কামাল ট্রেডিং থেকে এমজিআই: এক শিল্প উদ্যোক্তার অর্ধশতকের রূপকথা!

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৬ পিএম

পাড়ার মুদির দোকানের শেলফে ‘ফ্রেশ’ ব্র্যান্ডের কোনো পণ্য, বাসার রান্নাঘরে সয়াবিন তেল, লবণ কিংবা চিনি, অফিসের টেবিলে ফ্রেশ পেপার, শিশুর যত্নে হ্যাপি ন্যাপী, বসতবাড়ি বা বহুতল ভবনের নির্মাণকাজে সিমেন্ট, কারখানায় ব্যবহৃত রড ও কেমিক্যাল, রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি কিংবা বঙ্গোপসাগরে পণ্য পরিবহনকারী বিশাল মাদার ভেসেল—দৈনন্দিন জীবনের নানা স্তরে আমরা যে পণ্য ও সেবাগুলো ব্যবহার করছি, তার একটি বড়ো অংশই আসছে একই শিল্পগোষ্ঠী থেকে। অনেকেই হয়তো খেয়াল করেন না, দৈনন্দিন জীবন ও শিল্প খাতের এতোগুলো বৈচিত্র্যময় ক্ষেত্র একক এক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাত ধরে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আর এটিই হলো মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডিাস্ট্রিজ বা এমজিআই (MGI)।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এমজিআই-এর বার্ষিক টার্নওভার প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৩৬ কোটি কোটি টাকা। গ্রুপের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, তাদের ৫৭টিরও বেশি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইউনিট, ৬৫ হাজারেরও বেশি কর্মী, ছয় হাজার ৬৫০ জন পরিবেশক (ডিস্ট্রিবিউটর) এবং ২০ হাজার সরবরাহকারী রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ৫২টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে তাদের পণ্য। তবে এমজিআই-এর এই সুবিশাল আকার বা টার্নওভারের চেয়েও সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো—কীভাবে তারা বিগত কয়েক দশকে শূন্য থেকে এই অবস্থানে এসে পৌঁছালো।

পুঁজি ছিলো মাত্র ৬৫০ টাকা

এমজিআই-এর সাফল্যের সূচনা হয়েছিল অত্যন্ত বিনম্রভাবে। ১৯৭৬ সালে মোস্তফা কামাল মাত্র ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা আনুমানিক মূলধন নিয়ে চালু করেছিলেন ‘কামাল ট্রেডিং কোম্পানি’। এটি ছিলো কেবলই একটি ট্রেডিং ব্যবসা। এর ঠিক ১৩ বছর পর, ১৯৮৯ সালে ‘মেঘনা ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ’ স্থাপনের মাধ্যমে ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন শিল্পে গ্রুপটির প্রথম বড়ো পদক্ষেপ ঘটে। এরপর ১৯৯৩ সালের দিকে দুগ্ধ ও খাদ্যপণ্যের সঙ্গে বাজারে আত্মপ্রকাশ করে তাদের ফ্ল্যাগশিপ ব্র্যান্ড ‘ফ্রেশ’ (Fresh)।

এমজিআই-এর বৃদ্ধির মূল কৌশলটি ছিলো সমস্যার ভেতর থেকেই নতুন ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করা। তারা কোনো নির্দিষ্ট একটি ব্যবসায় সফল হয়ে থমকে থাকেনি, বরং মূল ব্যবসার চারপাশের চ্যালেঞ্জগুলোকে নিজস্ব ব্যবসায় রূপান্তরিত করেছে। যেমন—ভোজ্যতেল উৎপাদনের পর তা বাজারজাত করতে প্যাকেজিংয়ের প্রয়োজন হলে তারা নিজেরা প্যাকেজিং শিল্পে বিনিয়োগ করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কাঁচামাল আমদানির জন্য শিপিং প্রয়োজন হলে গঠন করেছে নিজস্ব মেরিন বা সমুদ্রগামী জাহাজ বহর। আবার শিল্প সম্প্রসারণের জন্য ভূমির ঘাটতি দেখা দিলে গড়ে তুলেছে নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চল।

এই ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড ইন্টিগ্রেশনের ফলে এমজিআই কেবল পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোসিস্টেম’-এ পরিণত হয়েছে। ডেইলি স্টার-এর এক সাক্ষাৎকারে এমজিআই-এর প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা কামাল নিজেই উল্লেখ করেছিলেন, কার্টন, ড্রাম এবং শিপিংয়ের প্রয়োজনীয়তা থেকেই কীভাবে তাদের নতুন নতুন ব্যবসায় পদার্পণ ঘটেছিলো।

