পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষা শেষ হবে না বাংলাদেশ পাশে থাকায়

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৪, ০৬:৩৫ পিএম

কবি ও পশ্চিমবঙ্গ কবিতা একাডেমির চেয়ারম্যান সুবোধ সরকার বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষা কোনদিন শেষ হয়ে যাবে না, কারণ পাশেই আছে বাংলাদেশ। কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলাদেশ দিবসের অনুষ্ঠানে এক সেমিনারে তিনি একথা বলেন।  

সুবোধ সরকার বলেন, অনেকের শঙ্কা ভারতের মতো এতো ভাষাভাষীর দেশে, পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষার কি হবে? কিন্তু আমি বলবো বাংলাদেশের মত একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র থাকার কারণে পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষা কোন দিন শেষ হয়ে যাবে না। যেমন ভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেঘ এসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃষ্টি দিয়ে যায় বা তার উল্টোটা হয়, ঠিক সেভাবেই একটা সাংস্কৃতিক ঢেউ সর্বক্ষন আছড়ে পড়ছে পশ্চিমবঙ্গ ও কলকাতার উপর। এই ঢেউ কেউ কোনদিন বন্ধ করে দিতে পারবে না। কোন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নেই যে এটা বন্ধ করে দিতে পারে। ভাষা তার নিজের প্রয়োজনে নিজের ঢেউ তৈরি করে নিতে পারে। সাহিত্য তার নিজের প্রয়োজনে এপারে ছুটে আসবে আবার ওপারে ছুটে যাবে। যেভাবে এপারে একটা ভালো গান তৈরি হলে তা ওপারে ছুটে যায়, তেমনি বাংলাদেশের একটা ভালো কবিতা তৈরি হলে তার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতায় পৌঁছে যায়।

শনিবার সন্ধ্যায় বইমেলা প্রাঙ্গণের এস.বি.আই অডিটরিয়ামে আয়োজিত ‘সংযোগের সেতুবন্ধন: সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্পের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে সুবোধ সরকার আরও বলেন, সেতু জোর করে তৈরি হয় না। এটা হাওড়া ব্রিজ বা পদ্মা সেতু নয় যেখানে অনেক পয়সা লাগে, অনেক লোক লাগে। সেতুটা আমাদের মধ্যেই আছে, নতুন করে সেতু তৈরি করতে হবে না।

তিনি বলেন 'কলকাতা বইমেলা এমন একটি বইমেলা যেখানে বাংলাদেশ ছাড়া কোনদিন এই বইমেলা হয়নি, কোনদিন হবেও না। আজকের দর্শকরাও যে টানে এখানে ছুটে এসেছেন, তার পেছনেও রয়েছে সেই বাংলা ভাষার প্রতি টান।

গত বছর কলকাতার নন্দনে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উৎসবের প্রসঙ্গ টেনে সুবোধ সরকার বলেন, বাংলাদেশের 'হাওয়া' ছবি দেখার জন্য শিশির মঞ্চ ছাড়িয়ে লম্বা লাইন এক্সাইড মোড়ে চলে যায়, দীর্ঘকাল পর এরকম একটি ছবির জন্য এত দীর্ঘ লাইন লম্বা লাইন দেখেছিলাম। কি করে হল? কারণ একটা ভালো কবিতা, ভালো গান বা ভালো ছবি যেটা একই ভাষার মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসেছে সেটা যতটা সংযোগ তৈরি করতে পারে তা অন্য কিছু পারে না। এপ্রসঙ্গে লিটল ম্যাগাজিনের প্রসংশা করেন তিনি। 

রামমন্দির উদ্বোধন প্রসঙ্গে সুবোধ সরকার বলেন, এই মুহূর্তে গোটা বিশ্ব একটা ঘটনার দিকে তাকিয়ে আছে। সেটা হচ্ছে রাম মন্দির। এই বই মেলা রাম মন্দিরকে চ্যালেঞ্জ। এই বইমেলা যে আসল মন্দির ও  মসজিদ।

সেমিনারে বরেণ্য সংগীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বলেন, সংযোগের সেতু বন্ধনের বিষয়টি একটু কৃত্রিম বলে আমার মনে হয়। কারণ বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭৫ সালে আমি যখন বৃত্তি নিয়ে শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় পড়তে এলাম, তখন কখনওই মনে হয় নি অন্য দেশ বা অন্য পরিবেশে এসেছি। ফলে তখন থেকেই সেতুবন্ধনের বিষয়টি ছিল না।
 
