প্রয়াত সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাইয়ের মতো ত্যাগী নেতাকর্মীদের জন্য বাংলাদেশের আজকের সাফল্য এবং বিশ্ব দরবারে দেশ মর্যাদার আসনে বসেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় এ মন্তব্য করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, অনেক সংগ্রামের পথ বেয়ে আওয়ামী লীগ সরকারে এসেছে। আর আওয়ামী লীগ সরকারে এসেছে বলেই আজকে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত হয়েছে।
‘বাংলাদেশের জনগণ আজ একটা মর্যাদা নিয়ে বিশ্ব দরবারে চলতে পারে। আব্দুল হাইয়ের মতো ত্যাগী নেতাকর্মী ছিলো বলেই এই সাফল্য আমরা আনতে পেরেছি এবং এটা আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে,’ যোগ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা (আব্দুল হাই) ছিলো দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ। সততা, নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সঙ্গে কাজ করেছেন। পালন করেছেন অর্পিত দায়িত্ব।
গত ১৬ মার্চ ব্যাংককের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হাই। তিনি ছিলেন টানা পাঁচবারের সংসদ সদস্য।

২০০১ সাল থেকে নৌকা প্রতীকে টানা নির্বাচিত হন আব্দুল হাই। মাঝে কিছুদিন তিনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
সর্বশেষ গত জানুয়ারিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিপুল ভোটে বিজয়ী হন আব্দুল হাই। তবে ভোটগ্রহণ ও ভোট গণনায় অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগে ইসির গেজেট স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে ইলেকশন পিটিশন দায়ের করেন ওই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী নজরুল ইসলাম দুলাল।
আর ভোটের আগে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুই মামলা দায়ের করা হয়।
এসব প্রসঙ্গ তুলে ধরে সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এবারেও এক সময় তাকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চালানো হয়েছিলো। আবার একজন রিট করলো। তার সংসদ সদস্যপদ স্থগিত করা হলো। সেটা আপিল করে স্থগিত করা হয়েছিলো বলেই তিনি এই সংসদে বসতে পেরেছিলেন।’
‘এটা অদ্ভুত ব্যাপার, যিনি বারবার নির্বাচিত হয়ে আসেন, তার ওপর এ ধরনের আচরণ এটা কখনো গ্রহণযোগ্য না,’ মন্তব্য করেন তিনি।
জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল হাই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ঝিনাইদহে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা তুলেছিলেন। তিনি ছিলেন মুজিব বাহিনীর জেলা কমান্ডার। এছাড়া জেলা ছাত্রলীগের সভাপতিসহ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন দায়িত্ব সামলেছেন আব্দুল হাই।
তার কর্মময় জীবনের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আব্দুল হাই স্কুল জীবনেই ছাত্রলীগ করতেন। ছয় দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি আন্দোলনে তার অবদান রয়েছে। আমি ১৯৮১ সালে দেশে আসার পর থেকেই তাকে সব সময় সক্রিয় পেয়েছি।

