আগামী দিনেও দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কেবলমাত্র আওয়ামী লীগই পারে দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বর্তমান একাদশ জাতীয় সংসদের ২৩তম অধিবেশনের (২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশন) সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
দেশে সাম্প্রতিক সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং তার শাসনামলে অনুষ্ঠিত সংসদ উপনির্বাচনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে পারি কেবলমাত্র আওয়ামী লীগই এদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য জনগণের ভোটাধিকার রক্ষা এবং জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন। আমরা কাজ করে যাচ্ছি এবং এটি চালিয়ে যাব।’
সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও গাজীপুরের সাম্প্রতিক সিটি নির্বাচন নিয়ে কেউ একটি প্রশ্নও তুলতে পারেনি। অতীতে বাংলাদেশে এত শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন হয়েছে কিনা প্রশ্ন করেন তিনি।
সংসদের বিভিন্ন উপ-নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিটি উপনির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলেন তাদের উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে বাংলাদেশে মানবাধিকারের খোঁজে আসে অনেকে। আমার প্রশ্ন ২০০১ এর নির্বাচনে যেভাবে হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ হয়েছিল তখন সেই মানবাধিকার ফেরিওয়ালারা কোথায় ছিলো? তারা কেন চুপ ছিলো? তাদের মুখে কেন কথা ছিলো না কেন? অনেকে আছেন আমাদের ছবক দেন। মানবাধিকার শেখান। মানবাধিকার বঞ্চিত তো আমরা। যারা খুনিদেরকে ইনডেমনিটি দিয়ে রক্ষা করে, আজ তাদের কথা শুনে অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা, অনেক দেশ দেখি মানবাধিকারের কথা উঠায়।
মানবাধিকার প্রশ্নে নানা বঞ্চনা নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমরাই তো মানবাধিকার বঞ্চিত ছিলাম। ৩৫ বছর লেগেছে বা-মার হত্যার বিচার করতে। বাংলাদেশে মানবাধিকার নেই যারা বলেন তারা ২০০১ দেখেননি? ১৫ আগস্ট দেখেন নি? ১৫ আগস্ট থেকে আওয়ামী লীগ সরকার আসা পর্যন্ত এদেশে কী ছিলো দেখেন নি? তখন তারা চোখেও দেখেন নি, কানেও শুনেননি কী কারণে- তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। মানবাধিকারের কথা বলে- আজকে রোহিঙ্গারা যখন নির্যাতিত হচ্ছিল, ধর্ষণের শিকার হচ্ছিল। আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি। আমরা মানবিক কারণে যখন এতগুলো মানুষের দায়িত্ব নিতে পারি। এর থেকে মানবাধিকার সংরক্ষণ আর কী হতে পারে সেটাই আমার প্রশ্ন?
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা আরও বলেন, যে আওয়ামী লীগ সরকার অন্য দেশের নির্যাতিত মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে, সেই আওয়ামী লীগ সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে কেন? কীভাবে করবে। এ কথা বলে কীভাবে?
বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, সারা বিশ্বে তো বহু জায়গায়, বহু মানুষ খুন হচ্ছে। এমনকি আমেরিকায় তো প্রতিদিন গুলি করে করে শিশুদের হত্যা করছে। স্কুলে, শপিং মলে, রাস্তায় হত্যা হচ্ছে। বাঙালি মেয়ে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ছিনতাই করতে গিয়ে হত্যা করছে। প্রতিদিনই তো তাদের প্রতিটি স্টেটে গুলি করে করে হত্যা করছে। ঘরের মধ্যে গিয়ে পরিবারসহ হত্যা করছে।
বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, এমন বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজের দেশের মানুষের মানবাধিকার রক্ষা তাদের আগে করা উচিত। তারা নিজের দেশের মানুষকে বাঁচাবে কী করে সেই চিন্তা আগে করুক। সেটাই তাদের করা উচিত। ইউক্রেনে যুদ্ধটা বাধিয়ে দিয়ে আজকে সেখানে হাজার হাজার নারী-পুরুষ উদ্বাস্তু হয়ে কষ্ট পাচ্ছে। সিরিয়ায় গোলাগুলি, প্যালেস্টাইনেও। একের পর এক বোমা হামলা। সেটা নিয়ে কারও কোন কথা নেই কেন? সেখানে কি মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না?
