সেকশন

মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
 

সাদি, এখনি কি হল যাবার বেলা!

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৪, ০৫:৪১ পিএম

সাদি আপনি ছিলেন কত জনের কাছের মানুষ। আপনি চলে গিয়ে সকলের হৃদয়ে শুন্যতা তৈরি করে গেলেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং আমরা দিক নির্দেশনা হারিয়েছি। এখন আপনি ওপারে আপনার মায়ের কোলে, ভাই, বোন ও বাবার সাথে শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন।

আপনাকে প্রথম দেখি বিটিভিতে এবং ভাবি আপনি কি আমাকে গান শেখাতে রাজি হবেন? এর পর পরই আপনার সাথে আমার পরিচয় হয় সঙ্গীত ভবনে। আপনি আমাকে রবিরাগে যুক্ত হওয়ার আহ্বান করেন এবং পরবর্তীতে এই রবিরাগেরই সভাপতির দায়িত্বভার আমায় দেন। জার্মান কালচারাল ইন্সটিটিউটে রবিরাগের প্রথম পরিবেশনায় আপনার ভরাট কন্ঠে ‘এ ভরা বাদার’ শুনে মুদ্ধ হই। ১৯৮৭ সালে আপনি আমার বাসায় আসা শুরু করেন। প্রথম দিনের গানের চর্চা আড়াল থেকে শুনে শাহেদ (কাজী শাহেদ আহমেদ, প্রতিষ্ঠাতা, জেমকন গ্রুপ) আমাকে বললো, তুমি সঠিক গুরু পেয়েছো।

আমাদের ১৭তম বিবাহ বার্ষিকীতে আপনি প্রথম আমাদের বাসায় গান পরিবেশন করেন। প্রায় দুইশত আত্বীয় স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব আপনার গান শুনে মুগ্ধ হয়েছিল এবং তারা আমাকে বলেছিলো, মিনা তুমি এনাকে কী করে পেলে? এরপর থেকে আপনার পরিবেশনা ছাড়া আমাদের পারিবারিক কোন অনুষ্ঠান হতো না। যেমন শাহেদের জন্মদিন এবং ছেলেদের বিয়ে। আমাদের পঁচিশতম বিবাহ বার্ষিকীতে আপনি গাইলেন। কত গুনীজন- অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, কবি শামসুর রাহমান, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক মুগ্ধ হয়ে শুনেছেন আপনার গান। এরপর আমাদের বিয়ের ৫০ তম অনুষ্ঠানেও আপনি দিলেন এক মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যা।

সব স্মৃতি ও ঘটনা লিখতে গেলে বই লেখা হয়ে যাবে। আমি কাছে থেকে দেখেছি একটা চিলে কোঠার এক কামরায় আপনি অতি সাধারণ জীবন কাটিয়েছেন। সেই কামরার মাটিতে একটি গদি এবং এক কোনায় একটা আলমারি। আপনার অনুষ্ঠানের জন্য কয়েকটি ডিজাইন করা শার্ট আলমারির হ্যান্ডেলে ঝুলতো এবং পারফিউম থাকত টেবিলে। সেই কামরা ছিলো খুব রুচিশীল।  তিন দিকের দেয়াল জুড়ে জানালা পর্যন্ত একটা সুন্দর ডিজাইন করা কাঠের সেলফ- আপনার শামীম’দা আপনাকে করে দিয়েছিল।  আপনার কিছু ক্রেস্ট এবং শৈল্পিক কারুকর্ম- সেখানে সাজানো ছিলো।  রুপমের তৈরি ল্যাম্পশেড দিয়ে আপনার রুমের লাইটিং খুব আকর্ষণীয় ছিলো।

আপনার কাছে গান তোলা এত সহজ ছিলো যে কখন যে গানটা তোলা হয়ে গেলো বুঝতেই পারতাম না। রবিরাগ এবং নৃত্যাঞ্চলের রিহার্সেলর সময়গুলো খুব মজার এবং আনন্দের ছিলো। তিন-চার ঘন্টা কোন সময়ই মনে হতো না। এদিকে সবার খিদে লেগে গেলে গরম খিচুড়ি ও ডিম রান্না হতো। এক সাথে খাওয়ার মধ্যে ছিলো আমাদের সকলের ঘনিষ্ঠতার সুবিমল আনন্দ।

আপনি ছিলেন ধীর স্থির ও বুদ্ধিমান। কার গলায় কী গান মানাবে আপনি সঠিক চয়েস করে দিতেন। আপনি এত সেনসিটিভ ছিলেন যে যাদের গান শেখার সামর্থ্য ছিলো না তাদের বিনা পয়সায় গান শেখাতেন আপনি (অনেকেই যেটা হয়তো জানে না)।

আপনি বাজার করতে পছন্দ করতেন এবং কিছু কিছু রান্নাও করতেন। আপনি গান শেখানোর পাশাপাশি আমাদের আপ্যায়নও করতেন। রমজান মাসে ইফতারির আয়োজন থাকতো। এভাবেই আমরা ‘রবিরাগ’ হয়ে উঠেছিলাম একটা পরিবার।

