গল্প: আমার বাবার ভায়োলিন

আপডেট : ০২ মে ২০২২, ০৩:৩৫ পিএম

শফিক সাহেবের চোখ দুটো বার বার জলে ভরে উঠছে। দৃষ্টি অস্বচ্ছ হয়ে আসছে। তিনি কয়েকবার ফুঁপিয়ে কেঁদেও উঠলেন। বুকের ভেতরে কেমন যেনো এক ধরণের হালকা চাপ অনুভব করছেন। তীব্র ভালোলাগা আর আবেগ মিলিয়ে অদ্ভুত একটা অনুভূতি তৈরি হয়েছে তার মনের মধ্যে। গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। তিনি সেই আনন্দাশ্রুর পথে বাঁধ দেয়ার কোন চেষ্টাই করলেন না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। অদ্ভুত আলো আঁধারি। সামনে সারি সারি গাছ। লম্বা কয়েকটি গাছ দাঁড়িয়ে আছে দানবের মতো। তার ফাঁক গলিয়ে আকাশে বিশালাকৃতির এক চাঁদ দেখা যাচ্ছে। রহস্যময় চাঁদের আলোয় যেনো সবকিছু ভেসে যাচ্ছে। চাঁদের প্রতিচ্ছবি পড়েছে সামনের লেকে। মনে হচ্ছে যেনো চকচকে একটা রূপার থালা ভাসছে। শফিক সাহেব মনে মনে বার দুয়েক বললেন, ‘জীবন এত সুন্দর কেন!’

রাতের এই সময়টাতেও বাড়ির সামনের রাস্তা ধরে গাড়ির আনাগোনা থাকার কথা। কিন্তু কিযে হোল আজ; এই পথটাকে মনে হচ্ছে জনমানবহীন। জায়গাটা নিউইয়র্ক সিটির একটু বাইরে। লং আইল্যান্ডের নিউ হাউড পার্কে। বেশ সুন্দর; ছিমছাম পরিপাটি চারপাশ। ছবির মতো সাজানো।

পাশের রুম থেকে ভায়োলিনের সুর ভেসে আসছে। শফিক সাহেব মনে মনে ভাবছেন, এমন সুর এর আগে কখনো, কোনদিন শোনেননি তিনি। এই পৃথিবীর কেউ কখনো এমন সুর তোলেনি। বেণু আকুল হয়ে ভায়োলিন বাজাচ্ছে। রাতের এমন পরিবেশ; চাঁদের আলোর বন্যায় মনে হচ্ছে অন্য এক ভুবন। যেখানে কেবল সুন্দরের মেলা। শফিক সাহেব ভাবছেন, এমন আনন্দ এক জীবনে তিনি আর কখনোই পাননি। বেণু তাকে রীতিমতো চমকে দিয়েছে। মেয়েটার জন্য গভীর মমতায় বুকটা ভরে উঠেছে তার। তিনি বার বারই ভাবছেন পনেরো বছরের মেয়েটা এমন ভায়োলিন বাজানো কোথা থেকে শিখলো।

শফিক সাহেব তার মেয়ের বাজানো ভায়োলিনের সুরে ডুবে গেলেন। এর মধ্যেই মাথার মধ্যে একটা গানের কয়েকটা লাইনও ঘুরতে থাকলো, ‘ছেলেবেলার সেই বেহালা বাজানো লোকটা, চলে গেছে বেহালা নিয়ে, চলে গেছে গান শুনিয়ে’। নাগরিক কবিয়াল কবির সুমন গাইছেন দরদ দিয়ে। কোথাও তো গানটা বাজছে না। তাহলে তিনি কিভাবে শুনছেন। বুঝতে পারছেন না; আসলে কি হচ্ছে। শফিক সাহেব গুনগুন সেই সেই গানের সঙ্গে ঠোঁট মেলাতে শুরু করলেন। শফিক সাহেবের মনে এলো মেলো ভাবনা। হঠাৎ বব ডিলানের সেই মিস্টার টাম্বোরিন ম্যানের কথাও মাথায় আসে। তার মতো কাউকে যদি পাওয়া যেতো, তাহলে চাঁদের আলোয় ভাসিয়ে দেয়া এই রাতে তিনি একটা গান শুনতে চাইতেন। সঙ্গে বাজতো বেণুর বেহালা। আর তিনি বলতেন ‘হেয়, মিস্টার ট্যাম্বোরিন ম্যান, আমার জন্য একটা গান গাও। আমার ঘুম আসছে না এবং আমার কোথাও যাওয়ার নেই’।

****

বছর কয়েক আগের কথা। স্কুল থেকে ফিরে বাবার সামনে একটা কাগজ বাড়িয়ে দেয় বেণু। ‘বাবা এখানে সাইন করতে হবে। টিচার আমাকে বলেছে, অকেস্ট্রা টিমে যোগ দিতে। আমি ফ্লুট শিখতে চাই বাবা’।

শফিক সাহেব কাগজটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে দেখেন তার মেয়েটা গোটা গোটা অক্ষরে লিখে ফরমটা পূরণ করে এনেছে। পছন্দের ইন্সট্রুমেন্ট এর ঘরে লিখেছে ‘ফ্লুট’। নিজেকে মনে মনে প্রশ্ন করেন শফিক সাহেব, ‘বাঁশি শেখার আগ্রহ কোথায় পেলো মেয়েটা’?

মেয়ের দিকে তাকিয়ে তিনি হেসে বললেন, ‘বাবা ফরমটা কি এক্ষুনি সই করে দিতে হবে’?

