ইরাকের জলসীমায় বিস্ফোরক বোঝাই ইরানি নৌযানের হামলায় দুটি জ্বালানি ট্যাঙ্কারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে এবং একজন ক্রু নিহত হয়েছেন। বুধবার পারস্য উপসাগরে আরও চারটি জাহাজে হামলার পর এই ঘটনা ঘটল বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও ঝুঁকি মূল্যায়নকারী সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এসব কথা জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের সাথে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর ওপর এই সর্বশেষ হামলা ইরান এবং মার্কিন-ইসরাইলি বাহিনীর মধ্যে চলমান সংঘাতের এক চরম অবনতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলে আক্রান্ত জাহাজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ১৬টিতে।

পারস্য উপসাগর এবং সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালী, যা দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করা হয়; সেই পথে জাহাজ চলাচল বর্তমানে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) সোজা জানিয়ে দিয়েছে, ইরানের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল বা তাদের মিত্রদের কাছে ‘এক লিটার তেলও’ যেতে দেবে না।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরান যদি তেল রপ্তানি বন্ধের চেষ্টা করে তবে ওয়াশিংটন তাদের ওপর আরও কঠোর আঘাত হানবে। তিনি তেল কোম্পানিগুলোকে হরমুজ প্রণালী ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে দাবি করেছেন, ইরানের নৌবাহিনীর প্রায় সবটুকুই ধ্বংস হয়ে গেছে।
ইরাকি বন্দর কর্মকর্তাদের মতে, বুধবার গভীর রাতে ইরাকের কাছে আক্রান্ত হওয়া জাহাজ দুটি হলো মার্শাল আইল্যান্ডসের পতাকাবাহী ‘সেফসি বিষ্ণু’ এবং মাল্টার পতাকাবাহী ‘জেফিরস’। ইরাকের রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন সংস্থা জানিয়েছে, দুটি জাহাজই ইরাকি জলসীমার ভেতরে অবস্থানের সময় আক্রান্ত হয়েছে।

ইরাকি তেল বন্দরগুলো বন্ধ ঘোষণা
ইরাকের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, এই হামলার পর দেশটির তেল বন্দরগুলোর কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তবে বাণিজ্যিক বন্দরগুলো সচল রয়েছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, একটি জাহাজের ক্রুদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইরাকের জেনারেল কোম্পানি ফর পোর্টসের মহাপরিচালক ফারহান আল-ফারতুসি রয়টার্সকে জানান, ইরাকি নৌবাহিনী ২৫ জন ক্রুকে উদ্ধার করলেও জাহাজ দুটিতে তখনো আগুন জ্বলছিল। নিখোঁজ ক্রুদের সন্ধানে তল্লাশি চালিয়ে ইতিমধ্যে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

সরাসরি সংঘাতের ইঙ্গিত
আইআরজিসি বারবার সতর্ক করেছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী যে কোনো জাহাজ তাদের লক্ষ্যবস্তু হবে। বুধবার ভোরে থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার 'ময়ূরী নারী' যখন প্রণালীটি পার হচ্ছিল, তখন অজ্ঞাত উৎস থেকে দুটি গোলা জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে আঘাত হানে। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং তিনজন ক্রু ইঞ্জিন রুমে আটকা পড়ে নিখোঁজ রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। থাই নৌবাহিনীর সরবরাহ করা ছবিতে জাহাজের পেছনের অংশ থেকে ঘন কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে।
ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, রেভোলিউশনারি গার্ডস দাবি করেছে, জাহাজটি তাদের যোদ্ধাদের সরাসরি গুলিবর্ষণে আক্রান্ত হয়েছে। এটি সংঘাত শুরুর পর আইআরজিসির পক্ষ থেকে প্রথম সরাসরি আক্রমণের স্বীকৃতি, কারণ আগে তারা সাধারণত মিসাইল বা ড্রোন ব্যবহার করত।
এদিকে মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজ চলাচলের জন্য সামরিক পাহারার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, বর্তমানে ঝুঁকি অনেক বেশি। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে যে কোনো সময় নৌ-পাহারা দিতে প্রস্তুত।

ক্ষতিগ্রস্ত আরও তিনটি জাহাজ
বুধবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল-খাইমাহ থেকে ২৫ নটিক্যাল মাইল দূরে জাপানি কন্টেইনার জাহাজ ‘ওয়ান ম্যাজেস্টি’ সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া দুবাইয়ের উত্তর-পশ্চিমে মার্শাল আইল্যান্ডসের পতাকাবাহী ‘স্টার গুইনিথ’ নামক একটি বাল্ক ক্যারিয়ারও গোলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোরে জেবেল আলীর কাছে আরও একটি কন্টেইনার জাহাজে গোলার আঘাতে ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। সবকটি জাহাজের ক্রুরা নিরাপদ রয়েছেন বলে জানা গেছে।
