লিওনেল মেসিকে কখনো ফুরিয়ে গেছেন বলে ধরে নেবেন না। যখন মনে হচ্ছিলো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হতে চলেছে, ঠিক তখনই ৩৯ বছর বয়সী এই জাদুকরের হাত ধরে অবিশ্বাস্য এক প্রত্যাবর্তন দেখলো ফুটবল বিশ্ব। দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তের ‘বিতর্কিত’ ও ‘নাটকীয়তায়’ মিসরকে ৩–২ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গেছে লিওনেল স্কালোনির দল।
আটলান্টায় অনুষ্ঠিত এই মহাকাব্যিক ম্যাচে আর্জেন্টিনা যখন পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন শেষ ১১ মিনিটে তিন গোল করে ম্যাচ ছিনিয়ে নেয় আলবিসেলেস্তেরা। তবে এই হার সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি মিসর। ম্যাচের বিতর্কিত রেফারিং নিয়ে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ইএফএ)।
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দেয় হোসাম হাসানের শিষ্যরা। ১৫ মিনিটেই মারওয়ান আত্তিয়ার ক্রস থেকে বুলেট হেডারে গোল করে মিসরকে ১–০ তে এগিয়ে নেন ইয়াসির ইব্রাহিম।
পিছিয়ে পড়ার পর সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। ডি-বক্সের ভেতরে নিকোলাস তাগলিয়াফিকো ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে। কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে একই টুর্নামেন্টে দুটি পেনাল্টি মিসের রেকর্ড গড়ে বসেন মেসি। তার দুর্বল শটটি দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন মিসরীয় গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। ২০১০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে প্রথমার্ধে পিছিয়ে থেকে বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে নাটকীয়তা আরও বাড়ে। সালাহর পাস থেকে মোস্তফা জিকো বল জালে পাঠালেও ভিএআর রিভিউতে দেখা যায় গোল হওয়ার ৩০ সেকেন্ড আগে আত্তিয়া লিসান্দ্রো মার্তিনেজের জার্সি টেনে ধরেছিলেন। ফলে ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল হয়।
তবে মিসরকে দমানো যায়নি। কিছুক্ষণ পরেই নাহুয়েল মলিনাকে পরাস্ত করে জিকো গোল করলে ২–০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ফারাওরা।
ম্যাচের এই পর্যায়ে টানা ছয়টি বিশ্বকাপ নকআউট ম্যাচে গোল করার অনন্য কীর্তি গড়েন মেসি। বিশ্বকাপে তার মোট গোল এখন ২১টি, যা কিলিয়ান এমবাপে ও আর্লিং হালান্ডের চেয়ে একটি বেশি।
যখন মনে হচ্ছিলো বড়ো কোনো অঘটন ঘটতে চলেছে, তখনই দৃশ্যপটে হাজির মেসি। ম্যাচের ৮২ মিনিটে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর অ্যাসিস্ট থেকে গোল করে ব্যবধান ২–১ করেন তিনি। এর ঠিক চার মিনিট পর মিসরের ডিফেন্সের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বাঁ পায়ের জাদুতে ম্যাচে ২–২ সমতা ফেরান আলবিসেলেস্তে অধিনায়ক।
ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে আসে সেই জয়সূচক গোল। মোহাম্মদ সালাহ বলের নিয়ন্ত্রণ হারালে লাউতারো মার্তিনেজের ক্রস থেকে চেলসি তারকা এনজো ফার্নান্দেজ হেডে গোল করে আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য জয় নিশ্চিত করেন।

রেফারিং নিয়ে ক্ষুব্ধ মিসর, ফিফায় নালিশ
আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম ‘টিওয়াইসি স্পোর্টস’ জানিয়েছে, ম্যাচ শেষে রেফারিং নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে মিসর। মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হানি আবু রিদা ফিফার কাছে রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে এবং তার সহকারীদের এই টুর্নামেন্টে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন।
মিসরের মূল আপত্তি দুটি জায়গায়—প্রথমত, ভিএআর পর্যালোচনার মাধ্যমে তাদের গোল বাতিল করা এবং দ্বিতীয়ত, আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের বিল্ড-আপে ফাউল থাকলেও তা ভিএআরে পরীক্ষা না করা।
সাংবাদিক সম্মেলনে মিসরের কোচ হোসাম হাসান সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, ম্যাচের ফল আগে থেকেই ঠিক করা ছিলো এবং ফরাসি রেফারির ওপর আর্জেন্টিনার পক্ষ থেকে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিলো।
তিনি বলেন, ফিফা চায় আর্জেন্টিনা ও মেসি টুর্নামেন্টে টিকে থাকুক।
ফিফা অবশ্য এখনো মিসরের এই আবেদনের প্রেক্ষিতে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানায়নি।
