হিমালয় পর্বতমালায় ভয়াবহ হিমবাহ ধসের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও চীন-নেপাল সীমান্তজুড়ে স্বজনহারা মানুষের হাহাকার আর উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নেপালে এখন পর্যন্ত ১,১১৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রায় চার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ। সাধারণ এলাকায় অলৌকিকভাবে কারো বেঁচে থাকার আশা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসলেও, আকস্মিক বন্যায় ধসে পড়া জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মাটির নিচের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া কর্মীদের জীবিত উদ্ধারে তীব্র প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।

নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য আমসু কিরণ শাহী বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, সুড়ঙ্গে আটকে পড়া অন্তত ৬৩৯ জন কর্মীর অনেকেই এখনও জীবিত থাকতে পারেন বলে তারা আশাবাদী। মূলত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ভেতরের সুড়ঙ্গে শুষ্ক স্থান, পর্যাপ্ত বাতাস এবং সঙ্গে থাকা খাদ্য-পানি এক সপ্তাহ পরও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা জিইয়ে রেখেছে। বিশেষ করে 'ত্রিশূলী-৩এ'সহ প্রধান চারটি প্রকল্পের সুড়ঙ্গে অক্সিজেন সরবরাহের পাইপ ঢুকিয়ে এবং বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছে। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল যৌথভাবে এই জটিল উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছে।

এদিকে তিব্বত সীমান্তে চীনের অংশে উদ্ধার কার্যক্রম নতুন গতি পেয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জিরোং সীমান্ত ক্রসিংয়ের রাস্তাটি অবশেষে পুরোপুরি খুলে দেওয়ায় ভারী যন্ত্রপাতি, লাইফ-ডিটেক্টর ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর নিয়ে অনুসন্ধান দলগুলো মূল দুর্যোগকবলিত এলাকায় পৌঁছাতে পেরেছে। চীনা বার্তা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে কাইলাশ পর্বত ও মানস সরোবরগামী ১০৪ জন ভারতীয় এবং ৩৩ জন লাটভিয়ান পর্যটকসহ মোট ২৬১ জন বিদেশী নাগরিক রয়েছেন। বেইজিং নেপালকে সহায়তা করতে অতিরিক্ত ডিএনএ বিশেষজ্ঞ, বেয়লি ব্রিজ, ফ্রিজার ও যোগাযোগ সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জাতীয় সংসদে জানান, এই দুর্যোগ মানব সভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহতম ঘটনা। বন্যায় দেশের ৪৩১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সহায়তায় সড়ক যোগাযোগ ও ৯৫ শতাংশ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ইতোমধ্যে পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে।

অন্যদিকে, স্বজন ও ঘরবাড়ি হারানো বেঁচে যাওয়া মানুষদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে নুয়াকোট ও রাসুয়ার পাহাড়ি উপত্যকা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা 'সেভ দ্য চিলড্রেন' এক বিজ্ঞপ্তিতে সতর্ক করে জানিয়েছে, চোখের সামনে সহপাঠীদের নিয়ে স্কুলবাস ভেসে যাওয়া কিংবা ঘরবাড়ি বিলীন হতে দেখে বেঁচে যাওয়া শিশুরা চরম মানসিক ট্রমা ও তীব্র দুশ্চিন্তায় ভুগছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই বিশাল আঘাত কাটিয়ে উঠতে নেপালকে এখন দীর্ঘমেয়াদী টেকসই পুনর্বাসনের পথ বেছে নিতে হবে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
