স্বৈরাচার হাসিনা সরকার পতনের পর দেশের দায়িত্ব নেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রায় ১০ মাস ধরে কাজ করে যাচ্ছে এই সরকার। তবে বেশ কিছুদিন ধরে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তারিখ কিংবা রোডম্যাপ জানতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছিলো দলগুলো।

এরই মধ্যে গত ছয় জুন ঈদের আগের দিন সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনের দিন ঘোষণা করেন। ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেওয়া জাতির উদ্দেশে শুভেচ্ছা ভাষণে তিনি জানান, আগামী বছর এপ্রিল মাসের প্রথমার্ধেই সাধারণ নির্বাচন (জাতীয় সংসদ নির্বাচন) অনুষ্ঠিত হবে।
প্রধান দল বিএনপি ও তার কাছাকাছি থাকা দলগুলো নির্বাচনের এই সময় ঠিক হয়নি বলে সমালোচনা করেছে। অনেকেই দেশের অতীতে হওয়া সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়কে রেফারেন্স হিসেবে তুলে ধরছেন।
নব্বইয়ের পর আট নির্বাচন ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারিতে
নব্বইয়ের শুরুতে স্বৈরাচার এরশাদের পতনে পর আটটি জাতীয় নির্বাচনের প্রায় সবগুলোই অনুষ্ঠিত হয়েছে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে। শুধু দুটি নির্বাচন হয় জুন এবং অক্টোবর মাসে।
১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন হয়। এতে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জয়লাভ করে।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যা অধিকাংশ বিরোধী রাজনৈতিক দল বর্জন করে। কয়েকমাস পর সংসদ ভেঙে দেয় তখনকার বিএনপি সরকার।
এর ফলে দেশের ইতিহাসে বর্ষাকালে অর্থাৎ জুন মাসে একটি সংসদ নির্বাচন হয়। সপ্তম সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয় ১৯৯৬ সালের ১২ জুন। জয়লাভ করে সম্প্রতি কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ।
বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যাতে আবারও ক্ষমতায় আসে বিএনপি।
বিএনপির মেয়াদ শেষ হলে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে ক্ষমতায় আসে ১/১১ সরকার। দেড় বছরের অধিক সময় ক্ষমতায় থেকে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন দেয় তারা। যাতে জয়লাভ করে আবারও ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।
পরবর্তীতে বিতর্কিতভাবে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা তুলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে ছাড়াই একপাক্ষিকভাবে দশম সংসদ নির্বাচন করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। যা অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের পাঁচ জানুয়ারি। নির্বাচন নিয়ে সংকটের শুরুই বলা যায় তখন থেকে। সরকারের গঠনের জন্য্ প্রয়োজনীয় দেড়শ’র বেশি আসনে সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হোন বিনা প্রতিদ্বন্দিতায়। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল।
একইভাবে সরকারি দলের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০১৮ সালের ৩০ শে ডিসেম্বর।সেখানেও কৌশল করে, দিনের ভোট রাতে হয়-বলে সমালোচনা করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। বিদেশেও চরম বিতর্কের মুখে পরে সরকার।
আর সবশেষ ২০২৪ সালের সাত জানুয়ারিতে ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ। যা ‘ডামি আর আমি’র নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করেন বিশ্লেষকরা।

এবার এপ্রিলে নির্বাচন কেন
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম একাত্তরকে বলেন, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো নয়। আর রোজা এবং আবহাওয়ার মতো বিষয়গুলো মাথায় নিয়েই ভোট গ্রহণের জন্য সম্ভাব্য সময় বেছে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা ধরে নিচ্ছি ঈদুল ফিতর হবে ১৯ থেকে ২০ মার্চ। এই সময়ে তাপমাত্রা অনেক কম থাকে। রোজার সময় তাপমাত্রা কম থাকতেই দেখা গেছে। এসময় গরম বেশি না পড়ায় মানুষের পক্ষে নিয়মিত প্রচারে কোনো অসুবিধা হবে না।
প্রেস সচিব বলেন, এপ্রিলের ৯ দিন কালবৈশাখী হয়। আর এটা হয় এপ্রিলের ১০ তারিখের পর থেকে।
এদিকে নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে, অভ্যুত্থাণকারী তরুণরাসহ বিভিন্ন দলকে এক করে জুলাই সনদ কিংবা জুলাই ঘোষণার মতো বিষয়ের নিষ্পত্তি করা। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। তৈরি করতে হবে বিতর্কহীন ভোটার তালিকা। সংসদীয় আসনের সীমানা নিয়েও আছে জটিলতা।
প্রেস সচিব বলেন, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় মনে করে, এজন্যই এপ্রিল পর্যন্ত সময় নিয়েছেন তারা।
প্রেস সচিব বলেন, প্রধান উপদেষ্টা স্পষ্টই বলে দিয়েছেন এই সময় নির্বাচন কেন। তিনি বলেছেন, সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। আমরা এই সময়ের মধ্যে সংস্কার ও বিচারের কাজগুলো গুছিয়ে আনবো।
তিনি বলেন, আমাদের ম্যান্ডেট এটাই ছিল। এটা তো আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো নয়, যে আপনি এলেন, আর আপনার কাজই শুধু নির্বাচন। এখানে আমাদের কাজ শুধুই এটা নয়। সংস্কারের মতো বড় একটা কাজ আমাদের আছে।
