগী এখন কোনো ঝুঁকি ছাড়াই কেমোথেরাপি এড়াতে পারবেন। আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত বিশেষ একটি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকেরা নির্ধারণ করতে পারবেন, কোন রোগীর জন্য কেমোথেরাপির প্রয়োজন আছে আর কার জন্য নেই। এর ফলে রোগীরা কেমোথেরাপির মারাত্মক সব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে রেহাই পাবেন। খবর বিবিসির।
শনিবার (৩০ মে) যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বের বৃহত্তম ক্যান্সার সম্মেলন ‘আমেরিকান সোসাইটি অফ ক্লিনিক্যাল অনকোলজি’-এর বার্ষিক সভায় এই যুগান্তকারী গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করার কথা রয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত অংশগ্রহণকারীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি রোগীর ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি ছাড়াই শুধু হরমোন থেরাপির মাধ্যমে সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব। এর ফলে রোগীরা কেমোথেরাপির কারণে সৃষ্ট ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, চুল পড়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং প্রজনন সংক্রান্ত জটিলতার মতো মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক ধকল থেকে মুক্তি পাবেন।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং থাইল্যান্ডের ৪০ বছরের বেশি বয়সী চার হাজারেরও বেশি নতুনভাবে শনাক্ত হওয়া স্তন ক্যান্সার রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো।
বিজ্ঞানীরা এই ট্রায়ালে ‘প্রোসিগনা’ নামক একটি বিশেষ জিন পরীক্ষা ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে স্তন ক্যান্সারের বৃদ্ধিতে জড়িত ৫০টি জিনের কার্যকলাপ পরিমাপ করে রোগীর শরীরে ক্যান্সার পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি গণনা করা হয়।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব রোগী কম স্কোর পেয়েছেন—যা পুরো দলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ—তাদের কেমোথেরাপি দেওয়া হয়নি। এই দলের পাঁচ বছর বেঁচে থাকার হার ছিল ৯৩ দশমিক সাত শতাংশ। অন্যদিকে, চিকিৎসার অংশ হিসেবে কেমোথেরাপি গ্রহণকারী রোগীদের বেঁচে থাকার হার ছিল ৯৪ দশমিক ৯ শতাংশ, যা প্রায় কাছাকাছি।
সাধারণত স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা হয়। এরপর ক্যান্সার যেন পুনরায় ফিরে না আসে, সেজন্য নিয়মিত কেমোথেরাপির পরামর্শ দেওয়া হয়। এমনকি ক্যান্সার নিকটবর্তী লিম্ফ নোডে ছড়িয়ে পড়লেও এই চিকিৎসা দেওয়া হতো। তবে ইউসিএল জানিয়েছে, চিকিৎসকেরা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, সবচেয়ে সাধারণ ধরনের স্তন ক্যান্সারে আক্রান্তদের জন্য এই কেমোথেরাপি খুব কমই উপকারে আসে।
নতুন এই ট্রায়ালের ফলে যুক্তরাজ্যে বছরে পাঁচ হাজারেরও বেশি এনএইচএস রোগী কেমোথেরাপি এড়াতে পারবেন বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
এই ট্রায়ালে অংশ নেওয়া কার্ডিফের ৬৪ বছরের বাসিন্দা ক্যারেন বোনহ্যাম নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, এই ফলাফল অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক। ক্যান্সার নির্ণয় ও এর চিকিৎসা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এটি মানুষকে অনিশ্চয়তার জগতে ঠেলে দেয়। তবে এই পরীক্ষার কল্যাণে আমি কেমোথেরাপি এড়িয়ে কেবল রেডিওথেরাপি ও হরমোন থেরাপি নিয়ে সুস্থ আছি।
এই ট্রায়ালের প্রধান গবেষক এবং ইউসিএল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের ব্রেস্ট অনকোলজির অধ্যাপক রব স্টেইন বলেন, এই ফলাফলগুলো ক্যান্সারের আরও ব্যক্তিগতকৃত ও আধুনিক চিকিৎসার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। রোগীদের জন্য এর অর্থ হলো, অনেকেই এখন কেমোথেরাপির শারীরিক ও মানসিক বোঝা এবং দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে মুক্তি পাবেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সম্পদও আরও দক্ষভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
তবে ইউসিএল-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই পরীক্ষার ফলাফল ৪০ বছরের কম বয়সী স্তন ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সেই ফলাফল জানতে আরও বেশ কয়েক বছর সময় লাগবে।