আপনি ছিলেন আমার গুরু, ছোট ভাই, বন্ধু। আমার পাশ্চাত্য শিক্ষা এবং পাশ্চাত্য সঙ্গীতের ট্রেনিং নিয়ে শুরুতে রবীন্দ্র সঙ্গীত শেখানো কিছুটা চ্যালেঞ্জ ছিলো। কিন্তু আপনি আমাকে আনন্দের সাথে শেখাতেন এবং ভুলগুলো হেসে উড়িয়ে দিতেন। একটা ছোট ঘটনা মনে পড়ে; আপনি যখন আমার ১৪টা গানের একক ক্যাসেট রেকডিং করেন ১৯৮৮ সালে। হঠাৎ আমার পাশে এসে বললেন যে, এই গানটা ডুয়েট হবে। আমি হতভম্ব যে এত বড় শিল্পীর সাথে ডুয়েট করবো। কিন্তু ভিতরে ভিতরে আমি খুব আনন্দিত। গান দুটি ছিলো;  ‘হৃদয়ে মন্দ্রিল ডমরু গুরু গুরু’,‘পুরানো সেই দিনের কথা’। এই প্রথম ডুয়েট আপনার সাথে’।

হারানো দিনের গান, পঞ্চ কবির গান, আপনার নিজস্ব সুর করা গান ও বাংলার গানের মধ্য দিয়ে আপনি নতুন প্রজন্মকে বাঙালীর সংস্কৃতি এবং বাংলা গানের ব্যাপারে আগ্রহী করেছিলেন।

বাবার মৃত্যুকে সামনে থেকে দেখে ভীষণ ট্রমার মধ্যে দিয়ে আপনি বড় হয়েছেন। তারপরে সঙ্গীত জগতেও নানা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও আপনি নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এখন আপনি একজন কিংবদন্তী শিল্পী হিসাবে অমর হয়ে আছেন। আমরা এখন আপনাকে ভোরের শিশিরে খুঁজে বেড়াচ্ছি।

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে শহীদ হওয়া বাবা সলিমউল্লাহর বাঙালি সংস্কৃতি এবং চেতনার প্রতি যে বিশ্বাস ছিলো সেই চেতনা এবং বিশ্বাস নিয়ে আপনারা বড় হয়েছেন। আপনার রত্নগর্ভা মা জেবুনেচ্ছা অনেক সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে দশ ছেলে-মেয়েকে মানুষ করেছেন। সেই মায়ের মৃত্যুতে আপনি মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন।  তার ক’দিন পরেই আপনি সাহসের সাথে দুই হাঁটুর সার্জারি করেন এবং সুস্থও হয়ে যান। আপনার প্রিয় আপা পারভীন গত বছরের শেষের দিকে চলে যান। আপনি গভীর বিষণ্ণতা ও একাকিত্বে পড়ে যান। আমরা কাছে থেকে টের পেলেও আপনার জমে ওঠা সকল দুঃখ ও বঞ্চনাবোধ লাঘব আমরা করতে পারিনি।

আমার সব সময় চিন্তা ছিলো যে আপনার মা চলে গেলে আপনি কী করবেন? দুঃখের বিষয় সেই সময়টায় শাহেদও পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। শাহেদ আপনাকে ভীষণ ভালোবাসতো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শের পুনর্জাগরণে শাহেদ যেমন ছিল ডেডিকেটেড, সেই অভিযাত্রায় সে আপনাকেও দেখতো একজন অগ্রদূত হিসেবে। সে বলতো আপনি আমাদের গানের জগতের একজন প্রাণপুরুষ।

সৃষ্টিকর্তা মানুষকে অনেক রকম পরীক্ষায় ফেলে, আপনি তো হাসি মুখে এরকম পরিস্থিতি অনেক পার করেছেন। এবারো কি সেটা করা সম্ভব ছিলো না? 

চলতি বছর ১৪ই জানুয়ারি আসলেন আমার বাসায়। আমরা কত পরিকল্পনা করলাম। আমার সিডি ও ডুয়েট গুলো শেষ করবো। এবং আমাদের দুজনের অনেক ডুয়েট গান আছে সেগুলো ভিডিও করবো। এখন আফসোস হয় যে হয়তো এটাতে আপনি ব্যস্ত হয়ে গেলে আনন্দ আসতো মনে। এটা আমার এক ভীষণ পাওয়া হতো। হায়! সে আর হলো না। 

১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে আমার বাসায় শেষ আসা; ফুল দেওয়া নেওয়া হলো। নাবিল আসলো সাইরাসকে নিয়ে; ওদের আনা ফুল নিয়ে ছবিও তোলা হলো। কে জানতো এই শেষ; শেষ ছবি!

আপনি আমার গুরু হলেও, আমি ছিলাম বয়সে বড়। আমি ভাবতাম আপনি আমাকে গানে গানে বিদায় দেবেন। অথচ আমাকেই বিদায় জানাতে হল ছোট ভাইকে - এটা এক অবর্ণনীয় বেদনা! যেখানে আছেন ভালো থাকুন। এই পৃথিবীর দুঃখ থেকে আপনি বিদায় নিলেন। কিন্তু আপনার রেখে যাওয়া গানের সুরে আমরা ধরে রাখব আপনাকে।

লেখক পরিচিতি: সভাপতি, রবিরাগ।
এনএন
ঘূর্ণিঝড় দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে বৃহস্পতিবার পটুয়াখালী যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডবে সুন্দরবনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এরইমধ্যে ২৬টি মৃত হরিণ উদ্ধার করেছে বন বিভাগ।
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিমের দেহাংশ পাওয়া নিয়ে ক্রমেই জটিলতা বাড়ছে। মৃত্যুর পর পেরিয়ে গেছে বহুদিন। এরমধ্যে পুরো কলকাতা তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেহের একটি অংশও উদ্ধার করতে পারেনি তদন্তকারী...
রোববার রাত থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত বাংলাদেশের স্থলভাগে ৪০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তাণ্ডব চালিয়ে ঘূর্ণিঝড় রিমাল বিদায় নিলেও রেখে গেছে বিশাল সব ক্ষতচিহ্ন।
লোডিং...
Nagad Ads
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর


© ২০২৪ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত