সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল–সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রায় ঘোষণা করবে আপিল বিভাগ।
টানা তিন দিন শুনানি শেষে বুধবার (৮ জুলাই) আপিল বিভাগ রায়ের জন্য এই দিন ধার্য করেন।
আদালতে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের (রিটকারী) পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
শুনানি শেষে জামায়াতের আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, আপিল বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরোটা বাতিল করবে না, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কারণ পুরোটা বাতিল করলে সংবিধানে একটি শূন্যতা দেখা দেবে। তাই সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো বাদ দিয়ে বাকি অংশ সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার আবেদন জানিয়েছি।
অন্যদিকে রিটকারীর আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী আনতে হলে গণভোটের প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু তা না করেই এই সংশোধনী আনা হয়েছে। এ কারণে আমরা পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরো অংশটিই বাতিল চেয়েছি। এই সংশোধনী সম্পূর্ণ অবৈধ।
এদিকে আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছে, গণতন্ত্র আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার কোনো প্রতিফলন হয়নি। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের আত্মবিশ্বাস জনগণের মধ্যে জন্ম নেয়নি, যার ফলশ্রুতিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়েছে।
গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। একই সঙ্গে সংবিধানে গণভোটের বিধান (১৪২ অনুচ্ছেদ) পুনর্বহাল করা হয়। তবে হাইকোর্ট পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করেননি।
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছিলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তি–সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামো গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে। এছাড়া সংবিধানে যুক্ত হওয়া ৭ক (সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ অপরাধ) ও ৭খ (মৌলিক বিধানাবলি সংশোধন অযোগ্যকরণ) এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদ বাতিল ঘোষণা করেন উচ্চ আদালত।
আদালত রায়ে উল্লেখ করেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৫৪টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছিরো। এর পুরোটা বাতিল করা হচ্ছে না। জাতির পিতার স্বীকৃতি ও ২৬ মার্চের ভাষণের মতো বিষয়গুলো বহাল থাকবে এবং আগামী জাতীয় সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে এসব বিষয়ে সংশোধন বা পরিমার্জন করতে পারবে।
২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক হিসেবে স্বীকৃতি এবং সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করাসহ বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছিলো।
এরপর গত বছরের ১৯ আগস্ট সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ অন্যদের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পঞ্চদশ সংশোধনী কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। পরে এই রুলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পারওয়ারসহ কয়েকটি দল পক্ষভুক্ত হয়।
হাইকোর্টের রায়ের পর গত তিন নভেম্বর এর বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়, যার ধারাবাহিকতায় সর্বোচ্চ আদালত বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত রায় দিতে যাচ্ছে।