তার অভিমত 'দূরত্ব তৈরি করে এখন সেতু বাঁধা হচ্ছে। আমাদের দূরত্ব কোথায়? আমাদের মধ্যে আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭৫ থেকে আমার এই কলকাতায় আসা যাওয়া, আমার বন্ধুরা এখানে, আমার ভালো সময়, দুখের সময় কেটেছে এই বাংলায়। এক ভাষায় কথা বলে, আনন্দ, দুঃখ সব কিছুই এক। তাই দূরত্বটা একটা কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা। আসলে আমরা দূরে চলে গেছি অন্যদের কারণে। এখানকার অধিকাংশ মানুষের শেকড় বাংলাদেশ, ফলে যখন সেদেশ থেকে ঘুরে আসেন তখন তাদের মধ্যে সে সেতু থাকে না।

রেজওয়ানা বলেন, বই আমাদের সাহিত্যের প্রধান অঙ্গ। ইন্টারনেটের যুগে আর দূরত্ব বলে কিছু নেই। এই বিশ্বায়নের যুগে বাঙালিয়ানা, বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখাটাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। যেভাবে অন্য ভাষাভাষীর চাপ বাড়ছে সেখানে বাংলা ভাষা বলে আর কিছু থাকবে না। আমার আশঙ্কা একসময় রবীন্দ্রনাথকেই না হারিয়ে দিতে হয়।

এদিনের সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসাবে ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খলিল আহমদ। প্রধান আলোচক হিসেবে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, আলোচক হিসেবে ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যায়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক চিন্ময় গুহ, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, নাট্যকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন কলকাতা পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের সভাপতি ত্রিবিদ চট্টোপাধ্যায়, গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক সুধাংশু শেখর দে, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সহ-সভাপতি মাজহারুল ইসলাম প্রমুখ। 

মাজহারুল ইসলাম বলেন, কলকাতা বইমেলায় একদিনকে বেছে নেওয়া হয় বাংলাদেশ দিবস হিসাবে। সেই দিনটা কার্যত মিনি বাংলাদেশে পরিণত হয়। তার অভিমত, এখানকার পাঠকরা সেভাবে বাংলাদেশকে চিনত না। কিন্তু বইমেলায় বাংলাদেশের অংশ নেয়ার মধ্যে দিয়ে সেদেশের লেখক-সাহিত্যিকদের বেশি করে চিনতে পারছেন। আমি বলবো বই না কিনলেও নেড়েচেড়ে দেখুন তবেই সেদেশের বইয়ের সাথে পরিচিত হতে পারবেন।

সুধাংশু শেখর দে বলেন, বই মেলার শুরু থেকেই অনেক প্রকাশক আসছেন। প্রচুর বই এখানে আসছে। বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এক। দুই দেশের মধ্যে এর আদান-প্রদান টা খুব জরুরী। আমরা চাই বাংলাদেশের বইমেলাতে কলকাতা স্টল পাক। সেখানে এখানকার বই বিক্রি করা হবে। 

ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় বলেন, সাহিত্য সংযোগের মাধ্যম হতে পারে বই। এই সংযোগ শুধু তখনই হতে পরে যখন বই এর আদান প্রদান হতে পারে। আমরা চাই বইয়ের আদান প্রদান আরো বেশি হোক।
চলতি বছরই জুন-জুলাই বাংলাদেশে বাংলা সাহিত্য উৎসব ও বই মেলা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে ত্রিদিব বলেন, এখানে বইমেলার পাশাপাশি এখানকার সাহিত্যিক, লেখকরা আলোচনায় অংশ নেবেন। যাতে সেদেশে এখানকার বইয়ের ক্ষুধা মিটবে।

সাহিত্যিক ও অনুবাদক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন 'আলোচনার মধ্যে দিয়ে অবশ্যই এই সংযোগের সেতু বন্ধন হয়। বই অবশ্যই সংযোগ ঘটায়। যে কোন ভালো বই আত্ম কথনে বৃদ্ধি করে।
চিন্ময় গুহ মুক্তি যুদ্ধের কথা স্মরণ করে বলেন, আমরা সাংস্কৃতির সেতুর উপর দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের অস্ত্র বা জাদু লণ্ঠন হল বই। পৃথিবীর ইতিহাসে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র বই। আনন্দ বা জ্ঞান লাভের জন্য বউ নয়, বাঁচার জন্য বই পড়ুন। এমন বই পড়তে হবে যা আমাকে কামড়াবে, বিদ্ধ করবে। যে বই জমাট বরফ ভাঙার জন্য তৈরি হয়েছে।