বিএনপির ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালের আন্দোলনের সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, বিএনপির জীবন্ত মানুষগুলিকে পুড়িয়ে মারা বিএনপির আন্দোলন। অবরোধ দিয়ে রেখেছে। সেই অবরোধ এখনো তুলেনি। অবরোধ দিয়ে মানুষকে হত্যা করা। এই হলো বিএনপির চরিত্র। আজ তাদের মুখে গণতন্ত্রের কথা শুনি। মানবাধিকারের কথা শুনি। বিদেশিদের কাছে.. আমাদের দেশে আছে কিছু আতেল শ্রেণি। কথা বিক্রি করে খাওয়া অভ্যাস। যত মিথ্যা অপবাদ দেয়া। এই দেশে নানা রকম অপরাধ করে করে যারা বিদেশে আশ্রয় নিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুযোগ নিয়ে যত অপপ্রচার চালাচ্ছে।
সদ্য অনুষ্ঠিত পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে নির্বাচন হবে না যারা বলে, মাত্র সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হল (বরিশাল, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা ও গাজীপুর)। গাজীপুরে আমরা হেরেছি, বাকি চারটাতেও আমরা জিতেছি। এই নির্বাচন নিয়ে কেউ একটি প্রশ্ন তুলতে পেরেছে? আমরা গেছি সেখানে ভোট চুরি করতে? করি নাই তো। এত শান্তিপূর্ণ নির্বাচন বাংলাদেশে আগে কখনো হয়েছে? ঢাকায় সিটি নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। মোহাম্মদ হানিফ জিতেছিল। এরপর লালবাগে বিএনপি গুলি করে আওয়ামী লীগের ছয়জন নেতাকর্মীকে হত্যা করে। সে কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। প্রত্যেকটা নির্বাচনে তো এরকম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেছে।
আওয়ামী লীগের আমলে হওয়া সব উপনির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একমাত্র আওয়ামী লীগই পারে অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে। সেটা আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে পারি। মানুষের ভোটের অধিকার সংরক্ষণ করা, মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করা। সেটাই আমাদের লক্ষ্য। সেই কাজটাই আমরা করে যাচ্ছি। সেটাই করে যাব। জনগণ বারবার অনেক বাধা অতিক্রম করেও আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। তার সুফল দেশের জনগণই পাচ্ছে।
বারবার বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নির্বাচনের পর প্রহসন শুরু হয়। জনগণের ভোট নিয়ে ছিনিমিনি খেলা শুরু হয়। শুরু হয় ‘হ্যাঁ’, ‘না’ ভোটের প্রহসন। ‘হ্যাঁ’ বক্স পাওয়া যেত। ‘না’ বক্স নেই। ভোট দেয়া লাগতো না। এমনিতেই বক্স ভরে যেত। সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান মিলিটারি রুল ও সংবিধান লঙ্ঘন করে। জিয়াউর রহমান নির্বাচনের নামে প্রহসন করে রাষ্ট্রপতি পদটি কলুষিত করে। জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়। আওয়ামী লীগকে কীভাবে শেষ করবে সেটা ছিলো তাদের লক্ষ্য। তারা পার্টি ভাঙ্গার খেলা শুরু করে। জিয়ার মৃত্যুর পর জেনারেল এরশাদ তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন।
সরকার প্রধান বলেন, ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর নির্যাতন। একদিকে আওয়ামী লীগের ওপর নির্যাতন। অপরদিকে জাতীয় পার্টির ওপর নির্যাতন। সব চেয়ে বেশি নির্যাতন হয় জাতীয় পার্টির ওপর। জাতীয় পার্টি সেটা ভুলে গেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার আমলে নির্বাচনই ছিলো একেকটা গ্রুপ ঢুকবে, সিল মারবে, বাক্স ভরবে। তারপর রেজাল্ট পাল্টাবে। দশটা হুন্ডা, ২০টা গুন্ডা, নির্বাচন ঠাণ্ডা। আওয়ামী লীগ সবসময় সংগ্রাম করে গেছে জনগণের ভোটাধিকার জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে।
তিনি বলেন, এরশাদ জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। খালেদা জিয়া তার দেবর এরশাদকে জেলে রাখলেও ভোট কারচুপির একই পথে যায়। স্বামী, সে ও তার দেবর একই খেলা।
২০০৮ সালের নির্বাচনের ফলাফলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওই নির্বাচনে বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ আর বিএনপি এক সমান হতে পারে না।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও সরকার প্রধান জানান। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার আছে বলেই এটা করে দিয়েছি। আমরা না থাকলে কেউ এটা দেখতোও না। মানুষের দিকে তাকাতো না। কিছু কিছু লোক হোল্ডিং করে দাম বাড়ায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জনগণের ভোটের অধিকার সুরক্ষিত করেছি। ভোটাধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছি এবং গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রেখেছি। ২০০৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত অগ্নিসন্ত্রাস, মানুষ হত্যা নানা ধরনের অপকর্ম করেও তারা কিন্তু এই গণতন্ত্র ধ্বংস করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ আছে বলেই গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত আছে। আওয়ামী লীগ আছে বলেই মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। মানুষ নৌকায় ভোট দিয়ে স্বাধীনতা পেয়েছে। নৌকায় ভোট দিয়ে আজ মঙ্গা দূর হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে।
২০২১ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ইনশাআল্লাহ, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, ‘২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি স্মার্ট দেশ- যেখানে থাকবে স্মার্ট মানুষ, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সমাজের পাশাপাশি স্মার্ট-দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার পাশাপাশি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন পূরণ হবে।
একাত্তর/জো
