রাত ২টায় বস্টনের মাঠে যখন ফ্রান্স আর মরক্কো মুখোমুখি হবে, তখন সেটি আর পাঁচটা সাধারণ কোয়ার্টার ফাইনালের মতো থাকবে না। মরক্কো শিবিরের জন্য এই ম্যাচটি আসলে কাতার বিশ্বকাপের সেই বুকে বেঁধে থাকা অসমাপ্ত প্রতিশোধের মধুর প্রতিশোধ নেওয়ার রাত। চার বছর আগে কাতারের মাটিতে এই ফ্রান্সই মরক্কোর রূপকথার দৌড় থামিয়ে দিয়েছিল, ভেঙে দিয়েছিল প্রথম আফ্রিকান ও আরব দেশ হিসেবে ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন। কিন্তু ২০২৬ সালের মরক্কো আর সেই আগের মতো শুধু ‘স্বপ্নালু ফুটবলার’দের দল নয়; তারা এবার এসেছে এই বিশ্বমঞ্চে নিজেদের রাজত্ব দাবি করতে!

মরক্কোর প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক হামজা শতিউই স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি মরক্কো জাতীয় দলের জন্য শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, এটি পুরোপুরি প্রতিশোধের ম্যাচ। বিশেষ করে ২০২২ সালের স্কোয়াডে থাকা খেলোয়াড়েরা সেই হার আজও ভোলেনি। তারা এবার হিসাব চুকিয়ে দিতে তৈরি। কাতারে সেমিফাইনালে ওঠাকে যেখানে মিরাকল বা অলৌকিক মনে করা হচ্ছিল, এবার বস্টনে সেমিফাইনালে না উঠতে পারলে তাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখবে মরক্কোবাসী। কারণ কাতারের সেই সাফল্য যে কোনো ফ্লুক বা আকস্মিক ভাগ্য ছিল না, তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। মরক্কোর অনূর্ধ্ব-২০ দল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে, মূল দল ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ৬ নম্বরে উঠে এসেছে। ব্রাজিলকে আটকে দেওয়া আর গ্রুপ পর্বে স্কটল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও কানাডাকে পিষে ফেলা মরক্কো আজ এক অপ্রতিরোধ্য পরাশক্তি।

ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো বিশ্বসেরা প্রতিভাদের নিয়ে গড়া আক্রমণভাগ কাগজে-কলমে হয়তো অনেক শক্তিশালী, কিন্তু মরক্কোর মাঝমাঠও ফরাসিদের সমান টক্কর দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বস্টনের গ্যালারিতেও আজ মরক্কোর সমর্থনের জোয়ার ভাসিয়ে নিয়ে যাবে ফরাসিদের, কারণ মরক্কো থেকে তো বটেই, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাখো মরক্কান আজ আমেরিকার গ্যালারি দখল করতে চলেছেন।
তবে মরক্কোর আসল শক্তি কেবল ফুটবলীয় ট্যাকটিক্সে নয়, লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত ও আবেগঘন মনস্তত্ত্বে, তা হলো খেলোয়াড়দের মায়েদের উপস্থিতি। কাতারে আশরাফ হাকিমির মাকে জড়িয়ে ধরা কিংবা সুফিয়ান বুফালের মায়ের সাথে মাঠে নাচার সেই দৃশ্যগুলো বিশ্ব কাঁপিয়েছিল। এবারও ডাচদের বিদায় করে জয়সূচক পেনাল্টি মেরেই গ্যালারিতে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ইসমাইল সাইবারি। মরক্কো ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফৌজি লেকজা এই ‘আম্মাজান থিওরি’-কে তাদের সবচেয়ে বড় সাইকোলজিক্যাল স্ট্র্যাটেজি বলে উল্লেখ করেছেন। অভিজ্ঞ সাংবাদিক হামিদ বেল হাসানও একমত, “মায়ের দোয়ার চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু হতে পারে না। গ্যালারিতে মাকে দেখলে খেলোয়াড়দের শক্তি দ্বিগুণ হয়ে যায়।

মাঠের বাইরে এই ম্যাচের আরেকটি বড় ঝাঁঝ হলো দুই দেশের ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও অভিবাসনের টানাপোড়েন। মরক্কোর অনেক খেলোয়াড়ই ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলে খেলে বড় হয়েছেন, কিন্তু নিজেদের শিকড় ও পূর্বপুরুষের দেশকে ভালোবেসে মরক্কোর জার্সি গায়ে জড়িয়েছেন। ইউরোপের বৃহত্তম মরক্কান ডিয়াসপোরা আজ ফরাসিদের বিরুদ্ধে নিজেদের পরিচয় প্রমাণের এক অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে নামবে। আর এই পুরো আবেগের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আশরাফ হাকিমি ও কিলিয়ান এমবাপে যারা ক্লাবে হরিহর আত্মা হলেও, এবার একে অপরের পরম শত্রু। কাতারে মরক্কো ইতিহাস গড়েছিল, আর বস্টনে তারা প্রমাণ করতে নামবে যে, সেটি কোনো শেষ ছিল না, ওটা ছিল শুধু এক নতুন পরাশক্তির উত্থানের শুরু!
তথ্যসূত্র: বিবিসি
