জাতীয় পার্টির মধ্যে সরকারি দল আওয়ামী লীগ তাদের এজেন্ট ঢুকিয়ে দিয়েছে বলে দাবি করেছেন দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। তার অভিযোগ, জাতীয় পার্টি যখন সঠিক রাজনীতি করে তখন সরকার দলে ভেঙে আরেকটি দল সৃষ্টি করে।
শনিবার জন্মদিনের আয়োজনে সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রাজধানীর বনানীতে দরের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে এ কথা বলেন।
জি এম কাদের বলেন, ২০০৮ সালে যখন আমরা মহাজোট করেছি, তখন অনেকেই বলেছে, আমরা পরজীবী হয়ে গেছি। তারা বলেছেন, আমরা নাকি অন্যের সহায়তা ছাড়া নির্বাজনে জয়ী হতে পারি না। দেশের বড় দুটি দলের নির্বাচনে অল্প ভোটের ব্যবধানে জয় পরাজয় নির্ধারণ হয়। সেই অল্প ভোট তো আমরা দিতে পারতাম। আমরা যদি পরজীবী হই তারপরও আমাদের কাছে টানতে প্রতিযোগিতা ছিলো। সেখানে আমাদের একটি বার্গেনিং পয়েন্ট ছিলো, আমরা বার্গেনিং করে অনেক কিছু আদায় করতে পারতাম।
জাপা চেয়ারম্যান বলেন, কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে আমরা বার্গেনিং করার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। এখন আমাদের বলা হয় গৃহপালিত রাজনৈতিক দল। আমাদের দলের মধ্যে সরকারি দলের এজেন্ট ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। তারা আমাদের দল করে কিন্তু রাজনীতি করে অন্য দলের। আমাদের দল করে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নেয় কিন্তু রাজনীতি করার সময় তারা সরকারি দলের রাজনীতি করে। যখনই আমরা সঠিক রাজনীতি করতে চাই, তখনই আমাদের দলকে ভেঙে আরেকটি দল সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। এটা সরকারই করে, যাতে আমরা স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে না পারি।
২৮ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি থেকে জি এম কাদের ও মুজিবুল হক চুন্নুকে অব্যাহতি দেন দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। নিজেকে চেয়ারম্যানও ঘোষণা করেন তিনি। রওশন বলছেন, কাদের ও চুন্নুকে পদ থেকে সরানো হয়েছে। আগামী ৯ মার্চ দলের সম্মেলন ঘোষণা করেছেন রওশন।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদে ২৬টি আসনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করে জাতীয় পার্টি। ভোটে জেতে ১১টি আসনে। নির্বাচনে এই ভরাডুবির জন্য দলের অনেক নেতা-কর্মী চেয়ারম্যান এবং জি এম কাদেরকে দায়ী করে বিক্ষোভও করেছেন।
১১ আসন নিয়ে এবার সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। বিরোধী দলীয় নেতা হয়েছেন জি এম কাদের এবং উপনেতা হয়েছেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।
ওই নির্বাচনে অংশ নেননি রওশন এরশদা, তার ছেলে সাদ এরশাদসহ দলের অনেকেই।
