বিশ্বরাজনীতির সh নিয়মনীতি ও নিষেধাজ্ঞা বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আবারও পরমাণু অস্ত্রের হুঙ্কার দিলেন উত্তর কোরিয়ার শীর্ষনেতা কিম জং উন। বৃহস্পতিবার উত্তর কোরিয়া সম্পূর্ণ নতুন একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের ছবি প্রকাশ্যে এনেছে, যা সরাসরি পারমাণবিক বোমার জ্বালানি তৈরি করতে সক্ষম।
এই গোপন আস্তানাটি পরিদর্শনের সময় কিম স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, তার দেশ এখন থেকে জ্যামিতিক বা হারে, অর্থাৎ মুড়ি মুড়কির মতো পরমাণু অস্ত্রের ভাণ্ডার বাড়াবে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের মাধ্যমে পিয়ংইয়ং কার্যত ওয়াশিংটনকে বুঝিয়ে দিল, আপাতত নিজেদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কোনো ধরণের সমঝোতার টেবিলে বসার ইচ্ছে তাদের নেই।

উত্তর কোরিয়ার সরকারি সংবাদসংস্থা কেসিএনএ বেশ কিছু হাই-প্রোফাইল ছবি প্রকাশ করেছে, যেখানে কিম জং উনকে রূপালি রঙের ঘন পাইপ এবং টিউবে ঘেরা একটি সরু করিডর দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যাচ্ছে। পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের পাইপের বিন্যাস মূলত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত ‘সেন্ট্রিফিউজ হল’-এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অন্য একটি ছবিতে কিমকে একটি মিটিং রুমে বসে থাকতে দেখা যায়, যেখানে একটি টেবিলে শঙ্কু আকৃতির একটি অস্পষ্ট গ্রাফিক নকশা রাখা ছিল; বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এটি দূরপাল্লার মিসাইলের জন্য তৈরি কোনো অত্যাধুনিক পারমাণবিক ওয়ারহেডের ডিজাইন হতে পারে।
কেসিএনএ জানিয়েছে, এই কেন্দ্রে অত্যন্ত উন্নত ও পরিশীলিত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, তবে নিরাপত্তার স্বার্থে এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান গোপন রাখা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ এটিকে একটি সক্রিয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্ট হিসেবে চিহ্নিত করে জানিয়েছে, তারা এই পরমাণু তৎপরতার ওপর নজর রাখতে মার্কিন প্রশাসনের সাথে যৌথভাবে ও নিবিড়ভাবে কাজ করছে।
উত্তর কোরিয়া এই নিয়ে তৃতীয়বার তাদের কোনো গোপন ইউরেনিয়াম কেন্দ্র জনসমক্ষে আনল। এর আগে ২০১০ সালে মার্কিন বিজ্ঞানীদের ইয়ংবিওন পরমাণু কমপ্লেক্সের একটি কেন্দ্র দেখানো হয় এবং পরবর্তীতে ২০২৪ সালে আরেকটি গোপন কেন্দ্রের ছবি প্রকাশ করা হয়। গত সেপ্টেম্বর মাসেই দক্ষিণ কোরিয়ার একত্রীকরণ মন্ত্রী দাবি করেন, উত্তর কোরিয়া বর্তমানে চারটি এই ধরণের কেন্দ্র ২৪ ঘণ্টা সচল রেখেছে।