‘হ্যাঁ দিয়ে দাও’। বেণু কখনো কখনো অস্থির ধরণের আচরণ করে। কখনো কিছু একটা বললে, এমনভাবে বায়না ধরে যেনো তার সেটা তক্ষুনি চাই। তবে মেয়েটা তার খুব লক্ষ্মীও হয়েছে। বাবা মায়ের কথা খুব শোনে। বুঝিয়ে বললে বোঝে।  সে যখন আরও ছোট ছিল তখন প্রায়ই বলতো, “মা আমাকে বুঝিয়ে বলেছে, আমি বুঝেছি”।

শফিক সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, “ফ্লুট শিখতে চাও কেন? আমি বলি কি ভায়োলিন শেখো। এটা ভালো হবে”।

ছোট্ট মেয়েটা জোড়ালো প্রতিবাদ করতে পারে না। তবে অনেকটা অবদারের সুরে বলতে থাকে, ‘প্লিজ বাবা আমি ফ্লুট শিখবো। প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ’।

image


শফিক সাহেব তখন আর কিছু বলতে পারলেন না। মেয়ের এমন আকুতির পর তার কিছু বলতেও ইচ্ছা করছে না। তবে মনের মধ্যে গোপন ইচ্ছাটাকেও চট করে ঝেড়ে ফেলতেও পারছেন না। বারবারই মনে হচ্ছে, যদি মেয়েটা ভালোবেসে ভায়োলিন শিখতো, যদি জগৎ আলো করতো তার সুরের ঝলকানি; তবে মনে শান্তি পেতেন তিনি।

কাগজে সই না নিয়েই তখনকার মতো বিদায় নিল বেণু। শফিক সাহেবের খুব খারাপ লাগছে। শোবার ঘরটা অন্ধকার করে শুয়ে নানা কিছু ভাবছেন। চোখ বন্ধ করে আছেন, তবে ঘুমাননি। এমন সময় রাবেয়া শোবার ঘরে ঢুকলেন। স্বামীর পাশে বসতে বসতে বললেন, “ঘুমিয়ে না থাকলে একটা কথা বলতাম”।

চোখ খুললেন শফিক সাহেব। ‘বলো’।

রাবেয়া বললেন ‘ভায়োলিন শেখাটা কি খুব জরুরী। মেয়েটা যা শিখতে চায়, তাই শিখতে দাও। ওকে ডেকে একথাটা বলে দাও’।

শোয়া থেকে উঠে বসতে বসতে শফিক সাহেব ডাকতে থাকেন, ‘বেণু, মা বেণু, এদিকে আয় তো’।

বেণু এসে ঘরে ঢুকলো। বাবা-মায়ের মাঝখানে এসে বসলো। ‘আমায় ডেকেছো বাবা’। এত সুন্দর করে কথা বলে মেয়েটা। আমেরিকায় বড় হচ্ছে। ইংরেজিতে পড়াশোনা করছে। কিন্তু কি সুন্দর করেই না বাংলাটা বলে। শুনলে মনটা ভালো হয়ে যায়।

শফিক সাহেব মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘তোমার যেটা শিখতে মন চাইবে, সেটাই শিখবে। সেটাই তুমি ভালো শিখতে পারবে। একদম মন খারাপ করবে না’। 

‘কি খুশি তো’? এবার রাবেয়া যোগ করেন।

খুশিতে ঝলমল করে উঠলো বেণুর মুখটা। তবে সে অবাক করে দিয়ে বাবা-মাকে বললো, ‘থাক মা ভায়োলিনই শিখি। দুটোই তো আমার জন্যে নতুন। একটা শিখলেই হলো’।

অতটুকুন মেয়ে, বড়দের মতো করে কথা বলে। শফিক সাহেব অবাক। রাবেয়াও মাঝে মাঝে ভাবে, ‘এই মেয়েটাতো অনেক বুঝতে পারে’। তিনজনই একসঙ্গে হেসে ওঠে।

image

দিন যেতে থাকে। কিন্তু পড়াশোনায় যতটা ভালো করতে থাকে বেণু, ভায়োলিনে ততটা অগ্রগতি নেই। শফিক সাহেব প্রায়ই অপেক্ষা করেন, একদিন হয়তো মেয়েটা ভায়োলিন বাজিয়ে তাকে অবাক করে দেবেন। কিন্তু তেমন কিছু দেখেন না। আবার জোড়ও করতে চান না। তিনি ভাবেন, ‘মেয়েটা হয়তো মন থেকে নিতে পারেনি বাদ্যযন্ত্রটাকে’।

এরিমধ্যে বেণুদের স্কুলে কনসার্ট হবে। বেশ বড় আয়োজন। অর্কেস্ট্রার দলীয় পরিবেশনা আছে। সেখানে বেণুও বাজাবে। জানার পর থেকে শফিক সাহেবের খুব ভালো লাগতে থাকে। অনুষ্ঠানের দিন কাজ থেকে ছুটি নিয়ে নেন তিনি। কনসার্ট বিকালে অথচ সকাল থেকেই তার মধ্যে এক ধরণের উত্তেজনা কাজ করতে থাকে। মনে মনে ভাবেন, এই দিনটার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। ভায়োলিনকে ঘিরে তার যে স্মৃতি সে কারণেই বাদ্যযন্ত্রটার প্রতি তার এতটা মমতা, এতটা আগ্রহ। তার পরিবারের কেউ হয়তো তা কোনদিন বুঝবে না। নিজের মেয়ের বাজানোর মধ্য দিয়ে, নিজের ভেতরের সেই হাহাকার হয়তো দূর হবে।

