বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পরম আরাধ্য ও সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভ আগমনী বার্তা নিয়ে শনিবার উদযাপিত হতে যাচ্ছে পুণ্যলগ্ন ‘শুভ মহালয়া’। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে চণ্ডীপাঠের সুরের মূর্ছনায় পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে সূচনা হবে দেবীপক্ষের। একই সঙ্গে শুরু হবে দুর্গোৎসবের চূড়ান্ত ক্ষণগণনা।
মহালয়া তিথি শুধু দেবী দুর্গার আবাহনের দিনই নয়, এটি পিতৃপুরুষের আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যে জল-তিল উৎসর্গ করে তর্পণ করার এক বিশেষ পবিত্র তিথি।
শাস্ত্রমতে, পিতৃপক্ষে প্রয়াত আত্মারা মর্ত্যলোকে নেমে আসেন, আর ভক্তরা এই শুভ দিনে ব্রাহ্মণ ভোজন ও বস্ত্র দানের মাধ্যমে তাঁদের স্মরণ করে তর্পণ জানান। মহালয়ার পরই শিবের নিবাস কৈলাস ছেড়ে পিত্রালয় মর্ত্যলোকের উদ্দেশ্যে রওনা হন মা দুর্গা। আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মাধ্যমে মূল দুর্গাপূজা শুরু হয়ে ২১ অক্টোবর ‘বিজয়া দশমী’র মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনব্যাপী এই মহোৎসব।
সনাতন শাস্ত্র ও পুরাণ অনুযায়ী, মহালয়া হলো দুর্গোৎসবের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব, যার পরবর্তী ধাপ হলো বোধন ও সন্ধিপূজা। অসীম শক্তির প্রতীক মহামায়া এই মহালয়া তিথিতেই মহিষাসুর বধের দায়িত্ব পান।
মহিষাসুরের উপদ্রবে দেবতারা স্বর্গচ্যুত হলে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের সম্মিলিত তেজ থেকে সৃষ্টি হয় ‘মহামায়া’ দেবী দুর্গা। দেবতাদের ১০টি অস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে সিংহবাহিনী দেবী ৯ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মহিষাসুরকে পরাজিত ও বধ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল উপাসনালয়ের প্রধান পুরোহিত সাধন চক্রবর্তী জানান, শাস্ত্রীয় পঞ্জিকা মতে এ বছর দেবী দুর্গা মর্ত্যে আসবেন ঘোড়ায় (ঘোটক) চড়ে এবং কৈলাসে ফিরে যাবেন নৌকায় চড়ে।
মহালয়া উপলক্ষ্যে আগামীকাল ভোরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি মন্দির ও পূজামণ্ডপে চণ্ডীপাঠ, চণ্ডীপূজা, বিশেষ পূজা এবং ঘট স্থাপনের আয়োজন রাখা হয়েছে। জাতীয় মন্দির ঢাকেশ্বরীতে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছেন মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুবাশীষ কুমার বিশ্বাস সাধন।
এছাড়া রমনা কালী মন্দির, রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির, সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, স্বামীবাগে লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম ও মন্দির এবং জয়কালী মন্দিরসহ সর্বত্র ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হবে আবাহন পর্ব।
পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর জানান, এ বছর সারাদেশে রেকর্ড ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। উৎসবকে আরও আনন্দমুখর ও সহজতর করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় সরকারি অনুদান ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে।
পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দুর্গাপূজার ছুটি বাড়িয়ে তিন দিন করেছে। ফলে সাপ্তাহিক ছুটির দিন (শুক্র ও শনিবার) যুক্ত হয়ে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের এক দীর্ঘ সরকারি ছুটি উপভোগ করবেন দেশবাসী। এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ধর্মীয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
বর্তমানে মণ্ডপে মণ্ডপে প্যান্ডেল নির্মাণ, আলোকসজ্জা, প্রতিমায় শেষ তুলির টান ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন আয়োজকরা। হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে দুর্গাপূজা সামাজিক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক অনন্য জাতীয় উৎসবে পরিণত হতে যাচ্ছে।
