স্বাধীনতার পর কেউ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের স্বার্থ দেখেনি বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক অনুষ্ঠানে একথা বলেন তিনি।
হাজারও ক্ষুদ্র জাতি সত্বার ভাষা আর সংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে এই ভূখণ্ড। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পার্বত্য অঞ্চলে কিংবা সমতলে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি।
ঐতিহ্যগত বিদ্যা সংরক্ষণ ও বিকাশে আদিবাসী নারী সমাজের ভূমিকা; এই শিরোনামে এবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস।
করোনার কারণে টানা দুই বছর আদিবাসী দিবসের প্রকাশ্য অনুষ্ঠান বন্ধ ছিল। এবারে তাই শহীদ মিনারে আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠান ঘিরে ছিল উচ্ছ্বাস।
অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি লারমা বলেন, আদিবাসীদের চিরতরে বিলুপ্ত করতে চায় শাসকগোষ্ঠী। সরকার আদিবাসীদের সর্বস্বান্তকরণের চেষ্টা করছে।
১৯৭২ সালে সংবিধান রচনার মাধ্যমে আদিবাসীদের পরিচয় হরণ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল-সবাই বাঙালি। আদিবাসীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন সামরিক শাসন চলছে। আদিবাসীদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এমন কোন পরিবার নেই যে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমা অভিযোগ করেন, দেশের স্বাধীনতার পর থেকে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা কেউ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের স্বার্থ দেখেনি। সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকার উন্নয়নের গালভরা বুলি দিচ্ছে। উন্নয়নের নামে আসলে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করার চেষ্টা চলছে।
সন্ত লারমা বলেন, ১৯৭২ সালে যখন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান রচিত হয়েছিল, সেখানেই ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের অধিকার হরণ করা হয়েছিল। এই প্রক্রিয়া এখনো চলছে।
সরকারের উদ্দেশ্যে সন্তু লারমা বলেন, আপনারা ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন। এর আগেও ক্ষমতায় ছিলেন। কিন্তু পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে কার্যকর কিছু করেননি।
বেলুন উড়িয়ে এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন নাট্যকার মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, শান্তি চুক্তির পরিণতি এখনও দৃশ্যমান হয়নি। সমতলে আদিবাসী হত্যার বিচার হয়নি।
আদিবাসী বলা যাবে না বলে যে সার্কুলার জারি হয়েছিল তারা কারা? তারা বলছে আদিবাসীর সংখ্যা কমছে। কিন্তু আদিবাসীর সংখ্যা কমছে না, এরা লুণ্ঠিত হয়ে চলে গেছে।
আদিবাসী নারী পরিষদের সভাপতি বাসন্তী মুর্মু বলেছেন, পাহাড় ও সমতলর আদিবাসীদের জন্য জাতীয় সংসদে দুইটি সংরক্ষিত আসন বরাদ্দ রাখতে হবে।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, আদিবাসীর পরিবর্তে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শব্দের ব্যবহারকে ‘অবমাননাকর’।
তিনি আরও বলেন, আদিবাসীদের সমস্যা সামাজিকভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। তাদের সমস্যা সমাধান করতে হবে রাজনৈতিকভাবে। এজন্য শান্তি চুক্তি করতে হবে।
সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, আদিবাসীদের জমি জালিয়াতি করে নেওয়া হচ্ছে। পাহাড়ে ভূমি কমিশন কাজ করছে না আর সমতলে ভূমি কমিশন নেই।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, আজকে যারা বলেন-আদিবাসী বললে সংবিধান লঙ্ঘন হবে, তারা আসলে সংবিধান বুঝেন না।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের জন্য আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম। আজ বৈষম্য হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে মানবাধিকারকর্মী খুশি কবির বলেন, আদিবাসীদের নিয়ে যে সার্কুলার জারি করা হয়েছে-তা মেনে নেওয়া যাবে না। আদিবাসীদের জয় অবশ্যই হবে।
বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, শাসকরা আদিবাসীদের গণমানুষ বলে মনে করে। তাদেরকে নাগরিক বলে মনে করে না।
সঞ্জীব দ্রং বলেন, আদিবাসীদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলে অপমান করা হচ্ছে। তৃণমূলে আদিবাসীরা বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা মানুষ, আমরা বাঁচতে চাই, আমাদেরকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আদিবাসী কালচারাল ফোরামের উদ্যোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে বের করা হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা।
একাত্তর/এআর