অনুষ্ঠানের সময় হয়ে এসেছে। মিলনায়তন অন্ধকার। মঞ্চের সামনে বিরাট একটা পর্দা টেনে দেয়া। একটু পর সেই পর্দা সরে গেলো। চারপাশ থেকে করতালির হুল্লোড় উঠলো। মঞ্চের ভেতরে আলো জ্বলে উঠলো। মঞ্চে কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে। অক্টেস্ট্রা দলটাকে দেখতে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। সবার পড়নে কালো আর সাদা পোশাক। ভায়োলিন, ওবোস, ট্রাম্পেট, তুবা, স্ট্রিং বাজ, ফ্লুট; একেকজনের হাতে এক বাদ্যযন্ত্র। কি যে সুন্দর লাগছে! অনেকের ভিড়ে শফিক সাহেব আর রাবেয়ার দৃষ্টি কেবল বেণুকে খুঁজছে। ‘কই মেয়েটাকে তো দেখা যাচ্ছে না’! বুকটা ধক করে উঠলো তাদের। শফিক সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। পেছন থেকে কেউ একজন ইংরেজি যা বললেন তার অর্থ, ‘প্লিজ বসুন, পেছন থেকে দেখতে পাচ্ছি না’। শফিক সাহেব বসে পড়লেন। রাবেয়া তার হাত চেপে ধরে বললো, ‘অপেক্ষা করো, হয়তো আসবে। পরের পারফরমেন্সে থাকতে পারে’।

অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলো। বেণুকে দেখা গেলো না। মেয়েটাকে খুঁজতে দৌড়ে শফিক সাহেব এবং রাবেয়া ছুটলো ব্যাক স্টেজের দিকে। সেখানে গিয়ে দেখা গেলো বেণুর টিচার মিস পোর্টার কথা বলছেন ওর সঙ্গে। কিছু একটা বলে, সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু মেয়েটা ক্রমাগত কাঁদছে। অবিরাম সেই কান্না। 

দৌড়ে গিয়ে রাবেয়া জড়িয়ে ধরলো তার মেয়েটাকে। শফিক সাহেবও কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে মাথায় হাত রেখে আকুল কণ্ঠে বললো, “কি হয়েছে মা”? মেয়েটার কান্নার গতি তাতে আরও বাড়লো।

বেণুর টিচার মিস পোর্টার যা বললেন তা হচ্ছে, “কনসার্ট শুরুর আগে ব্যাকস্টেজে প্র্যাকটিসে অন্যদের সঙ্গে কিছুতেই তাল মেলাতে পারছিল না বেণু। সমস্যাটা আগে থেকেই হচ্ছিল। বাদ্যযন্ত্রটা সে শেখার চেষ্টা করছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল খুব ভালো করবে। কিন্তু একটু কনফিডেন্ট কম পাচ্ছিল”। এটুকু বলে থামলেন মিস পোর্টার। এরপর বেণুর আবারো বলতে শুরু করলেন। “আমি তাকে বলেছিলাম, তুমি মঞ্চে যাও। বন্ধুদের সঙ্গে সারি বেধে বসো। যেহেতু তাল কেটে যাচ্ছে, তাই তুমি আজ বাজাতে যেও না। কেবল অভিনয় করে যাও। বেণু তাতে রাজি হয়নি। ও বলেছে, সে মঞ্চে যেতে চায় না। সে ফেক কিছু করতে চায় না। আমিও অবশ্য বিষয়টাকে অ্যাপ্রিশিয়েট করেছি। সি ইজ বিউটিফুল’।

রাবেয়া মেয়েকে আস্বস্ত করে বললো, “কোন অসুবিধা নেই মা। পরেরবার ভালো হবে। আর তুমি চাইলে এখনো এই যন্ত্রটা শেখা বাদ দিয়ে দিতে পারো। আমরা কিচ্ছু মনে করবো না। তোমার চাওয়াই, আমাদের চাওয়া”।

বেণু চোখ মুছতে মুছতে বললো, “তোমরা কিছু মনে করো না। পরেরবার আমি ঠিক পারবো”।

****

বাড়িতে ফিরেও বেণুর মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে। সবমিলিয়ে তার খুব খারাপ লাগছে। শফিক সাহেব বেণুর রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে ভেতরে ঢোকার জন্য মেয়ের অনুমতি চাইলো। “মা আসবো ভেতরে”?

“এসো বাবা”। জবাব দেয় বেণু।

শফিক সাহেব ভেতরে ঢুকে দেখে বেণু তার ভায়োলিনটা ধরে বসে আছে। অনেকটা হতচকিত অবস্থা তার। শফিক সাহেবের আরও খারাপ লাগতে থাকে। কেন যে সে এমনভাবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলো। এখন নিজেকে বেশ অপরাধী লাগছে। মনে হচ্ছে, তার জন্যই এমন হয়েছে। ‘স্যরি মা, আমার জন্যই এমন হয়েছে। তুমি কিছু মনে কোরো না। চাপিয়ে দেয়া ঠিক হয়নি”।

‘কই বাবা, তুমি তো চেঞ্জ করতেই বলেছিলে। ইউ আর দ্য বেস্ট ড্যাড। তোমার কোন দোষ নেই। এই ইনসট্রুমেন্টটার প্রতি কেন জানি ভালোলাগাটা তৈরি হচ্ছে না’। জানায় বেণু।

শফিক সাহেব বলেন, ‘তোমাকে কোনদিন বলা হয়নি, এমন কিছু কথা কি বলতে পারি? কেন ভায়োলিনকে ঘিরে আমার এতটা আবেগ। কেন সুযোগ পেয়ে, নিজের ভালোলাগা তোমার উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিলাম। শুনতে চাও তুমি’?