দলের ভাঙনের জন্য সরকারকে দায়ী করে জি এম কাদের বলেন, আগে আমরা পরজীবী হলেও আমাদের একটা পছন্দ ছিলো, আমরা যে কোনো পক্ষে যেতে পারি, আমাদের বার্গেনিং পয়েন্ট ছিলো। এখন আমরা বন্দি হয়ে গেছি, একজনের কাছেই যেতে হবে। আমরা সঠিক রাজনীতি করতে গেলেই....একজন একটা ডাক দেবেন, সরকার মদদ দেবেন, মিডিয়া কাভারেজ দেবে আর আমাদের দল ভেঙে এবং আইনের মাধ্যমে আমাদের লাঙ্গল নিয়ে নেয়ার হুমকি দেয়া হয়। দল বাঁচাই না রাজনীতি বাঁচাই এই সমস্যায় জাতীয় পার্টি ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, সরকার আমাদের দুর্বল করতে আমাদের মাঝেই একটি জোট বানিয়ে রাখছে। আমরা সঠিক রাজনীতি করতে গেলেই সরকার আমাদের দল ভেঙে দেয়ার অপচেষ্টা করে। যারা জাতীয় পার্টি ব্যবহার করে অন্য দলের রাজনীতি করতে চায় তাদের দল থেকে বের করে দিতে হবে। এটা করতে পারলেই জাতীয় পার্টি টিকবে। দেশও জাতির কাছে গৃহপালিত বিরোধীদলের প্রয়োজনীয়তা নেই। আমরা একটি দলের কাছে বন্দি হয়ে গেলে জনগণের কাছে আমাদের প্রয়োজন থাকবে না। আর জনগণ কেন এমন দলকে ভোট দেবে? দলকে বাঁচাতে হলে গৃহপালিত অপবাদ থেকে বের হতে হবে। যারা গৃহপালিত হবার জন্য দায়ী তাদের বর্জন করতে হবে। আমাদের দলে থেকে অন্যদলের রাজনীতি করতে দেয়া হবে না।
সরকারের প্রতি অনুরোধ রেখে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, সরকারকে অনুরোধ করবো দেশের রাজনীতি শেষ করবেন না। রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনীতি করতে দেন। সবাইকে ধংস করে সরকার একক রাজনীতি করবে এটা দেশ ও জাতির জন্য ভালো হবে না।
জি এম কাদের বলেন, গত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি অনেক কিছু শিখেছেন।
তিনি বলেন, আরো কিছু দিন পরে আমার সঠিক মূল্যায়ন হবে। এখন যারা আমাকে মূল্যায়ন করছেন সেটা হয়তো সঠিক হচ্ছে না। সময়ের ব্যবধানে সব কিছুই পরিষ্কার হয়ে যাবে। গেলো নির্বাচনে আমি অনেক কিছুই শিখেছি। দেখেছি রাজনীতি কত বেশি নোংরা হতে পারে আবার কত বেশি মহৎ হতে পারে। দেখেছি, ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য মানুষ কত বেশি নিচে নেমে যেতে পারে।
ধনী-গরীবের বৈষম্য প্রতিদিন বাড়ছে, দলীয়করণের মাধ্যমে বৈষম্য চলছে উল্লেখ করে জি এম কাদের বলেন, এটা কী অন্যায় নয়? সরকারি দল করলে এক নিয়ম ও সুযোগ সুবিধা আর সাধারণ মানুষের জন্য অন্য নিয়ম। এটা বৈষম্য এবং অন্যায়। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম হয়েছিলো। সেই অন্যায় এখনো চলছে। বৈষম্য ও দলীয়করণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে একুশে আমাদের শিক্ষা দেয়। বর্তমান সরকার বৈষম্যের দিকে দেশকে ঠেলে দিচ্ছে, রাষ্ট্রীয়ভাবেই বৈষম্য করা হচ্ছে। চাকরি পেতে গেলে জিজ্ঞেস করা হয় তুমি ও তোমার পরিবার কি আওয়ামী লীগ করে? আওয়ামী লীগ না করলে চাকরি মেলে না।
এদিন সকাল থেকেই জাতীয় পার্টি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা ফুল ও মিষ্টি নিয়ে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে জড়ো হন।
জাতীয় পার্টি ঢাকা মহানগর উত্তর এর আহ্বায়ক বীরমুক্তিযোদ্ধা তৈয়বুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান সালমা ইসলাম, প্রেসিডিয়াম সদস্য মীর আব্দুস সবুর আসুদ, রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া, নাজমা আখতার, মোস্তফা আল মাহমুদ, জাতীয় সাংস্কৃতিক পার্টির সভাপতি শেরীফা কাদের।