পরবর্তী সময়ে এমজিআই-এর সম্প্রসারণের গতি আরও ত্বরান্বিত হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে আটটি এবং ২০২০ সালে আরও ৯টি নতুন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইউনিট স্থাপন করে গ্রুপটি। বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালের মধ্যেও এমজিআই তাদের বিনিয়োগ থামায়নি; ২০২০ সালে প্রায় ৪৫১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে তারা ৯টি ইউনিট গড়ে তোলে।

পণ্য থেকে শক্তি: সর্বব্যাপী উপস্থিতি

বর্তমানে এমজিআই কেবল নিত্যব্যবহার্য খাদ্যপণ্য বা এফএমসিজি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এমজিআই-এর ওয়েবসাইটের বিজনেস ম্যাপে ২৩টি বড়ো ক্যাটাগরি এবং তাদের এক্সপোর্ট পেজে ৫৭টির বেশি বিজনেস ভার্টিক্যালের কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-

এফএমসিজি: ভোজ্যতেল, গুঁড়ো দুধ, আটা-ময়দা, চাল, লবণ, চিনি, ডাল, পানীয়, মসলা, বিস্কুট, নুডুলস, স্ন্যাকস, কনফেকশনারি ও কেক।

বিল্ডিং মেটেরিয়ালস: সিমেন্ট, স্টিল, সিরামিকস, ব্রিকস ও ব্লকস, পাথর ও অ্যালুমিনিয়াম।

কেমিক্যালস ও এনার্জি: বেসিক কেমিক্যালস, পেট্রোকেমিক্যালস, এলপিজি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন।

পাল্প, পেপার ও স্টেশনারি: টিস্যু, পেপার, খাতা, কলম ও অন্যান্য শিক্ষা সামগ্রী।

হেলথ অ্যান্ড হাইজিন: বেবি ডায়াপার, স্যানিটারি ন্যাপকিন, বেবি ওয়াইপস।

এছাড়াও ফিড, সিড ক্রাশিং, ফাইবার ব্যাগ, লজিস্টিকস, শিপিং, অ্যাভিয়েশন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ক্যাপিটাল মার্কেট, হেলথকেয়ার, আইটি, রিয়েল এস্টেট, খুচরা ব্যবসা (রিটেইল), স্পোর্টস ও হসপিটালিটি খাতে তাদের সুদৃঢ় পদচারণা রয়েছে। এমনকি সোলার, গ্লাস, জাহাজ নির্মাণ (শিপবিল্ডিং), ডকইয়ার্ড এবং মিডিয়া খাতের মতো জটিল শিল্পেও গ্রুপটি যুক্ত রয়েছে। শিল্প সম্প্রসারণের এই রূপকল্প বাস্তবায়ন করতে তারা গড়ে তুলেছে চারটি বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল—মেঘনা ইকোনমিক জোন, মেঘনা ইন্ডিাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোন, কুমিল্লা ইকোনমিক জোন এবং তিতাস ইকোনমিক জোন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এমজিআই-এর ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট ট্রেড ফ্লো ছিলো প্রায় ২.৮৩ বিলিয়ন ডলার। যদিও এই বিশাল লেনদেন সরাসরি রাজস্ব বা মুনাফা নয়, তবুও এটি তাদের বিশাল শিল্প পরিধির সাক্ষ্য দেয়।

ব্র্যান্ড আর্কিটেকচার ও ‘ফ্রেশ’-এর ট্রাস্ট ট্রান্সফার

এফএমসিজি ক্যাটাগরিতে এমজিআই-এর সবচেয়ে বড়ো ব্র্যান্ড অ্যাসেট হলো ‘ফ্রেশ’। বাংলাদেশে ‘ফ্রেশ’ শব্দটি বহু আগে থেকেই টাটকা ও সতেজ ধারণার সমার্থক। এই শক্তিশালী নামটিকে কেন্দ্র করে এমজিআই তাদের একের পর এক নতুন ক্যাটাগরির পণ্য বাজারে এনেছে। যখন একজন ভোক্তা একটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে ফ্রেশ ব্র্যান্ডের ওপর ভরসা পান, তখন অন্য ক্যাটাগরিতে নতুন পণ্যের বেলায় মনস্তাত্ত্বিক দ্বিধা বা ট্রায়াল ব্যারিয়ার কমে যায়। এমজিআই এই বিশ্বস্ততা বা ‘ট্রাস্ট-ট্রান্সফার মেকানিজম’ অত্যন্ত সফলভাবে প্রয়োগ করেছে। এমজিআই-এর চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিজেও ফ্রেশ-কে ‘আস্থা ও গুণমানের’ প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ডায়াপার খাতের নতুন সমীকরণ

