মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ তিন সপ্তাহ ধরে চলা একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে আবারও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ব্যাপক সামরিক সংঘাত শুরু হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলের উত্তেজনা এক ভয়াবহ রূপ নেয়। সম্প্রতি কাতারি ও সৌদি পণ্যবাহী জাহাজে হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাতিল’ ঘোষণা করতেই দুই দেশের মধ্যে এই নতুন করে বারুদ জ্বলে উঠেছে।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় এবং পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার জবাবে বৃহস্পতিবার উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী। এই পাল্টাপাল্টি হামলার পরই ইরানের বুশেহরে অবস্থিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কোনারাক, চোগহাদক এবং বন্দর আব্বাসসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক স্থানে বিকট বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, গত ৮ ও ৯ জুলাই মার্কিন হামলায় ৫টি প্রদেশে অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন। এমনকি রাশিয়া ও চীনের সাথে বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত একটি রেল সেতুতেও মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের বৃষ্টি ও মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত: ইরানের সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে জানিয়েছে, তারা কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, কাতারের একটি প্রাথমিক সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং বাহরাইনে মার্কিন সেনার একটি জ্বালানি ডিপো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। কুয়েত সরকার নিশ্চিত করেছে, তাদের আকাশসীমায় একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১০টি ড্রোন প্রবেশ করেছিল, যা তাদের বাহিনী প্রতিহত করেছে।
অন্যদিকে, জর্ডানের আকাশসীমা দিয়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র যাওয়ার সময় সাইরেন বেজে ওঠে এবং জর্ডান বাহিনী আটটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করে। পরবর্তীতে ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) দাবি করে, তারা জর্ডানের আজরাক সামরিক ঘাঁটিতে (যা মার্কিন বাহিনী ব্যবহার করে) এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।

হরমুজ প্রণালী ও তেলের বাজারে অস্থিরতা: বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে। রেভোলিউশনারি গার্ডসের নৌবাহিনী জানিয়েছে, মার্কিন হস্তক্ষেপের কারণে এই জলপথটি পুনরায় সচল করার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সামাজিক মাধ্যম এক্সে স্পষ্ট ভাষায় লেখেন, হরমুজ প্রণালী শুধু ইরানের ব্যবস্থাপনায় পুনরায় উন্মুক্ত হবে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হুমকিতে নয়। এই সামরিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়লেও, বিনিয়োগকারীরা এই সংঘাত সাময়িক হতে পারে বলে আশা করায় বৃহস্পতিবার দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও কূটনৈতিক তৎপরতা: যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত রাখার স্থানসহ প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। তুরস্কে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, জাহাজে বোমাবর্ষণের প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে। এমনটা আবার ঘটলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে! তবে তিনি এটিও যোগ করেছেন, এই সংঘাত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে না এবং যা-ই ঘটুক না কেন, তা খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।
এই বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কাতার বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি উভয় পক্ষকে কূটনীতির টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। তুরস্ক ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সাথে ফোনালাপে সামরিক উত্তেজনা পরিহার করার অনুরোধ জানান। তবে আরাগচি পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সাথে আলাপকালে এই সংকটের জন্য ওয়াশিংটনের ]যুদ্ধংদেহী নীতি’-কে দায়ী করেছেন। খামেনেইর দাফন সম্পন্ন হওয়ার দিনই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