বাবার কথায় এমন কিছু ছিল যে, মেয়েটা চোখ তুলে তার দিকে তাকায়। এই প্রশ্নটার উত্তরই যেন বেণুও খুঁজছিল। বললো, “আমি শুনতে চাই বাবা”।

শফিক সাহেব বলতে শুরু করলেন। “ছেলেবেলায় আমরা থাকতাম মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে। পাড়ার গলির মাথা থেকে প্রায়ই বেহালার করুণ সুর ভেসে আসতো। আবার কখনো ভেসে আসতো বাংলা সিনেমার গানের সুর। এই যেমন ধর, “বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না আমায় কথা দিয়াছে” এমন গান। সুর শুনেই বুঝতে পারতাম তিনি এসেছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দৃষ্টিসীমার মাঝে দেখা যেতো তাকে। পেছনে একদল ছোট ছোট ছেলে মেয়ে ছুটছে। কখনো কখনো বড়রাও যুক্ত হয়ে যেতো সেই দলে। রোদে পোড়া তামাটে চেহারা তার। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। সেই ব্যাগ থেকে উঁকি দিচ্ছে লোকটার হাতে তৈরি বিশেষ ধরণের ছোট্ট বেহালা। আর তার হাতে মাটি আর বাঁশ দিয়ে তৈরি একতারের সেই বেহালায় ছিল সুরের সেকি জাদু! যে ছেলেমেয়েরা ছুটে চলছে তার পিছে, আমি ঢুকে পড়তাম সেই দলে। নাওয়া-খাওয়া ভুলে ছুটতাম, যত দূর যাওয়া যায়।

বেণু খুব আগ্রহ নিয়ে বাবার কথা শুনছে। মনে হচ্ছে তার শুনতে ভালো লাগছে। বেণু জানতে চায়, ‘বেহালা কি বাবা’?

“ভায়োলিনকে বাংলায় বেহালাই বলে”। শফিক সাহেব জবাব দেন। “তবে আমার ছেলেবেলার সেই বেহালাওয়ালা তোমাদের মতো এত আধুনিক বেহালা কিন্তু বাজাতেন না। আগেই বলেছি ওটা ছিল তার নিজের হাতে তৈরি। অনেকগুলো বানিয়ে সে ঝোলায় করে নিয়ে আসতো। বিক্রি করার জন্য সেটাই। ছিল তার প্রফেশন”।

“বাহ! ইন্টারেস্টিং তো। শুনে খুব ভালো লাগছে বাবা। তোমার জীবনে কত মজার মেমোরি আছে। বাবা ঐ লোকটার নাম কি তোমার মনে আছে”?

শফিক সাহেব জবাব দেন, “যতদূর মনে পড়ে, বেহালা বাজানো লোকটার নাম ছিল সালাউদ্দিন। সেই বেহালা বাজিয়ে বাজিয়ে তিনি চলে যেতেন, এই রাস্তা, ঐ রাস্তা দিয়ে। কখনো পাড়া মহল্লায় মেলা বসতো। সেই মেলার মূল আকর্ষণ হয়ে উঠতেন তিনি। আবার বিশেষ দিনে শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধে পাওয়া যেতো তাকে। তিনি বেহালাটার নাম দিয়েছিলেন ‘বাংলা বেহাল’।”

“বাংলা বেহালায় যখন সুর তুলে চলে যেতেন সালাহদ্দিন, তখন তাকে মনে হতো হ্যামিলনের সেই বাঁশিওয়ালা”। বেণু খুব মন দিয়ে বাবার কথা শুনছে। শফিক সাহেব জানতে চান, “হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার কথা কি তোমাকে কখনো বলেছি”?

বেণু মাথা দুলিয়ে বলে, ‘না আমাকে বলোনি। আমি শুনতে চাই বাবা’।

শফিক সাহেব প্রসঙ্গ বদলে এবার হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার গল্প বলতে শুরু করলেন। “অনেক অনেক বছর আগে কথা। এই যে জার্মানি নামের দেশটিকে এখন আমরা যতটা আধুনিক দেখি, তখন কিন্তু তেমন ছিল না। সেই দেশটির ছোট্ট একটি শহরের নাম ছিল হ্যামিলন। একবার সেই শহরের বাসিন্দারা ইঁদুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ইঁদুর-বাহিত রোগ বেড়ে যায়। মানুষের ভোগান্তি ওঠে চরমে। ইঁদুরের সংখ্যাও বাড়তে থাকে দিনে দিনে। কিন্তু কারো কিছু করার নেই। কেবল মানুষ মারা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শহর কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিলো, যে এই ইঁদুরের হাত থেকে তাদেরকে রক্ষা করতে পারবে, তাকে দেয়া হবে মোটা অংকের অর্থ পুরস্কার। খবর চারদিকে ছড়িয়ে গেলে শহরে এসে হাজির হলেন রহস্যময় এক বাঁশিওয়ালা। তিনি জানালেন, তাঁর বাঁশির সুরে শহর থেকে ইঁদুরগুলো দূর করা সম্ভব। অনেকে অবাক হয়ে ভাবেন, এ আবার কেমন কথা! বাঁশির সুরে কিভাবে ইঁদুর দূর করা যাবে! তবে নিরুপায় শহর কর্তৃপক্ষ বাঁশিওয়ালাকে একটা সুযোগ দিতে চাইলো। শহরটির মেয়র বললেন, ঠিক আছ, ইঁদুরের হাত থেকে মুক্ত করতে পারলে, অবশ্যই তাকে পুরস্কার দেয়া হবে। 