একসময় বাংলাদেশের ডায়াপার বাজার সম্পূর্ণ বিদেশি ব্র্যান্ডনির্ভর ছিলো। ২০১৫ সালের ডেইলি স্টার-এর তথ্য অনুযায়ী, এক দশক আগে দেশীয় উৎপাদকদের শেয়ার ছিল মাত্র ১৫ শতাংশের মতো। কিন্তু বাসুন্ধরা, স্কয়ার (সুপারমম), ইনসেপ্টা (নিওকেয়ার) এবং পরবর্তীতে ২০২১ সালে এমজিআই-এর ‘ফ্রেশ হ্যাপি ন্যাপী’ প্রবেশের পর দৃশ্যপট বদলে যায়।

আমদানি করা পণ্যের ওপর থেকে নির্ভরতা ২০১৪ সালের ৭০% থেকে কমে ২০১৯ সালে ৪০%-এ নেমে আসে এবং ২০২৪ সালে এসে দেশের চাহিদার ৮০%-এর বেশি স্থানীয় উৎপাদকরাই পূরণ করছে। এমজিআই ইমপোর্টেড কাঁচামাল ও উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে হ্যাপি ন্যাপী বাজারে এনে ডায়াপার বাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

৫০ বছরের মাইলফলক ও ২০২৬-এর অভিযাত্রা

৫০ বছর পার করলেও এমজিআই-এর সম্প্রসারণ থমকে নেই। ২০২৬ সালেও তাদের নতুন নতুন উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। নতুন ক্যাটাগরিতে তারা নিয়ে এসেছে ‘ফ্রেশ কফি’ এবং নারীদের পিরিয়ডকালীন স্বাস্থ্যের কথা ভেবে ‘ফ্রেশ অনন্যা’ মেন্সট্রুয়াল হাইজিন পণ্যের সার্বিক সহজলভ্যতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

৬৫০ টাকার মূলধন থেকে শুরু করে একটি ট্রেডিং ব্যবসাকে কয়েক দশকের ব্যবধানে হাজার হাজার কোটি টাকার শিল্প সাম্রাজ্যে রূপান্তর করা কেবল ক্যাপিটালের গল্প নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি ক্যাশফ্লো পুনঃবিনিয়োগ, সঠিক সময়ে ঝুঁকি নেওয়া এবং ক্রাইসিসকে অপরচুনিটিতে রূপান্তর করার গল্প। এমজিআই-এর এই যাত্রা মূলত একটি দেশীয় কোম্পানি কীভাবে ধারাবাহিক ব্র্যান্ডিং, বিতরণ ব্যবস্থা ও ম্যানুফ্যাকচারিং সক্ষমতা তৈরি করে বৈশ্বিক মানের বিশাল শিল্প সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পারে—তারই এক অনন্য নিদর্শন।

এদিকে বিভিন্ন দুর্যোগেও মানুষের পাশে দাঁড়ায় মেঘনা গ্রুপ। চব্বিশের বন্যায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি পক্ষ থেকে জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় ১৮ হাজার পরিবারে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়। এছাড়া নানা সামাজিক কার্যক্রমেও আছে মেঘনার আন্তরিক উপস্থিতি।

প্রতিষ্ঠানটির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘মেঘনাপারের যাদুকর’ হিসাবে খ্যাত মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল জানান, বর্তমানে বিশ্বের ৫২টি দেশে মেঘনার পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। নিত্যনতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দেওয়াই তার লক্ষ্য।

সেদিন কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এমজিআই চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, যাত্রাপথটা সহজ ছিলো না। ছিলো পদে পদে বাধা আর আর্থিক সঙ্কট।  সততা, সাহস আর কাছের মানুষকে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার তিন বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। স্থানীয় মুদ্রায় হিসাব করলে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। সরকারকে রাজস্ব দিয়েছি ছয় হাজার কোটি টাকা।

তথ্যসূত্র: InvestWiser

একাত্তর/এসি
অধিনায়ক রাফিনহার হ্যাটট্রিকের ঝলকে সেভিয়ার ঘরের মাঠে ১-৩ গোলের উড়ন্ত জয় নিয়ে লা লিগায় নিজেদের জয়ের ধারা অক্ষুণ্ণ রাখল বার্সেলোনা। ম্যাচের শুরুতে গোল হজম করে পিছিয়ে পড়লেও ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার...
রাজধানীর মিরপুরে ফাঁকা বাসার সুযোগ নিয়ে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ অর্থ চুরির ঘটনা ঘটেছে। পুরো চুরির দৃশ্যটি ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।
প্রিমিয়ার লিগের চ্যাম্পিয়ন আর্সেনালের উড়ন্ত সূচনায় যেন এক বালতি ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিল ব্রাইটন অ্যান্ড হোভ অ্যালবিওন। শনিবারে নিজেদের ঘরের মাঠে একের পর এক আক্রমণে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের একেবারে...
ভারত থেকে আওয়ামী লীগের পলাতক কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনায় ও হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো অর্থ সহায়তায় রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণসহ নাশকতামূলক কাজ করছেন দলটির নেতাকর্মীরা। রাজধানীর...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর