গ্লোব বায়োটেকের তৈরি করোনার টিকা ‘বঙ্গভ্যাক্স’ মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। প্রায় দেড় বছর আগে মানবদেহে পরীক্ষার অনুমতি চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেছিলো প্রতিষ্ঠানটি।
গ্লোব বায়োটেক বলছে ৬০ জনের দেহে চালানো হবে প্রথম ধাপের এই পরীক্ষা। আর এটি হবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। যা শেষ হতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগবে। করোনার সব ধরনের বিরুদ্ধে বঙ্গভ্যাক্সের টিকা কার্যকর বলে জানিয়েছে গ্লোব বায়োটেক।
রোববার (১৭ জুলাই) বিকেলে গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের কোয়ালিটি অ্যান্ড রেগুলেটরি বিভাগের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন একাত্তরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গেলো ১ নভেম্বর বানরের ওপর চালানো পরীক্ষার ফলাফল বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ -বিএমআরসি কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয় গ্লোব বায়োটেক।
সেই প্রতিবেদন যাচাই বাছাইয়ের পর ন্যাশনাল রিসার্চ ইথিকস কমিটির বৈঠকে টিকাটি মানবদেহে পরীক্ষার অনুমোদন দেয়া হয়।
গ্লোব বায়োটেক কর্তৃপক্ষ জানায়, বঙ্গভ্যাক্স একটি এম আর.এন.এ টিকা। বিশ্বের অন্যান্য টিকা দুই-তিন ডোজের হলেও, এটি এক ডোজেই সমান কার্যকর।
ইঁদুরের দেহে চালানো পরীক্ষাতেও এটি ৯৫ শতাংশ কার্যকর হয়। করোনার সব ক’টি ধরণের বিরুদ্ধেই টিকাটির কার্যকারিতা মিলেছে বরে জানিয়েছে গ্লোব বায়োটেক।
প্রায় আড়াই বছর আগের কথা। গোটা বিশ্বকে থমকে দিয়ে শুরু হয় করোনাভাইরাসের ভয়ানক সেই দুঃসময়। অচেনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর একটা টিকার অপেক্ষায় পুরো বিশ্ব।
একে একে আবিষ্কার হয় অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রোজেনেকা, ফাইজার-বায়োএনটেক ও মডার্নার মতো বেশ কিছু টিকা। মানবদেহে প্রয়োগের আগে চলে বড় পরিসরের ট্রায়ালও।
ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড নামের একটি ওষুধ তৈরির প্রতিষ্ঠান ঘোষণা দেয় করোনার টিকা উদ্ভাবনের। নাম দেয়া হয় বঙ্গভ্যাক্স।
প্রাণীদেহে পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করে বছর দেড়েক আগে মানবদেহে বঙ্গভ্যাক্সের পরীক্ষামূলক প্রয়োগের জন্য আবেদন করে গ্লোব বায়োটেক।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর, অবশেষে রোববার টিকাটি মানবদেহে প্রথম ধাপের পরীক্ষার অনুমতি দেয় ঔষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। অনুমতি পেয়েই কাজেও নেমে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
গ্লোব বায়োটেক বলছে, এখনো করোনার টিকা নেয়নি এমন ৬০ জন ব্যক্তির দেহে চালানো হবে পরীক্ষা। এদের ৩০ জনের বয়স হবে ১৮ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে।
আর বাকি ৩০ জনের বয়স হবে ৫৫ বছরের বেশি। তাদের দেয়া হবে দুই ডোজ বঙ্গভ্যাক্স টিকা। আর প্রয়োগের কাজটি হবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে।
গ্লোব বায়োটেকের হেড অব কোয়ালিটি অপারেশন ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, প্রথম ধাপের পরীক্ষা সফল হলে মানবদেহে আরো দুই ধাপে টিকাটি প্রয়োগ করা হবে।
তারপরই বাণিজ্যিক উৎপাদনের অনুমতি চাওয়া হবে। তিনি আরো জানান, প্রথম ডোজের পাশাপাশি অন্য টিকার সাথে বুষ্টার ডোজ হিসেবেও বঙ্গভ্যাক্স নেয়া যাবে।
গেলো বছরের ১ নভেম্বর বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) নির্দেশনা মেনে বানরের দেহে চালানো বঙ্গভ্যাক্স পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়।
একই সাথে বিএমআরসির তৃতীয় ও সর্বশেষ চিঠির সব প্রশ্নের জবাবও দেয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে বিএমআরসির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পূর্বশর্তসহ সব পর্যবেক্ষণের যথাযথ উওর দেয়া শেষ হয়।
এরপর গড় বছরের ২১ নভেম্বর বিএমআরসির ন্যাশনাল রিসার্চ এথিক্স কমিটির সভায় মানবদেহে বঙ্গভ্যাক্স পরীক্ষার নৈতিক অনুমোদন দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের চূড়ান্ত অনুমোদনের গ্লোব বায়োটেক ঔষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে আবেদন করে। বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বঙ্গভ্যাক্সের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুমতি প্রদান করে সরকার।
ডেল্টার মতো ওমিক্রনের বিরুদ্ধেও শতভাগ কার্যকর বঙ্গভ্যাক্স। করোনার অতি সংক্রমণশীল ওমিক্রন-ডেল্টাসহ বিভিন্ন ধরন ঠেকাতেও বঙ্গভ্যাক্স সমান সক্রিয়।
ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, আমরা প্রতিটি ধরনের সিকোয়েন্স অ্যানালাইসিস করে আমাদের ভ্যাকসিনের সিকোয়েন্স মিলিয়ে দেখেছি প্রতিটি ধরনের ক্ষেত্রেই বঙ্গভ্যাক্স কার্যকর।
যার প্রমাণ মিলেছে বানরের পরীক্ষায়। প্রাথমিক ফলাফলে টিকাটি বানরে নিরাপদ এবং কার্যকর এন্টিবডি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে বলেও জানান, তিনি।
গ্লোব বায়োটেকের এই কর্মকর্তা মনে করেন, করোনার সব ধরনকে কুপোকাত করে মহামারীর অবসানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে বঙ্গভ্যাক্স।
তিনি আরো জানান, বঙ্গভ্যাক্সকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। বঙ্গভ্যাক্স টিকার সব তথ্য বিশ্ব ডাটাবেসে রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: করোনা: শনাক্ত নামলো হাজারের নিচে, মৃত্যু চার জনের
তিনি বলেন, এই টিকার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর একটি ডোজেই অ্যানিম্যাল ট্রায়ালে কার্যকর এন্টিবডি পাওয়া গেছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালেও একই ফল পাওয়া আশা করা হচ্ছে।
বঙ্গভ্যাক্স টিকা চার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এক মাস এবং মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ছয় মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে।
একাত্তর/আরএ
