বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই বাজিমাত করেছে দুই ‘হেভিওয়েট’ দল যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়া। লস অ্যাঞ্জেলেসে প্যারাগুয়েকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে উড়ন্ত সূচনা করেছে স্বাগতিক আমেরিকা। অন্যদিকে, ভ্যাঙ্কুভারের মাঠে ২০০২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট তুরস্ককে ২-০ গোলে হারিয়ে নকআউটের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ‘সকারুজ’ খ্যাত অস্ট্রেলিয়া।
দীর্ঘ বিরতির ফায়দা তুলে ফুরফুরে মেজাজে থাকা ইউএসএ দল এবার সিয়াটলের মাঠে নামছে টানা দ্বিতীয় জয় তুলে নিয়ে শেষ ১৬ নিশ্চিত করতে। তবে অস্ট্রেলিয়াও ছেড়ে কথা বলার পাত্র নয়; কোচের নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল অ্যানালাইসিস মাথায় নিয়ে মার্কিনীদের গতির ঝড় থামাতে পুরোপুরি প্রস্তুত তারা।

প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচের পর বেশ লম্বা বিরতি পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অবসরের পুরোটা জুড়ে ড্রেসিংরুমে চলেছে ভিডিও গেমসের তাণ্ডব! মার্কিন ফরোয়ার্ড ব্রেন্ডেন অ্যারনসন খোলামেলা আড্ডায় জানিয়েছেন, এই ছেলেদের সাথে সময় কাটানো সত্যিই দারুণ। আমরা সারাক্ষণ ফোনে ‘ক্ল্যাশ রয়্যাল’, কিংবা পিজিএ ও ফিফা খেলছি, আর বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলোতে চোখ রাখছি। সিয়াটলের চেনা দর্শকদের গর্জন মাঠে বাড়তি এনার্জি দেবে বলে বিশ্বাস অ্যারনসনের।
তবে মার্কিন শিবিরের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিকের চোট। প্যারাগুয়ে ম্যাচে দুর্দান্ত খেলার পর প্রথমার্ধেই কাফ ইনজুরির কারণে এসি মিলানের এই ফরোয়ার্ডকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। সোমবার তিনি একা একা অনুশীলন করায় সমর্থকদের মনে মেঘ জমলেও, গুরু মরিসিও পচেত্তিনো আশ্বস্ত করেছেন, ক্যাপ্টেনের চোট মারাত্মক নয়।

মাঝমাঠের সেনসেশন টাইলার অ্যাডামস তো সমর্থকদের স্রেফ ‘রিল্যাক্স’ করার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, ক্রিশ্চিয়ান ঠিক সময়ে তৈরি হয়ে যাবে। ম্যাচের কয়েকদিন আগে ও একটা গুঁতো খেয়েছিল, আর প্যারাগুয়ে ম্যাচে ঠিক সেই জায়গাতেই আবার লাথি খেয়েছে। হাফ-টাইমের ১৫-২০ মিনিটের ব্রেকে শরীর কিছুটা শক্ত হয়ে গিয়েছিল বলেই ওকে নামানো হয়নি। ও একদম ফিট।
অন্যদিকে তুরস্ককে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসে ফুটছে অস্ট্রেলিয়া। দলের ডিফেন্ডার ক্যামেরন বার্গেস মার্কিন দলের অসাধারণ প্রতিভার প্রশংসা করেও এক প্রকার হুংকার ছেড়ে বলেছেন, আমেরিকা শুরু থেকেই আগ্রাসী ফুটবল খেলবে। আমরা তুরস্কের শক্তি ও দুর্বলতা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছি, যা মাঠে কাজে লেগেছে। মার্কিনীদের খেলার ধরন আলাদা, তবে আমরাও দাঁতভাঙা জবাব দিতে তৈরি।

অস্ট্রেলিয়ার এই জয়ের অন্যতম নায়ক ২২ বছর বয়সী গোলকিপার প্যাট্রিক বিচ। ১০০-র বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা ৩৪ বছর বয়সী কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যাট রায়ানকে বেঞ্চে বসিয়ে আন্তর্জাতিক অভিষেকেই বাজিমাত করেছেন এই তরুণ।
তবে স্ট্রাইকার মো তুরের ক্র্যাম্পের চোট নিয়ে কিছুটা চিন্তায় আছে ক্যাঙ্গারুর দেশ। তুরস্কের বিরুদ্ধে ম্যাচে মাত্র ২৯% বল পজিশন আর ০.৭৭ এক্সপেক্টেড গোল (এক্সজি) নিয়ে, প্রতিপক্ষের ৩০টি শটের ঝড় সামলে যেভাবে তারা ম্যাচ জিতেছিল, আমেরিকার ‘ফ্রি-স্কোরিং’ ফরোয়ার্ড লাইনের সামনে আজ আবারও তেমন এক ‘সুযোগ বুঝে ম্যাচ চুরি’ পারফরম্যান্স দেখাতে হবে অস্ট্রেলিয়াকে।

ইতিহাসের প্রথম: এটিই বিশ্বকাপ ইতিহাসে এই দুই দলের প্রথম ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ। তবে অতীতে খেলা ৪টি প্রীতি ম্যাচের শেষ দুটি জিতেছে আমেরিকাই (২০১০ সালে ৩-১ এবং ২০২৫ সালে ২-১)। সিয়াটলের মাঠে খেলা নিজেদের শেষ ৭টি ম্যাচের প্রতিটিতেই জিতেছে আমেরিকা।
রেকর্ডের ছড়াছড়ি: প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে ৪-১ গোলের জয়টি বিশ্বকাপে আমেরিকার ইতিহাসের যৌথভাবে সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয়। ১৯৩০ সালের উদ্বোধনী বিশ্বকাপের পর এই প্রথম টুর্নামেন্টে টানা দুই ম্যাচ জেতার রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে তারা।
বিস্ময় বালক ইরানকুন্ডা: তুরস্কের বিপক্ষে গোল করে নেস্টোরি ইরানকুন্ডা অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ গোলদাতা (২০ বছর ১২৫ দিন) হয়েছেন। রাতে গোল করলে ২০১৪ সালে ডাচ তারকা মেমফিস ডিপাইয়ের পর অনূর্ধ্ব-২১ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচেই গোল করার বিরল কীর্তি গড়বেন তিনি।
রাতের এই ব্লকবাস্টার লড়াইয়ে সিয়াটলের মাঠ মার্কিনদের পয়া দুর্গ হলেও, স্বাগতিকদের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস কিন্তু সুখকর নয়। ১৯৭৪ সালে একমাত্র স্বাগতিক দেশ হিসেবে পশ্চিম জার্মানির মুখোমুখি হয়ে ৩-০ গোলে হেরেছিল তারা।
এবার কি পচেত্তিনোর মার্কিন গেমাররা সিয়াটলে জয়ের ধারা বজায় রাখবে, নাকি ২০ বছরের তরুণ ইরানকুন্ডার ম্যাজিকে মায়ামির টিকিট কাটবে অস্ট্রেলিয়া? উত্তর মিলবে মাঠের ৯০ মিনিটেই!