নুরুল হুদা বলেন, বাংলা ভাষায় যত গ্রন্থ আছে তা অন্য ভাষায় আছে কি না জানা নেই। আমাদের একটা বিশ্ব ভাষা প্রয়োজন, সেখানে বাংলা ভাষা সে স্থান নিতে চলেছে বলে মনে হয়। সেখানেই বইমেলার স্বার্থকতা। 

রামেন্দ্র মজুমদার বলেন, ১৯৭১ সালে দুই দেশের মানুষের রক্তের মধ্যে দিয়ে নতুন করে সেতু বন্ধন রচিত হয়েছে। আমাদের দুই দেশের যে রক্তের সম্পর্ক তা মাঝে মধ্যে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। মানুষে মানুষে সম্পর্ক বাড়াতে পারলে যদি কেউ বিরুদ্ধাচরণও করতে চায় তা পারবে না। যদিও দুই দেশের সরকারের উপরেও তা নির্ভর করে। পশ্চিমবঙ্গে সাথে ত্রিপুরায় বাংলা ভাষার চর্চা বাড়ানো উচিত। ভিসা প্রক্রিয়া সরলীকরণ করার উপরও জোর দেন তিনি।

অন্যদিকে ঢাকায় বইমেলায় কলকাতা স্টল দেয়া যায় কি না, সে বিষয়ে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলবেন বলে আশ্বাস দেন খলিল আহমদ। তিনি বলেন, বইয়ের বিকল্প বই। সমাজে এক এক শ্রেণীর মানুষ এক এক ধরনের বই পড়ে। বইমেলা বৃদ্ধি করছে বইয়ের চাহিদা, একজন লেখকের জীবিকা নির্বাহের তীর্থভূমি।

উল্লেখ্য গত ১৮ জানুয়ারি এই বইমেলার উদ্বোধন করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। এবারের বই মেলার ফোকাল কান্ট্রি গ্রেট ব্রিটেন। এই বইমেলা চলবে আগামী ৩১ তারিখ পর্যন্ত। প্রতিদিন বইমেলা খোলা থাকবে দুপুর ১২ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত। 

এদিকে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বঅধরা মানবিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত রিকশা ও রিকশাচিত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন। ৩,২০০ বর্গ ফুটের এই প্যাভিলিয়নে মোট ৪৫ টি (১২টি সরকারি ও ৩৩টি বেসরকারি) স্টল আছে।

একাত্তর/এসি
প্রেমিক কিশোর, তার বাবা ও বন্ধুকে মারধর করে বিবস্ত্র অবস্থায় রাস্তায় ঘুরিয়ে চরম অবমাননা করার পর এবার পুলিশের হাতে একই কায়দায় মোক্ষম শিক্ষা পেল আসামিরা। মঙ্গলবার কলকাতার বেহালা এলাকার খুদিরাম...
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে গভীর শোকে। মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় কলকাতার চোরবাগান সার্বজনীন দুর্গোৎসবে অতিরিক্ত ভিড়, ভারী বৃষ্টি এবং মাইকে দেওয়া...
শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ মুহূর্তে রূপ নিয়েছে গভীর শোকে। শনিবার সন্ধ্যায় ভারতের কলকাতার উত্তর অংশের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পূজামণ্ডপে বৃষ্টির মাঝে অতিরিক্ত ভিড়, সংকীর্ণ যাতায়াত পথ, অন্ধাকার এবং একটি...
সাপ্তাহিক ছুটির দিন, মুষলধারে বৃষ্টি, মণ্ডপের সংকীর্ণ প্রবেশ ও প্রস্থান পথ এবং অপর্যাপ্ত আলোর বন্দোবস্ত, সব মিলিয়ে এক ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল কলকাতার উত্তর অংশের দুর্গোৎসব। শনিবার সন্ধ্যায় কলকাতার...
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি ও দেশীয় অস্ত্রের হামলায় বিএনপি নেতাসহ চারজন আহত হয়েছেন। ‘এক লাখ টাকার বিনিময়ে’ চুক্তিতে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে আটকের পর স্থানীয় জনতার কাছে...
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে পুলিশ ফাঁড়িতে নিজ কক্ষে নিজের পিস্তলের গুলিতে জাহাঙ্গীর হোসেন তালুকদার (৫২) নামের এক উপপরিদর্শক (এসআই) আত্মহত্যা করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও প্রশাসনের প্রতি ভোটারদের তীব্র অসন্তোষের ফল মিলেছে। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টিকে পেছনে ফেলে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ...
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে পূর্বাচল ৩০০ ফিট সড়কে প্রবাসীদের গাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ডাকাতরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে দুই প্রবাসীর কাছ থেকে ১৮ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইল ফোনসহ প্রায় ৪৬ লাখ...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর