ভারত-পাকিস্তান বৈরিতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের ইতিহাস যতটা না ক্রিকেটের, তার চেয়েও বেশি ভূ-রাজনীতির। যুদ্ধ, পারমাণবিক পরীক্ষা কিংবা কূটনৈতিক অচলাবস্থা- রাজনীতির এই চোরাস্রোত খুব কম সময়ই পর্দার আড়ালে থেকেছে; বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটিই পুরো আয়োজনকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
মাঝেমধ্যে ক্রিকেট দুই দেশের মধ্যে শান্তির দূত হিসেবে কাজ করলেও, বেশিরভাগ সময় রাজনীতিই এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগুনে জ্বালানি জুগিয়েছে। তবে মাঠের লড়াইয়ে শক্তির ভারসাম্য নিঃশব্দে বদলে গেছে, আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা হয়েছে নাটকীয়ভাবে।
এর মানে এই নয় যে, দুই দলের লড়াইয়ে ক্রিকেটের রোমাঞ্চ কখনো ছিল না। ১৯৮৯ সালে করাচিতে শচীন টেন্ডুলকারের আবির্ভাব, ১৯৯২ সালে কিরণ মোরের সঙ্গে জাভেদ মিয়াঁদাদের সেই অঙ্গভঙ্গি, ১৯৯৬ সালে ভেঙ্কটেশ প্রসাদ বনাম আমির সোহেল, ১৯৯৯ সালে চেন্নাইয়ের দর্শকদের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানানো কিংবা ২০২২ সালে মেলবোর্নে বিরাট কোহলির সেই জাদুকরী ইনিংস- এমন মুহূর্তগুলো এই লড়াইকে নিছক খেলার ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু এই তালিকাটি ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আইকনিক মুহূর্তগুলোর বেশিরভাগই ২০১৩ সালের জানুয়ারির আগের, যখন থেকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর থেকে ভারত ও পাকিস্তান কেবল আইসিসি এবং মহাদেশীয় টুর্নামেন্টগুলোতেই মুখোমুখি হয়েছে। ফলে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন নিরবচ্ছিন্ন লড়াইয়ের বদলে কেবল বিশেষ আয়োজন-ভিত্তিক উত্তেজনায় রূপ নিয়েছে। অবশ্য এর প্রচার ও উন্মাদনা আগের মতোই অটুট।
মিনিটের মধ্যেই টিকিট শেষ হয়ে যায়। সম্প্রচারকারীরা পুরনো নস্টালজিয়া বিক্রি করে। নাটকীয় মন্তব্যের জন্য সাবেক খেলোয়াড়দের হাজির করা হয়। বাণিজ্যিকভাবে এটি এখনও ক্রিকেটের কেন্দ্রবিন্দু, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার; যেখানে বিজ্ঞাপনের স্লট বিক্রি হয় আকাশচুম্বী দামে।
অথচ মাঠের লড়াইয়ে একপাক্ষিক আধিপত্য এখন স্পষ্ট। ২০১৩ সালের শেষ দ্বিপাক্ষিক সিরিজের পর থেকে আইসিসি ইভেন্ট ও এশিয়া কাপ মিলিয়ে দুই দেশ ২৩ বার মুখোমুখি হয়েছে, যার ১৯ বারই জিতেছে ভারত। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ মিলিয়ে মুখোমুখি লড়াইয়ে ভারত ১৪-১ ব্যবধানে এগিয়ে। আর শুধু টি-টোয়েন্টিতে এই ব্যবধান ৭-১।

একে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলা যায় না; এটি মূলত একচ্ছত্র আধিপত্য। গত বছর সূর্যকুমার যাদবও বিষয়টি স্বীকার করে বলেছিলেন, দুটি দল যদি ১৫-২০টি ম্যাচ খেলে এবং ফলাফল ৭-৭ বা ৮-৭ হয়, তবেই তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলা যায়। কিন্তু ব্যবধান যদি হয় ১৩-০ বা ১০-১... আমি সঠিক পরিসংখ্যান জানি না, তবে একে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলা যায় না।
পরিসংখ্যানও তাঁর পক্ষেই কথা বলছে। এমনকি সাম্প্রতিক এশিয়া কাপেও, যেখানে ভারত ও পাকিস্তান একাধিকবার মুখোমুখি হয়েছিল (যার মধ্যে প্রথমবারের মতো ফাইনালও ছিল), সেখানে মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে মাঠের বাইরের বিতর্কই বেশি আলোচিত হয়েছে।
ভারত তাদের জয়ের ধারা বজায় রেখেছে। ক্রিকেটের কিছু ঝলক ছিল- যেমন পাকিস্তানের নতুন বলের তোপ কিংবা তিলক বর্মার ধীরস্থির ম্যাচজয়ী ইনিংস- কিন্তু মূল আলোচনা আবর্তিত হয়েছে মাঠের বাইরের উত্তেজনা নিয়ে। সেটা বয়কটের গুঞ্জন হোক, রাজনৈতিক বার্তা, প্রতীকী অঙ্গভঙ্গি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাদা ছোড়াছুড়ি কিংবা প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব—ক্রিকেট প্রায়শই এসবের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। আর এখন, কলম্বোতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের লড়াইয়ের মাত্র কয়েক মাস আগে নাটকের আরও একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

বাংলাদেশ ইস্যুতে আইসিসি-র ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের সংক্ষিপ্ত বয়কটের হুমকি রাজনৈতিক উত্তাপকে আবার উসকে দিয়েছিল। সম্প্রচারকারীরা বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কায় ছিল। শেষ পর্যন্ত আইসিসি-র পর্দার আড়ালের আলোচনা ও কূটনৈতিক হস্তক্ষেপে পাকিস্তানের অবস্থান নরম হয় এবং হাই-ভোল্টেজ এই ম্যাচটি সূচিতে বহাল থাকে।
কিন্তু এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে মাঠের লড়াইয়ের মান বাড়ানো বা ক্রিকেটের গৌরব ফিরিয়ে আনা নিয়ে খুব কমই কথা হয়েছে। সব আলোচনাই সীমাবদ্ধ ছিল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে।
সেই সূত্র ধরেই আসছে কলম্বো লড়াই। কাগজে-কলমে পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। সাম্প্রতিক রেকর্ডের ভিত্তিতে ভারতই নিরঙ্কুশ ফেভারিট। কন্ডিশন হয়তো স্পিনারদের সহায়তা বা কৌশলী নিয়ন্ত্রণের জন্য পাকিস্তানকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু কাঠামোগতভাবে দুই দলের ব্যবধান এখনও অনেক।

তা সত্ত্বেও এবারের উত্তেজনা একটু ভিন্ন। মাঠের বাইরের এই রেষারেষি এমন এক ম্যাচে নতুন করে আবেগের বারুদ যোগ করেছে, যা গত কয়েক বছরে অনেকটা অনুমেয় হয়ে পড়েছিল।
পরিসংখ্যানের বিচারে এই লড়াই একপাক্ষিক হতে পারে, এতে আগের মতো দ্বিপাক্ষিক সিরিজের গভীরতা না থাকতে পারে কিংবা স্পোর্টিং ডুয়েল বা দ্বৈরথের ভারসাম্য না থাকতে পারে; কিন্তু বয়কট-কেন্দ্রিক এই বিশৃঙ্খলা সেই উত্তেজনা ফিরিয়ে এনেছে যা পরিসংখ্যান পারেনি। আর বড় টুর্নামেন্টে রান বা উইকেটের মতোই এই টানটান উত্তেজনা গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
কলম্বো শুধু একটি ক্রিকেট ম্যাচেরই আয়োজন করবে না; এটি এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন অধ্যায়ের সাক্ষী হবে যা মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে মাঠের বাইরের পারিপার্শ্বিকতার ওপর ভর করে টিকে আছে। এখন দেখার বিষয়, এবার শেষ পর্যন্ত ক্রিকেট আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরতে পারে কি না।
যেভাবে বিষিয়ে গেল ভারত পাকিস্তান ক্রিকেট সম্পর্ক