১৬ থেকে ২০ জুলাই, মাত্র চারদিন। কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নেয় এই চারদিনেই। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন পুঁজি করে এই দেশজুড়ে তাণ্ডব আর নৈরাজ্য চালায় দুর্বৃত্তরা। রাজধানীতে তাণ্ডবের ঘটনাগুলো ঘটে মূলত ১৯ ও ২০ জুলাই, অর্থাৎ গেলো শুক্র ও শনিবার। কী ঘটেছিলো এই দুদিনে?
শিক্ষার্থীদের কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি পরিস্থিতি সংঘাত সহিংসতা ও নাশকতায় রূপ নেয় গেলো ১৬ জুলাই। এদিন ঢাকা ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষে মারা যায় ছয়জন। দিনভর উত্তপ্ত ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দেয় সরকার।

পরদিন ১৭ জুলাই সারাদেশে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এদিন নিহতদের স্মরণে শিক্ষার্থীদের গায়েবানা জানাজার কর্মসূচিকে ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দফায় দফায় চলে সংঘর্ষ।
দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। সন্ধ্যায় সংঘর্ষে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া সংঘাত ততক্ষণে ছড়িয়ে পড়ে চানখারপুল এলাকায়। জ্বালিয়ে দেয়া হয় হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজা।
পরদিন ১৮ জুলাই শিক্ষার্থীদের কমপ্লিট শাট ডাউন কর্মসূচিতে রাজধানীসহ দেশের ৪৭টি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে সংঘাত সহিংসতা।

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংঘাত সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনা ঘটে ১৯ জুলাই শুক্রবার। এদিন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পুরো রাজধানীতে তাণ্ডব চালায় দুর্বৃত্তরা। যাত্রাবাড়ি উত্তরা বাড্ডা রামপুরা মহাখালী বনানী ও মীরপুর এলাকা ছিলো কার্যত শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে মিশে যাওয়া দুর্বৃত্তদের দখলে।
এদিন, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রামপুরায় বিটিভি ভবনে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। কর্মীরা মানবঢাল হয়েও বিটিভিকে রক্ষা করতে পারেননি। দুর্বৃত্তদের লক্ষ ছিলো বিটিভির নিয়ন্ত্রণ নেয়া। কিন্তু কক্ষটি খুঁজে না পাওয়া এতে সফল হয়নি দুর্বৃত্তরা।
বনানীর সেতু ভবনে হামলা, মহাখালীর দুর্যোগ ব্যবস্থা অধিদপ্তরে আগুন, মীরপুর ও কাজীপাড়ায় মেট্রোরেলের দুটি স্টেশনে হামলা, উত্তরায় বিআরটি ও এক্সপ্রেসওয়েতে হামলার ঘটনাগুলো ঘটে এদিনই।

২০ জুলাই শনিবার থেকে শুরু হয় কারফিউ। দেশজুড়ে মোতায়েন হয় সেনা বাহিনী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। তবে এদিনও যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, বাড্ডা ও মিরপুর এলাকা ছিলো কার্যত বিভিন্ন বয়সী দুর্বৃত্তদের দখলে। এসব ঘটনায় কোটা আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা ছিলো অনুপস্থিত।
২১ জুলাই রোববার ৯৩ শতাংশ মেধা ও সাত শতাংশ কোটা সংরক্ষণের ঐতিহাসিক রায় দিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরে যাবার আহবান জানান সর্বোচ্চ আদালত।
আদালতের রায়ের আলোকে ২৩ জুলাই মঙ্গলবার কোটাপ্রথা সংস্কার করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।

২৪ জুলাই বুধবার জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে কারফিউ শিথিলের সময় বাড়ায় সরকার। সেই সাথে সীমিত পরিসরে চালু হয় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট। শুরু হয় দূর পাল্লার যানবাহন চলাচল। স্বাভাবিক হয় বাজার ব্যবস্থা।
আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আসা সিসি ক্যামেরার ছবি বলছে, দুর্বৃত্তরা বেছে বেছে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার গৌরবজনক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাণ্ডব চালিয়েছে। মীরপুর ও কাজীপাড়ার দুটি মেট্রো স্টেশনের আর কিছুই প্রায় অবশিষ্ট নেই। কবে এই দুটি স্টেশান চালু করা যাবে সেটি এখনও অনিশ্চিত।
পদ্মা সেতুসহ দেশের সেতু অবকাঠামো গড়ার নেপথ্য প্রতিষ্ঠান সেতু ভবন। এই ভবনটির প্রতিটি ফ্লোরে তাণ্ডব চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন প্রকল্পের মূল্যবান নথিপত্র। ভবনটির কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে রোল মডেলে পরিণত করেছিলো যে প্রতিষ্ঠান; সেটি মহাখালির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। এই ভবনটিরও সীমাহীন ক্ষতি করেছে দুর্বৃত্তরা। পুরো ভবনই এখন প্রায় পরিত্যক্ত।
ধ্বংস প্রায় বনানী ও মিরপুরের বিআরটিএ। সারাদেশের যানবাহনের লাইসেন্সের তথ্য ও অনলাইন সেবার ব্যবস্থা ছিলো যে সার্ভারে, সেটিও ধ্বংস করেছে দুর্বৃত্তরা।
সবচেয়ে বর্বর ঘটনাটি ঘটে যাত্রাবাড়ির শনির আখড়ায়। এক পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করে তার মরদেহ ফুটওভার ব্রিজে ঝুলিয়ে রাখে দুর্বৃত্তরা। সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় এভাবে তিন পুলিশ সদস্যকে হত্যা ও শতাধিক পুলিশকে আহত করা হয়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষসহ কতজনের প্রাণহানি ঘটেছে সেই সংখ্যাটি এখনও স্পষ্ট নয়। কারণ অনেক মরদেহ নিজেরাই দাফন করেছেন স্বজনরা। আবার অনেককে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করেছে বিভিন্ন সংস্থা। বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি এ বিষয়ে দেশবাসীর কাছে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরবে বলে আশা করছে সাধারণ মানুষ।
সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত শিথিল থাকবে কারফিউ
হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বিটিভি পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী