‘লাল-সবুজ পতাকার লাল বৃত্তে আমার বাবারও এক ফোঁটা রক্ত আছে’। ১৯৭১ এর ২৬ মার্চ শহীদ বাবা মোহাম্মদ সলিম উল্লাহকে মনে করে, বলছিলেন সন্তান শিবলী মোহাম্মদ।
সদ্য বড় ভাই সাদী মহম্মদকে হারানো শিবলী বলেন, একাত্তরে তাদের বাড়ি টার্গেট করেছিলো অবাঙালি বিহারী আর পাক আর্মি। এই বাড়িতেই ২৩ মার্চ, মা জেবুন্নেসা ও ভাই সাদির তৈরি করা লাল-সবুজ পতাকাটি উড়েছিলো পতপত করে। যে বাড়ি জ্বলেছিলো ২৬ মার্চ।
মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডের সি ১২/১০ বাড়িটি ছিলো স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার। একাত্তরের ২৩ মার্চ বাড়িটির ছাদে উড়েছিল লাল সবুজ পতাকা।
শহীদ সন্তান শিবলী মোহাম্মদ জানান, পতাকাটি বাঁশ দিয়ে অনেক উঁচুতে বেধে দেয়া হয়েছিলো। পাক বাহিনী হেল্টিকপ্টার দিয়ে তা দেখেই চিহ্নিত করেছিলো বাড়িটি।
টার্গেট হয়ে থাকা বাড়িটি লক্ষ্য করেই ২৬ মার্চ দুপুরে ছুটে এসেছিলো বৃষ্টির মতো গুলি। বাবা সলিম উল্লাহ’র উষ্ণ রক্তে ভরে উঠেছিলো সন্তান সাদী মহম্মদের হাত।
দশ সন্তানকে নিয়ে স্বাধীন দেশে বেঁচে থাকার লড়াইটা একাই করেছিলেন মা জেবুন্নেছা। ২৬ মার্চ দুই তলা থেকে লাফিয়ে ভেঙে ফেলা পা নিয়ে তিনি কাপড় সেলাই করে চালিয়েছেন সংসার।

শিবলী মোহাম্মদ জানান, পুরো বাড়ির মধ্যে শুধু ছাদ ছাড়া কিছুই ছিলো না। মা কষ্ট করে ধার করে, দরজা-জানালা লাগিয়েছিলেন।
শহীদ বাবা মোহাম্মদ সলিম উল্লাহ’র নামে হয়েছে সড়কের নামকরণ। ওইটুকুই।
শিবলির অভিযোগ, এখনও শহীদ বাবার প্রতি অসম্মান করা হয় স্থানীয় মসজিদ থেকেই!
আত্মত্যাগে মোড়ানো এমন দিনে সন্তান সাদী’র মরদেহ পাশে নিয়ে ঘুমিয়ে আছেন শহীদ মোহাম্মদ সলিম উল্লাহ।
গত ১৩ মার্চ মারা যান সাদী মহম্মদ। এর আগে গত বছরের ৮ জুলাই তার মা শহীদ জায়া জেবুন্নেসা সলিম উল্লাহ (৯৬) বার্ধক্যজনিত রোগে মারা যান। মা মারা যাওয়ার পর থেকেই তিনি ভেঙে পড়েন।
রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, শিক্ষক ও সুরকার সাদী মহম্মদ রবীন্দ্র সঙ্গীতের উপর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি একজন কিংবদন্তি শিল্পী ও সুরকার। রবীন্দ্রসঙ্গীতে তার মূল পরিচিতি গড়ে উঠলেও আধুনিক গানেও তিনি সমান জনপ্রিয়। অসংখ্য রবীন্দ্র সংগীতের অ্যালবাম প্রকাশ হয়েছে তার কণ্ঠে। সঙ্গে আধুনিক গানও।

২০০৭ সালে ‘আমাকে খুঁজে পাবে ভোরের শিশিরে’ অ্যালবামের মাধ্যমে তিনি সুরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ২০০৯ সালে সাদী মহম্মদের ‘শ্রাবণ আকাশে’ ও ২০১২ সালে তার ‘সার্থক জনম আমার’ অ্যালবাম প্রকাশিত হয়।
এছাড়াও তিনি সাংস্কৃতিক সংগঠন রবিরাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১২ সালে সাদী মহম্মদকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করে বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল আই। ২০১৫ সালে সাদী মহম্মদ বাংলা একাডেমীর রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দিনই মোহাম্মদপুরের নিজ বাড়িতে অবাঙালিদের হাতে খুন হন মোহাম্মদ সলিম উল্লাহসহ তার পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য।
১৯২৪ সালে চাঁদপুরের কচুয়ায় জন্ম সলিম উল্লাহ’র। তার বাবা হাছান আলী সরকার, মা ওমর জান। তারা তিন ভাই ও দুই বোন ছিলেন। ১৯৭১ সালে ঢাকায় তার ঠিকানা ছিলো মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের সি-১২/১০ বাড়িটি।
কালরাত স্মরণে সারাদেশে এক মিনিটের ‘ব্ল্যাক আউট’
২৬ মার্চ: কালরাতের রক্তগঙ্গা পেরিয়ে জন্ম স্বাধীন দেশের