পচাত্তরের পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ভিন্ন পথে চালিত করা, বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে প্রজন্মের সামনে না আনা এবং বহুমুখী পাঠ্যক্রমের কারণে স্বাধীনতার অবিনাশী চেতনাকে বাস্তবায়ন করা যায়নি বলে মনে করেন দেশের বিশিষ্টজনরা।
শনিবার সকালে রাজধানীর বনানীর ঢাকা গ্যালারিতে এডিটরস গিল্ড আয়োজিত ‘স্বাধীনতার অবিনাশী চেতনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে দেশের বিশিষ্টজনরা এসব কথা বলেন। বৈঠক সঞ্চালনা করেন এডিটরস গিল্ডের সভাপতি মোজাম্মেল বাবু।
একাত্তর টিভিতে সরাসরি সম্প্রচারিত এই বৈঠকে বক্তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশের আঁতুড়ঘর হচ্ছে শিক্ষা। এই শিক্ষাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সপক্ষে বিনির্মাণ করতে না পারায় গত ৪০ বছর ধরে বেশ কয়েকটি প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতাকে অর্থহীন করে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তাই, এই বিভক্ত জাতির বিভাজন দূর করতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তকরণসহ সমাজ ও পরিবারে এর চর্চা বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা।

বৈঠকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের রচয়িতা এবং সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা আমির-উল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের মূল বিষয়টা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার। কিন্তু আজকের দিনে এই তিনটাই উল্টে গেছে। এগুলোকে মূল্যায়ন করছি না।
তিনি বলেন, বই-পুস্তকেও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পড়ানো হয় না। এবং আমাদের সমাজে নতুন প্রজন্ম এই তিনটির একটিও খুঁজে পায় না। এটি হচ্ছে বড় দুঃখের। দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে যেটা গড়ে ওঠার কথা ছিল সেটা হচ্ছে না। সাম্য না হয়ে এটা বৈষম্য হচ্ছে। মানবিক মর্যাদা না হয়ে অমানবিকতার মধ্যে আছি। আর সামাজিক ন্যায় বিচার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই কষ্টার্জিত স্বাধীনতাকে রক্ষার্থে পাঠপুস্তক, শিক্ষক ও সমাজে এর চর্চা বাড়াতে হবে।
মুজিবনগর সরকারের অন্যতম এই সংগঠক আরও বলেন, স্বাধীনতার লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না, তার অন্যতম প্রধান কারন বহুমুখী পাঠ্যক্রম। স্বাধীনতা চেতনা সেখানে ফুটে উঠছে না। সমাজে এখন সামাজিক ন্যয়বিচার, সাম্যবাদ খুজে পাই না। এত শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা তা রক্ষায় কোন পদক্ষেপ নেই। এটি আমার দুঃখ।

শিক্ষাবিদ ও শহীদ বুদ্ধিজীবী জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, ৭৫ এর আগে বঙ্গবন্ধু যখন শাসন করছিলেন, তখন বই পুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের কথা ছিল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা ছিল, চার রাষ্ট্র নীতির কথা ছিল। ৭৫ এর পরে এগুলো রাতারাতি বদলে দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর নাম ছিল না, মুক্তিযুদ্ধ ছিল তাও এক পাশের কথাবার্তা।
তিনি আরও বলেন, এভাবে কয়েকটি প্রজন্ম গেছে যাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর যখন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার ক্ষমতায় আসলো, তখন মুক্তিযুদ্ধের কথা বই-পুস্তকে নিয়ে আসলো। এখন প্রত্যেকটি বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক কথা আছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করার জন্য চেষ্টা হচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, সংবিধানের অধিকার এবং জনগণের অধিকার আদায়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে আন্দোলনটি বঙ্গবন্ধু অসাধারণ প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা নিয়ে করলেন, আমরা কিন্তু এখনও তার পুরো মাত্রাটা অনুধাবন করতে পারছি না। ফলে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে এই মূল্যবোধটাকে আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম নিয়ে যাবো। তার অর্থ হচ্ছে এটাকে সার্বজনীন মূল্যবোধ হিসেবে স্বীকৃত করতে হবে, তারপর রাজনৈতিক বিভাজন থাকবে, মত পার্থক্য থাকবে। নানা সমালোচনা, আত্মসমালোচনা পারস্পরিক থাকবে।

সাবেক চেয়ারম্যান ইউজিসি অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, ৭৫ এর পর আমরা তিনটি প্রজন্মকে হারিয়ে ফেলেছি, যারা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে নাই। এখানে আমি তাদের দোষ দেবো না, এটা আমাদের দোষ, পরিবারের দোষ, পক্রিয়ার দোষ, স্কুলিংয়ের দোষ। এসব তো স্কুলে শেখানোর কথা। আর এগুলো বাস্তবায়ন করার কথা সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। আর তারা কি করেন? সচিবালয় কক্ষে বসে আরাম করেন। কিন্তু বাহিরে কি হচ্ছে তা জানেন না। এখন সরকারের মধ্যে অনেকগুলো সরকার হয়েছে। তাদের ক্ষুদ্র অংশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন। আর বড় অংশ এগুলো বিশ্বাস করেন না। তারা বর্তমান নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। অতীতে ৫০ বছর আগে কি হয়েছে তা নিয়ে চিন্তা নেই।
মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ৮ এর সাব সেক্টর কমান্ডার বীর বিক্রম মাহাবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে সময় যারা বিরোধীতা করেছে তারা কিন্তু এখনো স্বধীনতাবিরোধী অবস্থানেই আছে। তাদের ছেলেমেয়েরা এখনো সক্রিয়। এখনো এমন গোষ্ঠী আছে যারা রাষ্ট্রকে মানে না।
বৈঠকে সংস্কৃতিজন নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, যে লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্বাধীনতা এসেছে তা অর্জনে অনেকাংশে আমরা ব্যার্থ হয়েছি। সে সুযোগটাই স্বাধীনতাবিরোধীরা নেয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় কি পড়ানো হয়েছে ১৯৭৫ থেকে ২০০৯; মাদ্রাসা শিক্ষায় কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রয়েছে। শুধু বাংলা মাধ্যমে আছে। একদল বিরোধী চেতনা নিয়ে বড় হচ্ছে।
বৈঠকে বক্তারা আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড এবং চার নেতার হত্যা একই সূত্রে গাথা। এখন সময় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে জাতিয় জাগরণ তৈরি করা। গণতন্ত্র আলোচনা নয় চর্চার বিষয় নয়। তাই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাধীনতা স্বপক্ষের দিবসগুলোকে পালন করতে হবে। সেই সঙ্গে ১০ এপ্রিলকে প্রজাতন্দ্র দিবস ঘোষণা করার দাবিও জানান বিশিষ্টজনেরা।
একাত্তর/আরবিএস