বেণু মন দিয়ে বাবার গল্প শুনছে। এবার নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন করলো, “সত্যি সত্যি কি ইঁদুরেরা বাঁশির সুর বুঝতে পারে বাবা? নাকি এটা কেবল একটা রূপকথা গল্প, মিথ”!

শফিক সাহেব বলেন, “হয়তো রূপকথার গল্পই। তবে এই পৃথিবীতে অদ্ভুত কত ঘটনাইতো আছে। এমন কিছু ঘটে, যার হয়তো কোন ব্যাখ্যা নেই। তবে মাঝে মাঝে আমার অবশ্য এটাও মনে হয়, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই, এমন কিছু কি আদৌ ঘটা সম্ভব! যাই হোক, গল্পের বাকিটা শুনে নাও, এরপর আবারো ফিরো যাবো সালাউদ্দিন বেহালাবাদকের কথায়”।

বেণু মাথা দুলিয়ে সায় দেয়। গল্প শুনতে খুব পছন্দ করে বাচ্চাটা। এমনভাবে তাকিয়ে থাকে শফিক সাহেবের বলতেও ভালো লাগে। তিনি আবারো বলতে শুরু করলেন। “বাঁশিওয়ালা তার বাঁশি বাজানো শুরু করলেন। সব ইঁদুর গর্ত ছেড়ে কিংবা বাড়ির ভেতর থেকে বের হয়ে এলো দলে দলে। বাঁশিওয়ালা বাঁশি বাজাতে বাজাতে হেঁটে চললেন। মায়াবি সেই সুরের টানে ইঁদুরগুলোও তাকে অনুসরণ করছে। সেখানে ওয়েজার নামে একটা নদী ছিল। বাঁশি বাঁজাতে বাঁজাতে নিয়ে গিয়ে ইঁদুরগুলোকে সেই নদীতে ফেলে দিল লোকটা। ইঁদুর মুক্ত হলেও, বাঁশিওয়ালাকে পুরস্কারের অর্থ দিতে চাইলো না শহর কর্তৃপক্ষ।

এ পর্যায়ে বেণু রীতিমতো প্রতিবাদ করে উঠলো, “কেন, তারা এটা কেন করবে? তারা প্রমিজ করেছে , পুরস্কারতো তাকে দেয়া উচিতই ছিল বাবা। কেন তারা সেটা রাখবে না। ইটস আনফেয়ার”!

শফিক সাহেব বলতে থাকেন, “অবশ্যই আনফেয়ার মা। এরপর রাগ করে ঐ বাঁশিওয়ালা তখনকার মতো চলে গেলেও, পরে আরেকবার ফিরে আসে। তখন আবারো বাঁশি বাজাতে শুরু করে। সেই বাঁশির সুরে শহরের সবগুলো বাচ্চা বের হয়ে আসে। তারা হ্যামিলনের সেই বাঁশিওয়ালার পিছু হাঁটতে হাঁটতে একসময় দূর পাহাড়ে হারিয়ে যায়”।

বেণু বললো, “মানে কি!‍ বাচ্চাগুলোকে কেন বাঁশিওয়ালা নিয়ে গেলো! এটাও তো ঠিক হয়নি। ওদের বাবা মায়েরা কাঁদবে, খুঁজবে। ওরা কষ্ট পাবে। বাচ্চাগুলোর জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে বাবা”।

শফিক সাহেব মৃদু হাসলেন। মেয়েটা তার খুব মায়াবি হয়েছে। খুব ভালো মনের। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই ঠিক হয়নি। আর কষ্টের ব্যাপার হচ্ছে, সেই বাচ্চারা আর কোনদিন ফিরে আসেনি”।

বেণুর মুখটা মলিন দেখাচ্ছে। সত্যি সত্যি হ্যামিলন শহরের সেই শিশুগুলোর জন্য ওর খুব কষ্ট হচ্ছে। ‘বাবা তোমরাও কি ঐ ভায়োলিন বাজানো লোকটার পিছু পিছু এমনি করে ঘুরে বেড়াতে? যদি তোমরাও হারিয়ে যেতে”?

শফিক সাহেবের হাসিটা এবার বেশ চওড়া হয় এবার। তিনি বলেন, “আমাদের বাবা মায়েরাও শুরুতে এমন ভয় পেতো। পাড়ায় যখন এই বেহালাওয়ালা নতুন আসতে শুরু করেছিল। সে বেহালা বাজিয়ে হেঁটে যেতো। আর পেছনে পেছনে হাঁটতো অসংখ্য শিশু। অদ্ভুত সেই দৃশ্য। তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না। শুরুতে বাবা মায়েরা ভাবতো ছেলে ধরা বুঝি”।

