রাজধানীতে সবুজ আছে মাত্র সাত শতাংশ। অথচ থাকা দরকার কমপক্ষে ১৫ শতাংশ। আর, দখল হতে হতে জলাভূমি টিকে আছে মাত্র দুই দশমিক ৯ শতাংশ।
পরিবেশবিদরা বলছেন, রাজউকসহ সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই এই শহরকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। চলমান তীব্র তাপদাহের প্রেক্ষিতে এক আলোচনা উঠে আসে এসব কথা।
গেলো ২৮ বছরে রাজধানীতে উন্নয়নের নামে সব সবুজ ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। একটি আদর্শ শহরের জন্য গাছপালা থাকা দরকার কমপক্ষে ১৫ শতাংশ।
কিন্তু ঢাকায় এখন সবুজের উপস্থিতি মাত্র সাত শতাংশ। বিভিন্ন উন্নয়ন, আর ভূমিদস্যুদের দখলে ভরাট হতে হতে জলাভূমি টিকে আছে মাত্র দুই দশমিক ৯ শতাংশ।
পুরনো ঢাকায় এখনও যে দু’একটি জলাশয় টিকে আছে তার একটি গেন্ডারিয়ার ডিআইট পুকুর। এটিও দখলের পাঁয়তারা চলছে। পুকুরটির চারপাশে মাটি ফেলে করা হয়েছে কমিশনার কার্যালয়।
তোলা হয়েছে দোকানপাট আর রিকশা গ্যারেজ। গেলো ১০০ বছরে পুরান ঢাকার ৯৬টি পুকুর বিলীন হয়েছে। আছে মাত্র ২৪টি। যার ৯০ শতাংশই এই পুকুরটির মতো দখলের পথে।
বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরে ২০ ভাগ সবুজ এলাকা থাকা প্রয়োজন, সেখানে আছে সাড়ে ৮ ভাগের কম।
শনিবার রাজধানীতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) ভবনে এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেন, আবাসনের নামে রাজউক জলাশয় আর সবুজ সবই ধংস করেছে।
‘২৮ বছরে রাজধানীর জলাধার ও সবুজ নিধনঃ বাস্তবতা ও উত্তরণের পথনকশা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশ ও গোলটেবিল আলোচনায় উঠে আসে আরও অনেক কথাই।
বক্তরা বলেন, নগর উন্নয়ন তথা পার্কের উন্নয়ন প্রকল্পে কনক্রিট আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। খেলার মাঠ দখল করে তৈরি হচ্ছে ক্লাব, মার্কেট, হাটবাজারসহ নানা স্থাপনা।
সবুজ ভূমি রক্ষায় সমাধানের কথা জানিয়ে বলা হয়, ড্যাপে বর্ণিত ‘নগর জীবনরেখা’ বাস্তবায়নের লক্ষে নগরের সবুজায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
শহরের জলাধার ও সবুজ এলাকা রক্ষা করার উদ্দেশ্য জলাধার সংলগ্ন জায়গাগুলোতে পাবলিক স্পেস তৈরি করতে হবে। এছাড়াও ঢাকার অবশিষ্ট সবুজ ভূমি রক্ষা করতে হবে।
সবুজ ভূমি সংরক্ষণে স্টেকহোল্ডারদের মৌলিক কার্যাবলীর কথা জানিয়ে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা, পার্ক এবং খোলা জায়গা রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
রাজউক যুগোপযোগী পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। ইমারত ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র দিতে হবে। নির্মাণ অনুমতিপত্র ও অকুপেন্সী সার্টিফিকেট প্রদান করতে হবে।
আবাসন কর্তৃপক্ষে উদ্দেশ্য করে বলা হয়, হাউজিং প্রোজেক্টে সবুজ ভূমির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা। এক্ষেত্রে ঢাকা মহানগরে মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু পার্ক এবং খোলা জায়গা রক্ষণাবেক্ষণ করা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, পুরনো ঢাকার গেন্ডারিয়া দিঘী ভরাট, হাতিরঝিলের লেক ভরাট এবং গাবতলীতে বিএডিসির জন্য নিম্নভূমি ভরাট এখনই বন্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি সুলতানা কামাল ঢাকার সবুজ ভূমি ও জলাভূমি রক্ষায় রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
এ সময়, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নগরের পরিবেশ দূষণসহ দখলদারিত্বের সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হতে আমাদের সময় লাগছে।
তিনি বলেন, বলেন, মানুষই পরিবেশের দূষণ করে এবং মানুষই পারে দূষণ প্রতিরোধ করতে। দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ না হলে ঢাকার নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে না।
আরও পড়ুন: মিশরীয় পুলিশের গুলিতে তিন ইসরাইলি সেনা নিহত
আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বলছে, ভবিষ্যতে প্রতি বছরই এমন তাপদাহের মাত্রা ও স্থায়ীত্ব দুটোই বাড়বে। তাহলে কিভাবে বাঁচবে ভবিষ্যত প্রজন্ম?
এ প্রশ্নের বিপরীতে আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমাদের সকল উন্নয়নই পরিবেশ বিনাশী। নীতি নির্ধারকদের এই মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, রাজধানী ঢাকা না বাঁচলে আমাদের অর্থনীতি বাঁচবে না।
একাত্তর/আরবিএস
