আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য রাজনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ উপদেষ্টারা ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধকে আপাতত একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রাখার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।
হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ আলোচনার সাথে পরিচিত চারটি আলাদা সূত্র নিশ্চিত করেছে, নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইরান যুদ্ধ যাতে আরও বিস্তৃত না হয়, সে বিষয়ে একটি কৌশলগত অবস্থান নেয়ার চেষ্টা চলছে। তবে রাতভর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টা সামরিক হামলা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে।
সূত্রগুলোর মতে, ৩ নভেম্বরের ভোটের পর মার্কিন সামরিক শক্তি প্রদর্শন কিংবা হামলার মাত্রা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন হোয়াইট হাউসের নীতি নির্ধারকরা।

তবে এই মুহূর্তে ওয়াশিংটন সামরিক শক্তি প্রয়োগের বদলে ইরানের ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে ভবিষ্যতের আলোচনায় নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার কৌশল অবলম্বন করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি অব্যাহত রাখা হলেও আগামী নভেম্বর মাসের নির্বাচনই এখন তাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সামান্য। ফলে এই অজনপ্রিয় যুদ্ধ যাতে প্রতিদিনের খবরের মূল শিরোনাম না হয়ে ওঠে, সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। রয়টার্স ও ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন, যেখানে ৬৩ শতাংশ সরাসরি এর বিরোধিতা করেছেন।
বিশেষ করে যুদ্ধ ঘিরে পেট্রোল ও গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ভোটারদের চরম ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। এছাড়া একটানা সামরিক অভিযানের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে। একটি সাময়িক বিরতি সামরিক বাহিনীকে তাদের অস্ত্রের পুর্নমজুত করার সময় দেবে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তবে এই সংঘাত সীমিত রাখার কৌশল বাস্তবায়ন প্রতিদিন কঠিন হয়ে পড়ছে। বসন্ত বা গ্রীষ্মের মতো সার্বিক যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা কম হলেও, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দুপক্ষই একে অপরের ওপর হামলা চালাচ্ছে। ইরানি বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে নৌপথ ব্যাহত করে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট সামলে বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান মাঝে মধ্যেই উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও তাদের মিত্রদের সামরিক ঘাঁটি, জাহাজ এবং জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো অব্যাহত রাখবে। ফলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকেও পাল্টা জবাব দেওয়ার চাপ তৈরি হবে, যা উভয়পক্ষকে আবারও পূর্ণমাত্রার আকাশযুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে।
সম্প্রতি লারাক দ্বীপে রকেটের ওপর মার্কিন সামরিক হামলা এবং তার জবাবে জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ সংঘাতের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাছাড়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজস্ব খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্তও একটি বড় অনিশ্চয়তা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৪০ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

প্রকাশ্যে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, ইরান কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালে তাদের ওপর আরও মারাত্মক আক্রমণ চালানো হবে। যদিও পরবর্তীতে তিনি দাবি করেন যে, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং মধ্যবর্তী নির্বাচন তার সামরিক নীতির ওপর প্রভাব ফেলছে না।
সংঘাত সাত মাসে পদার্পণ করার পর মার্কিন সামরিক বাহিনীও নানা লজিস্টিক সংকটে পড়েছে। নৌ, বিমান ও পদাতিক বাহিনীর প্রধানেরা পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথকে সতর্ক করে লিখিত মূল্যায়ন দিয়েছেন যে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অন্যান্য বিশ্বজনীন ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক প্রস্তুতকারিতা চরমভাবে ব্যাহত হতে পারে।
একই সাথে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সংঘাতকে শান্ত রাখার পক্ষে মত দিলেও অর্থনৈতিক অবরোধ কার্যকর করা কতটা সফল হবে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। কারণ চীন ইতোমধ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে না নেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। ফলে সামরিক হামলা এড়িয়ে শুধু অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে ইরানকে সমঝোতায় আনা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