‘বাবা ছেলেধরা কি”? বেণুর প্রশ্ন।

“ছেলেধরা হচ্ছে, কিডন্যাপার। বাবা-মায়েরা ভাবতো লোকটা বুঝি তাদের বাচ্চাদের চুরি করে নিয়ে যাবে। এমন ভয় থেকে তোমার দাদুমনিও অনেকবার আমাকে তার পিছু নিতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু সত্যি বলতে কি সালাউদ্দিন বেহালাবাদক মনের মধ্যে একটা স্বপ্ন ঢুকিয়ে দিয়ে গেছেন। আমার মতো অনেকের মনে। শিশুদের ভালোবাসতেন তিনি। কখনো যদি কারো কাছে বেহালা কেনার পুরো টাকা না থাকতো, কম দামেও তিনি দিয়ে দিতেন। ছোটবেলায় আমিও ভাবতাম, সালাউদ্দিনের মতো বেহালাবাদক হবো। এইভাবে পথে পথে বেহালা বাজিয়ে ঘুরে বেড়াবো। অসংখ্য ছেলে-বুড়ো আমার পিছু নেবে। নিজেকে আমার মনে রাজা। সেই থেকে ভায়োলিন বাদ্যযন্ত্রটার প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা” ।

‘বুঝলাম। তাহলে তুমি নিজে ভায়োলিন শেখার চেষ্টা কেন করলে না”? প্রশ্ন করে বেণু।

শফিক সাহেব বেণুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “অর্থকষ্টে মা। জীবনের প্রয়োজনগুলো মেটাতে পারতাম না। তবে সবসময়ই এই ইচ্ছাটা মনের ভেতরে থেকেই যেতো। মনে আছে, আমি তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম। থাকতাম সূর্যসেন হলে। একবার আমাদের হলের এক ছাত্র তার কাছে থাকা একটি ভায়োলিন বিক্রি করার জন্য নোটিশ টানিয়েছিল। অনেক ধারদেনা করে, টিউশনির টাকা বাঁচিয়ে সেই ভায়োলিনটা কিনেছিলাম আমি। এক বড় ভাই বলেছিলেন ভায়োলিন শেখাবেন। তিনি খুব ভালো বাদ্য বাজনা জানতেন। শিখতে শুরুও করেছিলাম”।

অজানা এই কাহিনি শুনতে মনে হয় ভালো লাগছে বেণুর। এই বয়সি বাচ্চারা সাধারণত এমন সিনেমাটিক অভাব অনটনের গল্প শুনতে পছন্দ করে না। তবে বেণুর মনটা হয়েছে অন্যরকম। অনেকটা ওর মায়ের মতো। মানুষের দু:খ কষ্টে কেঁদে কেটে বুক ভাসায়। তার মনের ভেতরটা মায়ায় পরিপূর্ণ। বেণু জানতে চায়, “তারপর কি হলো”?

“কিন্তু ঐ অভাব। হঠাৎ পরীক্ষার ডেট পরে গেলো। ফিস জমা দিতে হবে। মেসে খাওয়ার বিল দিতে হবে। পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। পাশ করে চাকরি পেতে হবে। লেখাপড়া শেষে হল থেকে বের করে দিলে যাবার জায়গা খুঁজে বের করতে হবে। কত কিছু। শেষ পর্যন্ত ভায়োলিনটা কিছুদিন পরেই রইলো। ধুলার আস্তরণ পড়লো তাতে। টাকার জন্য শেষমেষ আমার এক বন্ধুর বোনের কাছে খুব অল্প দামে সেটা বিক্রি করে দিলাম। শেষ হলো আমার ভায়োলিন শেখার অভিযান। তবে বুকের ভেতরে স্বপ্নটা ঠিকই থেকে গেলো, যেমন ছিল”।

image


বেণু এবার কাঁদতে শুরু করেছে। দেখে শফিক সাহেবের খুব খারাপ লাগতে শুরু করলো। পাশের রুম থেকে ছুটে এলো রাবেয়া। মেয়ের কান্না শুনে তার বুকের ভেতরটায় মোচড় দিয়ে উঠেছে। শফিক সাহেবের দিকে তাকিয়ে রাবেয়া কঠিন গলায় জানতে চায়, “কি হয়েছে আমার মেয়ের? সে কাঁদছে কেন”? বলতে বলতে মেয়েটাকে শক্ত করে বুকের ভেতরে জড়িয়ে ধরলো রাবেয়া। বেণুর কান্নার শব্দ জোড়ালো হতে থাকলো। শফিক সাহেব তখন নিজেকে আরো একবার অপরাধী ভাবতে শুরু করলেন। নিজের কষ্টের কথা, জমানো আবেগের কথা ছোট্ট মেয়েটাকে না বললেও পারবেন। তা ছাড়া তিনি নিজে ভায়োলিন শিখতে চেয়েছিলেন, অন্য কেউ সেটা নাও চাইতে পারে। কোন উত্তর দেয় না শফিক সাহেব।

রাবেয়া এবার রেগে গিয়ে শফিক সাহেবকে বললেন, “নাটক করবে না বলে দিলাম। আমার অতটুকুন মেয়েকে জীবনের কঠিন কঠিন গল্প শোনাবে না। কোন সিনেমার ডায়লগ শুনতে চাই না। নিজের কষ্ট কেন মেয়েটার ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে হবে”। বেণু তখন উঠে এসে বাবা-মাকে একসঙ্গে জড়িয়ে ধরলো। এ যেনো অন্য ভুবনের এক আনন্দ।

