ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সিপাহীজলা জেলায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাচালানবিরোধী অভিযানের সময় নজিরবিহীন এক হামলার ঘটনা ঘটেছে। চোরাচালানকারী সন্দেহে এক স্থানীয় ব্যক্তিকে আটকের জেরে গ্রামবাসীর চরম তোপের মুখে পড়েছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।
উত্তেজিত গ্রামবাসীর লাঠিপেটার জেরে এক সহকারী কমান্ড্যান্টসহ অন্তত তিন বিএসএফ জওয়ান গুরুতর আহত হয়েছেন। গত সোমবার দিবাগত গভীর রাতে সিপাহীজলা জেলার কলমচৌরা থানার অন্তর্গত আশাবাড়ি সীমান্ত চৌকির (বিওপি) কাছাকাছি এলাকায় এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে।

মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে সিপাহীজলা জেলার পুলিশ সুপার বিজয় দেববর্মা ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে জানান, সোমবার রাতে আশাবাড়ি এলাকায় সন্দেহজনক চোরাচালান কর্মকাণ্ডের অভিযোগে এক স্থানীয় ব্যক্তিকে আটক করেছিল বিএসএফ। এই ঘটনায় মুহূর্তেই ফুঁসে ওঠে আশপাশের গ্রামবাসী এবং দলবদ্ধভাবে বিএসএফ টহল দলের ওপর অতর্কিত চড়াও হয়।
উত্তেজিত জনতা শুধু জওয়ানদের ওপরই চড়াও হয়নি, বরং বিএসএফের একটি সরকারি গাড়িও ব্যাপক ভাঙচুর করে। এমনকি সীমান্তরক্ষীদের হাত থেকে তাদের সরকারি আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা চালায় হামলাকারীরা। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও মারধরে একজন সহকারী কমান্ড্যান্টসহ তিন বিএসএফ সদস্য গুরুতর আহত হন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনার পরপরই এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে পুলিশ। এ ঘটনায় তিন নারীসহ মোট নয়জন গ্রামবাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি, হামলায় সরাসরি যুক্ত আরও অন্তত ১০ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের জালে তুলতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃত নয়জনকে মঙ্গলবার স্থানীয় আদালতে সোপর্দ করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়েছে। উদ্ভূত থমথমে পরিস্থিতিতে বিএসএফের ত্রিপুরা ফ্রন্টিয়ারের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজি) প্রিন্সি রানী উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন।

এদিকে বিএসএফ জওয়ানদের ওপর এই হামলার ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মাণিক সাহা। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর যেকোনো ধরনের সহিংসতা সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য। এটিকে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় উল্লেখ করে তিনি আরও লেখেন, আইন অনুযায়ী এর কঠোর মোকাবিলা করা প্রয়োজন। জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে এবং ন্যায়বিচার বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমাদের নিরাপত্তা কর্মীরা সর্বোচ্চ সম্মান ও সুরক্ষার অধিকারী।
অন্যদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ত্রিপুরার রাজনৈতিক অঙ্গনেও শুরু হয়েছে তুমুল রারাকানি। ত্রিপুরা বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক জিতেন্দ্র চৌধুরী বিএসএফের ওপর হামলার নিন্দা জানালেও একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকার চোরাচালান নিয়ে শাসকদলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, সীমান্তবর্তী সিপাহীজলা জেলায় চোরাচালান নতুন কিছু নয়। অবৈধ এই কারবারের সঙ্গে কারা জড়িত তা সবারই জানা।
শাসকদলকে সরাসরি নিশানা করে বিরোধী নেতা আরও দাবি করেন, চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত প্রায় শতভাগ মানুষই শাসকদের প্রত্যক্ষ মদদপুষ্ট বা স্থানীয় নেতাদের ছত্রছায়ায় রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে এই ঘটনার নেপথ্য নায়কদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি-দ্য রিপাবলিক
