বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মঞ্চে চূড়ান্ত হয়ে গেল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, ঝাঁঝাল আর বারুদ ঠাসা এক মেগা ফাইট! কোয়ার্টার ফাইনালের অগ্নিপরীক্ষায় নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ের নাটকে বিদায় করে আগামী বুধবারে আটলান্টার মাঠে মুখোমুখি হচ্ছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, ইংল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনা। মাঠের এই দ্বৈরথ কেবল ফাইনালের টিকিট কাটার লড়াই নয়, এর পেছনে জড়িয়ে রয়েছে কয়েক দশকের পুরনো ফুটবলীয় শত্রুতা এবং রাজনৈতিক বৈরিতার এক রক্তাক্ত ইতিহাস।

কাতারের পর এবার আমেরিকার মাটিতেও ব্যাক-টু-ব্যাক বিশ্বকাপ জিতে ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে ইতিহাস গড়তে মরিয়া লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে, জুড বেলিংহাম ও হ্যারি কেনের যুগলবন্দীতে ভর করে দীর্ঘ ৬০ বছরের ট্রফি খরা ঘোচাতে জানপ্রাণ লড়তে প্রস্তুত থ্রি-লায়ন্সরা। আগামী বুধবারের এই মহারণের জয়ী দল আগামী ১৯ জুলাইয়ের মেগা ফাইনালে মুখোমুখি হবে ফ্রান্স বনাম স্পেনের মধ্যকার মঙ্গলবারের সেমিফাইনাল জয়ী দলের সাথে।
ফকল্যান্ড যুদ্ধ ও ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’: আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের এই ম্যাচের আবহ ঠিক ৪০ বছর আগের মেক্সিকোর সেই ঐতিহাসিক ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। সেবার এস্তাদিও অ্যাজটেকায় ডিয়েগো ম্যারাডোনার দুটি ঐতিহাসিক গোল (যার একটি 'হ্যান্ড অব গড' এবং অন্যটি শতাব্দীর সেরা একক গোল) আর্জেন্টিনাকে ২-১ ব্যবধানে জয় এনে দিয়েছিল।

তবে এই লড়াইয়ের ঝাঁঝ শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ (আর্জেন্টাইনদের কাছে যা ‘মালভিনাস’ নামে পরিচিত) নিয়ে দু’দেশের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সামরিক যুদ্ধ।
শনিবার কানসাস সিটিতে সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে উড়িয়ে দেয়ার পর আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি অবশ্য এই ম্যাচের রাজনৈতিক উত্তাপ কমানোর চেষ্টা করেছেন। বেশ চনমনে গলায় বলেন, সরাসরি বার্তা হলো, এটি শুধুই একটা ফুটবল ম্যাচ। এর বেশি কিছু আমি বলতে পারব না। আমরা একটা কঠিন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়ব যাদের একজন চমৎকার কোচ আছেন। ব্যাস, এটুকুই!

রেগে আগুন টুখেল: শনিবার মায়ামির চড়া তাপমাত্রা আর আর্দ্রতায় নরওয়েকে ২-১ ব্যবধানে হারাতে ঘাম ছুটে গেছে ইংল্যান্ডের। ৩৬ মিনিটে নরওয়ের আন্দ্রেয়াস শিয়েল্ডারুপের দুর্দান্ত শটে ইংল্যান্ড পিছিয়ে পড়লে থ্রি-লায়ন্স শিবিরে হাহাকার নেমে আসে।
তবে প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে এক নাটকীয় কাণ্ড ঘটে! নরওয়েজিয়ান গোলরক্ষক অরজান ন্যাল্যান্ডের একটি গোলকিক মাঠের ওপর ঝুলে থাকা ক্যামেরা ক্যাবলে লেগে দিক পরিবর্তন করেছে, এমন দাবি তোলে নরওয়ে। কিন্তু রেফারি খেলা চালিয়ে যান এবং সেই আক্রমণ থেকেই জুড বেলিংহাম গোল করে ইংল্যান্ডকে সমতায় ফেরান। পরে অতিরিক্ত সময়ে বেলিংহামের গোলেই সেমিতে পৌঁছায় ইংল্যান্ড।

ম্যাচ জিতলেও দলের নড়বড়ে ডিফেন্স আর পারফরম্যান্স দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন ইংলিশ বস থমাস টুখেল। ম্যাচ শেষে বেশ কড়া সুরে টুখেল বলেন, আজ আমরা নিজেদের জীবন নিজেরাই বড্ড কঠিন করে ফেলেছিলাম। ম্যাচের ফলাফল ফ্যান্টাস্টিক, শেষ চারে যাওয়াটাও দারুণ; কিন্তু দলের এমন পারফরম্যান্সে আমি মোটেও খুশি নই... আজ আমরা ভাগ্যের জোরে বড্ড বেঁচে গেছি। আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে জিততে হলে এই খেলায় বিশাল উন্নতি করতে হবে।
তার বিতর্ক ও হালান্ডের আবেগঘন বিদায়: ফিফা পরে অফিশিয়ালি এক বিবৃতিতে জানায় যে ক্যামেরা ক্যাবলের সাথে বল লাগার কোনো প্রমাণ তাদের সেন্সরে পাওয়া যায়নি। তবে নরওয়ের কোচ স্টেল সোলবাকেন নিজের দাবিতে অনড় থেকে বলেন, ওটা আমাদের দুর্ভাগ্য। বলটা একদম আকাশ থেকে সোজা নিচে পড়ে, যার মানে গতিপথ বদলে গিয়েছিল। কিন্তু এখন আর আমাদের কিছু করার নেই।
এদিকে চলতি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ৭টি গোল করে নরওয়েকে ইতিহাসের সেরা সাফল্য এনে দেওয়া গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড এই ম্যাচে গোল পাননি। দেশের হয়ে টানা ১৫ ম্যাচ গোল করার পর অবশেষে থামলেন তিনি। তবে বিদায়বেলায় বেশ ইমোশনাল শোনাল এই দানবীয় স্ট্রাইকারকে।
তিনি বলেন, আমরা যেভাবে নরওয়েকে বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে তুলে ধরেছি, সেটাই আমার মনকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে। আশা করি এই টুর্নামেন্ট নরওয়ের তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে যে, নরওয়ের জার্সি গায়ে জড়িয়েও বিশ্বমঞ্চ কাঁপানো সম্ভব। নরওয়ের রূপকথা ভাঙার পর এখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের চোখ বুধবারে আটলান্টার সেই ঐতিহাসিক রণক্ষেত্রে!