****

রাবেয়া ঘুমিয়ে পড়েছে। শনিবার শফিক সাহেবের কাজ না থাকলেও, রাবেয়াকে যেতে হবে। উঠতে হবে সকাল সকাল। রোজ সকালে স্কুলে যেতে হয় বলে তারাতারি ঘুমিয়ে পড়া বেণুরও অভ্যাস। তবে শফিক সাহেবের কেন জানি ঘুম আসছে না। ভাবলেন একটা সিনেমা দেখবেন। নেটফ্লিক্সে ঢুকতেই সামনে এলো নতুন একটি সিনেমার নাম। নামের মধ্যেই এক ধরণের আকর্ষণ বোধ করলেন, ‘মাই ফাদারস ভায়োলিন’। দেখতে শুরু করলেন তিনি।

সিনেমার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছে আট বছরের একটি শিশু। ওজলাম নামের এই শিশুর বাবার নাম থাকে আলী রিজি। যে একজন স্ট্রিট ভায়োলিন শিল্পী। আলী রিজি রাস্তায় রাস্তায় তার অন্য বন্ধুদের সঙ্গে ফোক মিউজিকের ধাঁচে যন্ত্র সঙ্গীত পরিবেশন করে বেড়ায়। ছোট্ট ওজলামসহ চারজনের মিউজিকের দল। রাস্তায় মিউজিক পরিবেশন করতে গিয়ে তাদের জীবনে ঘটে যায় অনেক আনন্দ-বেদনার ঘটনা। সঙ্গীতের মূর্ছনায় খুশি হয়ে সমবেত দর্শনার্থীরা বাড়িয়ে দেয় অর্থ। সেই অর্থ টুপি পেতে গ্রহণ করে ছোট্ট ওজলাম। এর মধ্যে প্রায়ই পুলিশের হানা দেয়া; দৌড়ে পালানো। সে এক সংগ্রামের জীবন। তবু এই নিয়ে ভালোই কাটছিল তাদের জীবন। তবে ছোট্ট ওজলামের জীবনে হঠাৎ করেই আসে গভীর দুর্দিন; অনিশ্চয়তা। অসুস্থ বাবা একদিন হঠাৎ ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। ওজলামের একমাত্র চাচা বিখ্যাত ভায়োলিন শিল্পী মেহমত মাহির; যাকে সে কোনদিন চোখেই দেখেনি। প্রশ্ন দেখা দেয়, এই শিশুর দায়িত্ব কে নেবে? বাবার কবরের পাশে বসে ছোট্ট ওজলাম ভায়োলিন বাজাতে থাকে। ভেসে আসে একটা কণ্ঠ; তার বাবা যেনো ছোট্ট মেয়ের মাথায় হাত রেখে অভয় দিচ্ছে। দূর থেকে তার বাবা যেনো বলছে, “তুমি যেখানেই যাবে, তোমার বাবা তোমার সঙ্গে থাকবে”। হৃদয় ছিঁড়ে নেয়া এই দৃশ্য কিছুতেই সহ্য করতে পারেননি শফিক সাহেব। “এরপর কি হবে”? এমন প্রশ্নের উত্তর না জেনেই তিনি টিভিটা বন্ধ করে দেন। হাউ মাউ করে কাঁদতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে কিছুটা শান্ত হয়ে এলে তিনি উঠে গিয়ে বেণুর রুমে উঁকি দেন। মেয়েটা তখন ঘুমাচ্ছে। তিনি মনে মনে বলেন, ‘মা রে ভালো থাকিস। শান্তিতে থাকিস। তোর কাছে কোন কিছুই আমার চাওয়ার নেই। তোকে বিখ্যাত হতে হবে না। তোকে বড় চাকরি করতে হবে না। তোকে কোন কিছু নিয়ে কোন চাপ নিতে হবে না। তুই কেবল শান্তিতে বড় হয়ে ওঠ। আমি কেবল তোর শান্তিময় জীবন দেখতে চাই’।

image

শফিক সাহেব বুঝতে পারছেন না ইদানীং তার কেন এমন হচ্ছে। তিনি বেণুর ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। লিভিং রুমের দক্ষিণ দিকের বিশালাকৃতির জানালাটা দিয়ে তাকালেন বাইরে। পর্দা সরিয়ে দিলে বিশালাকৃতির আকাশ দেখা যায়। শফিক সাহেব বাইরে তাকিয়ে আছেন। কুল কুল করে বয়ে যাচ্ছে শীর্ণকায় লেকের পানি। এতচাই শান্ত সুনিবিড় চারপাশ যে লেকে বয়ে যাওয়া পানির শব্দও কানে আসছে।

আকাশে বড় একটি চাঁদ। গোলগাল চাঁদ। আজ হয়তো ভরা পূর্ণিমা। আলো আঁধারিতে অদ্ভুত এক রহস্যময়তা। রহস্যময় চাঁদের আলোয় সবকিছু যেনো ভেসে যাচ্ছে। বাইরে তাকিয়ে থাকতে খুব ভালো লাগছে শফিক সাহেবের। হঠাৎ ভেসে এলো চমৎকার একটা সুর। চমকে পেছন ফিরে তাকান তিনি। বেণুর ঘরের বাতি জ্বলছে। সেই ঘর থেকেই হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার ভায়োলিনের সেই সুর ভেসে আসছে। “কে বাঁজায় এই সুর, বেণু”? শফিক সাহেব কেবল ভাবছেন, “কি অদ্ভুত। জীবন সত্যিই কত রহস্যময়। এই আলো আঁধারির মতোই। কখনো দেখা যায়, কখনো দেখা যায় না। চোখ গড়িয়ে পানি পড়ছে তার”। তিনি আবারো তাকিয়ে থাকেন চাঁদটার দিকে।