তিনি বলেন, একদিকে সর্বহারা ও পঁচাত্তরের পর অবৈধ ক্ষমতা দখলের ঘটনার পর, ঝিনাইদহ এমন একটা সন্ত্রাসী এলাকা ছিলো, যেখানে গ্রামে মানুষ টিকতে পারতো না। ওখানে বার বার লাশ পড়তো। সেখানে নির্বাচন ও রাজনীতি করাটা অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। সেই অবস্থার মধ্যেও আব্দুল হাই অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সংগঠন ধরে রাখেন এবং সংগঠনকে সংগঠিত করে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ২০০১ এর নির্বাচনের পরেতো আবার ওই সমস্ত এলাকায় আরো ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়। সেই সময় আমরা আমাদের দলের পক্ষ থেকে টিম করে করে, যেখানে যেখানে কর্মীরা নির্যাতিত সেখানে পাঠাতাম।
‘যারাই যেতো তারাই কিন্তু হামলার শিকার হতো। কখনো বোমা, কখনো গুলির শিকার হতো। আমি নিজেও এ ধরনের হামলার শিকার হয়েছি। কাজেই সেই অবস্থার মধ্য দিয়ে সংগঠনকে গড়ে তুলে নিয়ে এসেছিলেন আব্দুল হাই। তার মতো সাহসী নেতৃত্ব ছিলো বলেই সেটা সম্ভব হয়েছিলো,’ বলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শৈলকুপা এলাকায় তেমন উন্নয়ন ছিলো না। ওই এলাকার নারীদের শিক্ষার জন্য আব্দুল নারী মহিলা কলেজ করেন। তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন, ওই প্রতিষ্ঠানটা তিনি চালাচ্ছিলেন। ওই এলাকার সার্বিক উন্নয়নে তার আন্তরিকতা ছিলো।
শেখ হাসিনা বলেন, আমি তাকে মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দ্বায়িত্ব দিয়েছিলাম। ওই অঞ্চলটায় যাতে কৃষি, মৎস উৎপাদন হয়, সাথে সাথে সারা বাংলাদেশে। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি দ্বায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাছাড়া পার্লামেন্টে বিভিন্ন কমিটিতে সদস্য, চেয়ারম্যান করেছিলাম । সেখানেও তিনি সফলতার সঙ্গে দ্বায়িত্ব পালন করেছেন।
‘দ্বাদশ সংসদ পর্যন্ত সংসদে তিনি যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু এবারে এটাই সব থেকে কষ্ট লাগছে যে, তিনি এই সংসদে থাকতে পারলেন না,’ যোগ করেন তিনি।

দলীয় প্রধান বলেন, তারপরও তিনি আসতে পেরেছিলেন। তারপরই অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমার সাথে শেষ দেখা এখানে, দাঁড়িয়ে কথা বললাম। তখনই দেখলাম, তার শরীরটা খুবই খারাপ।
তাকে ভালো চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা আরেকজন সংসদ সদস্যকে হারালাম। তার যে খুব বেশি একটা বয়স হয়েছিলো তাও কিন্তু না।
‘তারপরেও তিনি এতো অসুস্থ হয়ে গেলেন এবং তারপরেই মৃত্যুবরণ করলেন। আমি আব্দুল হাইয়ের মৃত্যুতে গভীর শোক জানাচ্ছি। তার পরিবারের প্রতি আমার সমবেদনা জানাচ্ছি,’ বলেন প্রধানমন্ত্রী।
শোকপ্রস্তাবের ওপর অন্যদের মধ্যে রাজবাড়ী-২ আসনের রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিম, টাঙ্গাইল-১ আসনের ড. আব্দুর রাজ্জাক, খুলনা-৩ আসনের এসএম কামাল হোসেন, যশোর-২ আসনের মো. তৌফিকুজ্জামান, যশোর-৩ আসনের কাজী নাবিল আহমেদ, ঝিনাইদহ-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নাসের শাহরিয়ার জাহেদী বক্তব্য রাখেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার সাবেক সংসদ সদস্য ড. মোহাম্মদ শামছুল হক ভূইয়া, আবুল হাসেম খান, পিনু খান, নজির হোসেন ও মোখলেসুর রহমান। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম হেলাল, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ড. প্রণব কুমার বড়ুয়া, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অন্যতম নকশাকার শিব নারায়ণ দাস, সাবেক এমপি মরহুম আব্দুর রহিমের স্ত্রী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও হুইপ ইকবালুর রহিমের মা নাজমা রহিম, রবীন্দ্র সংগঠক শিল্পী সাদি মহম্মদ, চাইম ব্রান্ডের ভোকালিস্ট খালিদ, গজল সংগীতের প্রবাদ প্রতীম পঙ্কজ উদাস, টঙ্ক আন্দোলনের নেত্রী কুমুদিনী হাজং ও প্রখ্যাত অভিনেতা আহমেদ রেজা সেলিমের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে সংসদ।
এছাড়া মস্কোর ক্রোকাস সিটিতে সন্ত্রাসী হামলায় হতাহত, গাজা উপত্যকায় আবাসিক ভবনে ইসরাইলের বিমান হামলার হতাহত এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনায় হতাহতের স্মরণে সংসদ শোক জানিয়েছে।
ফেরানো গেলো না এমপি আব্দুল হাইকে
জামিন পেলেন আব্দুল হাই এমপি
ঝিনাইদহ-১ আসনের সংসদ সদস্য পদ হাইকোর্টে স্থগিত