স্পেনের মহাতারকাদের একের পর এক শট রুখে দিয়ে রাতারাতি ফুটবল দুনিয়ার নয়নের মণি বনে গেছেন কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী বুড়ো গোলরক্ষক ভোজিনহা। গত সোমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের গোলশূন্য ড্রয়ে রুখে দিয়ে ‘ম্যান অফ দ্য ম্যাচ’ হওয়ার পর মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন পর্তুগালের দ্বিতীয় ডিভিশনের ক্লাব চাভেসে খেলা এই গোলকিপার।

ম্যাচ শেষে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আকাশছোঁয়া ভিসা ফি’র কারণে তাঁর মা আমেরিকা আসতে পারেননি। ভোজিনহার সেই আবেগঘন কান্না ছুঁয়ে গেছে স্বয়ং মার্কিন প্রশাসনকে! আর তাই আগামী রোববার মায়ামিতে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে কেপ ভার্দের দ্বিতীয় ম্যাচের আগেই এক জাদুকরী ও চাঞ্চল্যকর মোড় দেখল ফুটবলবিশ্ব। সব নিয়ম ও ফি মকুব করে ভোজিনহার মাকে মায়ামি উড়িয়ে আনার রাজকীয় ব্যবস্থা করেছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
ভোজিনহার মা, আনা কান্দিদা এভোরা কেপ ভার্দের সাঁও ভিসেন্তে দ্বীপে নিজের বাড়ি থেকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জানিয়েছেন, আমি ভীষণ খুশি। সব কিছু এত দ্রুত ঘটে গেল! ঈশ্বরের ইচ্ছায় আমি আমার ছেলেকে বিশ্বকাপে খেলতে দেখব। আমি ওখানে যাচ্ছি ওকে সমর্থন করতে, ওর বুকে সাহস আর শক্তি জোগাতে। ম্যাচ শেষেই আমি আমার ছেলেকে জড়িয়ে ধরব।

এই পুনর্মিলনের নেপথ্যে রয়েছেন মার্কিন হাউসের ডেমোক্র্যাটিক লিডার হাকিম জেফরিস। তিনি সামাজিক মাধ্যম এক্সে একটি আবেগঘন পোস্টে লেখেন, কোনো মায়েরই উচিত নয় সন্তানের ইতিহাস গড়ার মুহূর্ত মিস করা। জেফরিস জানান, তিনি সরাসরি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও’র সাথে কথা বলে স্টেট ডিপার্টমেন্টকে বিশেষ অনুরোধ জানান।
ফলস্বরূপ, কেপ ভার্দের রাজধানীতে থাকা মার্কিন ভিসা টিম দ্রুতগতিতে কাজ শুরু করে এবং অফিশিয়াল পলিসি অনুযায়ী সব ফি মওকুফ করে ভোজিনহার মায়ের মায়ামি যাওয়ার টিকিট ও ভিসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে। ব্রুকলিনের এই কংগ্রেস সদস্য এই মহান কাজের জন্য ফিফা এবং কেপ ভার্দে সরকারকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, আমেরিকার কঠোর নিয়ম অনুযায়ী যে পাঁচটি দেশের নাগরিকদের মার্কিন ভিসার জন্য প্রায় ১৫-১৬ লাখ টাকা ফেরতযোগ্য ডিপোজিট দিতে হয়, কেপ ভার্দে তার মধ্যে একটি। যদিও গত মে মাসে টিকিটধারী দর্শকদের জন্য এই নিয়ম শিথিল করা হয়েছিল, কিন্তু মধ্যবিত্ত এই ফুটবলারের পরিবারের পক্ষে সময়মতো সেই বিপুল অর্থের জোগাড় করা সম্ভব হয়নি।
৪০ বছর ১২ দিন বয়সে বিশ্বকাপ মঞ্চে পা রেখে ভোজিনহা গড়েছেন এক অনন্য কীর্তি, বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজের দেশের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামা সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার এখন তিনিই। চটুল এই খবরের পেছনে লুকিয়ে আছে তাঁর এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।

ম্যাচ শেষে ভোজিনহা বলেছিলেন, আমি ২৫ বছর বয়সে ২০১২ সালে পেশাদার ফুটবল শুরু করি, যা একজন ফুটবলারের জন্য অনেক দেরি। বহুবার দল ছাড়ার কথা ভেবেও এই বিশ্বকাপের স্বপ্নের জন্য টিকে ছিলাম। আজ ম্যাচ শেষে কেঁদেছিলাম কারণ আমার জীবনের সব কিছু ছিলেন আমার দাদা-ঠাকুমা, যাঁরা কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। আর কেঁদেছিলাম মায়ের জন্য।
স্লোভাকিয়া, অ্যাঙ্গোলা, মলদোভা আর সাইপ্রাসের লিগে খেলে বেড়ানো এই যাযাবর গোলকিপার স্পেনের বিরুদ্ধে সেই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পর রাতারাতি কোটি ভক্তের ‘কাল্ট হিরো’ বনে গেছেন, হুহু করে বাড়ছে তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ার ফলোয়ার। আগামী রোববার উরুগুয়ে এবং ২৭ জুন সৌদি আরবের মুখোমুখি হবে কেপ ভার্দে। এখন গ্যালারিতে মায়ের উপস্থিতি এই ৪০ বছরের বাজপাখির ডানায় কতটা জোর বাড়ায়, সেটাই দেখার অপেক্ষায় ফুটবল দুনিয়া!