কেউ একজন শফিক সাহেবের কাঁধে হাত রাখে। চমকে উঠে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখে বেণু দাঁড়িয়ে। তার ঠিক পেছনে রাবেয়া দাঁড়িয়ে। কখন যে উঠে এসেছে টেরই পাননি শফিক সাহেব। রাবেয়া বাতি জ্বালালো। বেণু বাবাকে জড়িয়ে ধরলো। ‘শফিক সাহেব বললেন, “স্বর্গীয় এই বাদন কবে শিখলে মা? কিভাবে শিখলে? একজীবনে আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই”।

রাবেয়া এগিয়ে এসে হেসে বললো, “এবার কান্নাকাটি থামাও। কিছু হলেই কেঁদেকেটে বুক ভাসানো। এসব কি? হয়েছে তোমার স্বপ্ন পূরণ!”

বেণু বললো, “বাবা চলো আমরা বাংলাদেশে যাই। বাংলাদেশে গিয়ে এবার আমরা দুটো কাজ করবো। ফার্স্ট অব অল খুঁজে বের করবো মিস্টার সালাউদ্দিনকে। তোমার ছেলেবেলার সেই ভায়োলিন আর্টিস্টকে। এরপর তার কাছে থাকা সবগুলো ভায়োলিন কিনে নেবো। সেই ভায়োলিনগুলো দিয়ে দেবো তার পেছনে ছুটতে থাকা বাচ্চাগুলোকে। আইডিয়াটা কেমন”?

কান্না মিশ্রিত হাসি ফুটে উঠলো শফিকের চোখে মুখে। “মেয়েটা এতদূর ভেবেছে! বিস্ময়ে হতবাক তিনি। “আরেকটি কি”?

“আরেকটি হচ্ছে, তুমি যার কাছে তোমার ভায়োলিনটা সেল করে দিয়েছিলে, এরপর আমরা খুঁজে বের করবো তাকে। তাকে রিকোয়েস্ট করে, কিনে আনবো তোমার ভায়োলিনটা। রেখে দেবো আমাদের কাছে। আমার কাছে তুমি ভায়োলিন বাজানো শিখবে। আমি হোল লাইফ তোমার ঐ ভায়োলিনটা রেখে দেবো। আমার বাবার ভায়োলিন”। বলতে বলতে বেণুর চোখমুখ চকচক করতে থাকে।

শফিক সাহেব এবার উচ্চস্বরে হেসে ওঠেন। “বেণু, মা তুমি এতকিছু কখন ভাবলে? এতবছর পর কি সেই ভায়োলিনটা পাওয়া যাবে? হয়তো পুরানো ভেবে তারা ফেলে দিয়েছে। হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে। হয়তো অন্য কাউকে দিয়ে দিয়েছে”।

‘হয়তো রেখে দিয়েছে; এমনও তো হতে পারে। সাজিয়ে রেখেছে। হয়তো শিখেছে; এখনো বাজায়। ট্রাই করতে কি প্রবলেম!”  বেণু এমনভাবে কথাটা বললো যেন সে শফিক সাহেবের মেয়ে নয়; মা।

“আর শোনো আমি কিন্তু তোমার মা হতে পারবো না। আমি তোমার মেয়ে। আর তুমি পৃথিবীর সেরা বাবা”। বলতে বলতে হাসতে থাকে বেণু। রাবেয়া কাছে এসে মেয়েটার দিকে তাকায়। হঠাৎ করে মেয়েটাকে অনেক বড় লাগছে। ‘আর মা, তুমিও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা। মাই লাভিং মাম’। বলে বেণু মাকে জড়িয়ে ধরে। শফিকও এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে দু’জনকে। একসঙ্গে।

(আন্দাক হ্যাজনেদারোগ্লু পরিচালিত তুর্কি চলচ্চিত্র ‘মাই ফাদারস ভায়োলিন’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা)

লেখক: সাংবাদিক, লেখক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা


একাত্তর/আরএ


বাংলাদেশ থেকে প্রথম আমেরিকায় অভিবাসী হয়েছিলেন কে? এই প্রশ্নের সঠিক কোন উত্তর জানা যায় না। তবে কখন, কিভাবে মার্কিন মুল্লুকে বাঙালিদের বসতি গড়ে উঠেছিল; তাদের ত্যাগ, সংগ্রাম ও সফলতার অনেক কথামালা...
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও কারাবন্দী আওয়ামী লীগ নেতা ডা. সেলিনা হায়াত আইভী জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। বুধবার (৩ জুন) রাত ১০টা আট মিনিটে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্ত হন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও গাইবান্ধায় আলাদা বজ্রপাতের ঘটনায় মা-ছেলে ও এক কিশোরসহ চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বুধবার (৩ জুন) বিকেলে থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলা দুটিতে আলাদা বজ্রপাতে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
নারায়ণগঞ্জের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেতার বিরুদ্ধে মানুষের চলাচলের সরকারি রাস্তা টিনের বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিবাদ করায় বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে তার...
বরগুনা জেলা পরিষদের সদর ডাকবাংলোর তিনতলার দুটি কক্ষ থেকে এক নারী ও তার দুই শিশু কন্যার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার (৩ জুন) বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে খবর পেয়ে পুলিশ এসে কক্ষের দরজা ভেঙে মরদেহগুলো...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর