দীর্ঘ কয়েক মাসের তীব্র অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও নিজের লেবার পার্টির ক্রমাগত চাপের মুখে অবশেষে নতিস্বীকার করলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। সোমবার ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে এক আবেগঘন ভাষণে তিনি লেবার পার্টির নেতৃত্ব এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এর ফলে গত এক দশকের মধ্যে ব্রিটেন তাদের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে যাওয়ার পথে অবতীর্ণ হলো।
৬৩ বছর বয়সী এই বিদায়ী নেতা জানিয়েছেন, লেবার পার্টির নতুন নেতা এবং পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাবেন। একই সাথে তিনি তাঁর উত্তরসূরিকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

১০ ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত স্টারমার বলেন, আমার দল এখন যে প্রশ্নটি তুলছে তা হলো, পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টিকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আমিই কি সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি? আমি আমার পার্লামেন্টারি দলের সেই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি এবং অত্যন্ত সশ্রদ্ধচিত্তে তা গ্রহণ করছি। আমার নেয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল আমার ভালোবাসার দেশকে সবার আগে রাখার জন্য। আর, সেই কারণেই আমি লেবার পার্টির নেতৃত্ব থেকে ইস্তফা দিচ্ছি।
স্টারমার জানান, সোমবার সকালে তিনি বাকিংহাম প্যালেসে রাজা চার্লসের সাথে কথা বলে নিজের এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি লেবার পার্টির ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটিকে আগামী সেপ্টেম্বরে পার্লামেন্টের পরবর্তী অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই নতুন নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
নিজের বিদায়ী ভাষণে স্টারমার তাঁর স্ত্রী ভিক্টোরিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ভাল-মন্দ সব সময়ে ও আমার পাশে পাথরের মতো শক্ত ভরসা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। দেশের এই সবচেয়ে বড় চাকরিটি ছেড়ে দেওয়ার পর আমি এখন আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেশি সময় দেব, আমার চমৎকার স্ত্রী ভিকের একজন সেরা স্বামী হওয়া এবং আমার সুন্দর সন্তানদের একজন সেরা বাবা হওয়া, যারা আমার গর্ব ও আনন্দের উৎস।

লেবার পার্টির ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন নেতা নির্বাচনের লড়াইয়ের মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে ৯ জুলাই এবং তা শেষ হবে ১৬ জুলাই পার্লামেন্টের গ্রীষ্মকালীন অবকাশ শুরুর আগেই। এর ফলে সেপ্টেম্বরে যখন পার্লামেন্ট পুনরায় বসবে, ততদিনে ব্রিটেন এক নতুন প্রধানমন্ত্রী পেয়ে যাবে।
মূলত গত সপ্তাহে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি বিশেষ উপ-নির্বাচনে স্টারমারের দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ডি বার্নহামের বিশাল জয়ের পরেই স্টারমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে পড়ে। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক লেবার মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম মূলত স্টারমারের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার লক্ষ্য নিয়েই এই নির্বাচনে লড়েছিলেন এবং সোমবারই এমপি হিসেবে তাঁর শপথ নেয়ার কথা রয়েছে।
গত পুরো উইকএন্ড জুড়েই স্টারমার তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর ভাবনায় ছিলেন এবং অবশেষে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবারই তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, স্টারমার পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন। তবে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সাথে ডাউনিং স্ট্রিটের এ বিষয়ে কোনো কথা হয়নি।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে স্টারমারের নেতৃত্বে লেবার পার্টি এক ঐতিহাসিক ও ভূমিধস জয় পেয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই লেবার এমপি এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে স্টারমারকে নিয়ে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে। নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা, ভেঙে পড়া জনসেবা সংস্কার এবং জীবনযাত্রার লাগামহীন খরচ কমাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় স্টারমার সরকার।

এর পাশাপাশি একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত স্টারমারের জনপ্রিয়তার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। বিশেষ করে কুখ্যাত জেফরি এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ ও কেলেঙ্কারিতে জড়ানো বন্ধু পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্তটি মানুষ ও দলের ভেতরে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
ফলে লেবার পার্টির উদারপন্থী ভোটাররা দলে দলে গ্রিন পার্টির দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। অন্যদিকে, নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন অভিবাসন-বিরোধী দল ‘রিফর্ম ইউকে’ দেশব্যাপী জনমত জরিপে ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়ায় লেবার পার্টির ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত নিজের দল ও গদি বাঁচাতে না পেরে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথেই হাঁটতে হলো কিয়ার স্টারমারকে।