কারখানাটি ঘুরে দেখার সময় কিম জং উন বলেন, সবচেয়ে নির্মম ও ভয়ঙ্কর শত্রুদের (আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়াকে ইঙ্গিত করে) মুখোমুখি হওয়ায় দেশের পরমাণু প্রতিরোধ ক্ষমতাকে গুণগত ও সংখ্যাগত উভয় দিক থেকেই শক্তিশালী করার তাগিদ বহুগুণ বেড়ে গেছে।
কিম আরও দাবি করেন, মাত্র ৫ বছর আগের তুলনায় উত্তর কোরিয়ার পরমাণু সামগ্রী উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও বার্তা সংস্থা এপি) জানিয়েছে, কিমের এই দাবির কোনো স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কিম দৃঢ়তার সাথে জানান, বিশ্বমঞ্চে একটি পরমাণু অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখাই তাঁর দেশের অপরিবর্তিত নীতি। কিমের এই বক্তব্য ইঙ্গিত করে যে, তিনি পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নয়, বরং উত্তর কোরিয়াকে একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে বৈশ্বিক স্বীকৃতি দিতে বিশ্বকে বাধ্য করতে চান।
পর্দার ওপারের ভূ-রাজনীতি ও ট্রাম্পের ওপর চাপ
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কিম জং উনের আসল লক্ষ্য হলো নিজেকে পরমাণু শক্তির মালিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, যাতে পরবর্তীতে তিনি জাতিসংঘের সমস্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য আমেরিকার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন।
একই সাথে তিনি পারমাণবিক সক্ষমতা আংশিক কমানোর বিনিময়ে ওয়াশিংটনের সাথে ‘অস্ত্র হ্রাস’ চুক্তির দরকষাকষিতে বসতে চান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে একাধিকবার কিমের সাথে পুনরায় কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু উত্তর কোরিয়ার বার্তা এবার পরিষ্কার, যে কোনো আলোচনার টেবিলে বসার আগে ওয়াশিংটনকে প্রথমে পিয়ংইয়ংয়ের ওপর থেকে পরমাণু মুক্ত করার জেদ ও শর্ত সম্পূর্ণ ত্যাগ করতে হবে। ২০১৯ সালে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে উত্তর কোরিয়া অনবরত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে বহু বিশ্লেষক মনে করছেন, কিমের হাতে এখন এমন আইসিবিএম বা আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা সরাসরি আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম।

সংশয় এবং পরমাণু ভাণ্ডারের আসল আকার
কিম জং উন যতই হুঙ্কার দিন না কেন, সব প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ কিন্তু উত্তর কোরিয়ার এই সক্ষমতা নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত নন। তাদের মতে, উত্তর কোরিয়া এখনও জনসমক্ষে প্রমাণ করতে পারেনি যে তাদের তৈরি ওয়ারহেডগুলো বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশের চরম উত্তাপ ও প্রতিকূলতা সহ্য করে টিকে থাকতে পারে কি না, যা একটি কার্যকর দূরপাল্লার মিসাইলের জন্য বাধ্যতামূলক।
এছাড়া, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে একটিমাত্র মিসাইলে একাধিক পারমাণবিক ওয়ারহেড জুড়ে দেয়ার প্রযুক্তি উত্তর কোরিয়া রপ্ত করতে পেরেছে কি না, তা নিয়েও বড় প্রশ্ন রয়েছে।
কিমের পরমাণু ভাণ্ডারের সঠিক আকার নিয়ে নানা রকম অনুমান রয়েছে। ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার এক শীর্ষ কর্মকর্তা আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছিলেন, উত্তর কোরিয়ার কাছে ২০ থেকে ৬০টি পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারে। তবে, বর্তমানের অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই সংখ্যাটি ইতিমধ্যেই ১০০টি ওয়ারহেড ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৩ সালে উত্তর কোরিয়া যুদ্ধের ময়দানে ব্যবহারের জন্য ছোট আকারের ট্যাক্টিক্যাল বা কৌশলগত পারমাণবিক ওয়ারহেডের প্রদর্শনী করেছিল, যা দেখে বিশ্বজুড়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে দেশটি হয়তো তাদের সপ্তম পারমাণবিক পরীক্ষাটি চালাতে যাচ্ছে।
তবে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো বিস্ফোরণ ঘটানো হয়নি; উত্তর কোরিয়া তাদের শেষ সফল ভূগর্ভস্থ পরমাণু পরীক্ষাটি চালিয়েছিল ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তবে নতুন এই ইউরেনিয়াম কেন্দ্র চালুর খবর যে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক বিরাট মাথাব্যথার কারণ হতে যাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।
