আকাশি-সাদা জার্সিতে দীর্ঘ দুই দশকের মহাকাব্যিক অধ্যায়ের ইতি টানতে চলেছেন লিওনেল মেসি। বুয়েনোস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্তালে বেনিনের বিরুদ্ধে নিজের ২০৮তম এবং ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচে মাঠে নামছেন ৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবল ঈশ্বর। তবে বিদায়ের এই পরম আবেগময় ক্ষণটি যতটা সহজ ও রঙিন মনে হচ্ছিল, ভেতরের সত্য নাকি ততটাই তিক্ত ও বিতর্কিত!
ইতালীয় সংবাদমাধ্যম গাজ্জেত্তা দেল্লো স্পোর্ত-এর বিস্ফোরক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিদায়ী প্রীতি ম্যাচটি খেলা নিয়ে মেসির মনেই ছিল তীব্র অসন্তোষ ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব। মহাতারকার সন্দেহ, তাঁর বিদায়কে ঘিরে আবেগ বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যিক ফায়দা লুটতেই এএফএ (আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন) এই ম্যাচের নাটক সাজিয়েছে।

গত জুলাইয়ে নিউ জার্সিতে স্পেনের কাছে ২০২৬ বিশ্বকাপের শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে হেরে মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন মেসি। এরপর বাবা কামালের অসুস্থতা ও আকস্মিক মৃত্যুর শোক সহ্য করতে না পেরে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন তিনি। দেশের হয়ে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেয়ার পর এমন বিয়োগান্তক মুহূর্তে এএফএ যখন বিদায়ী ম্যাচের প্রস্তাব নিয়ে আসে, তখন মেসি স্পষ্ট বুঝতে পারেন, এটি কেবল তাঁর বিদায়ের সম্মান জানানোর অনুষ্ঠান নয়, বরং তাঁর নাম ভাঙিয়ে বিপুল অর্থ পকেটে পুরবার এক চতুর বাণিজ্যিক বন্দোবস্ত। শুধু মেসিই নন, দলের হেড কোচ লিওনেল স্কালোনিও এএফএ’র এই রহস্যময় আয়োজন ও তাড়াহুড়ো নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।
বিতর্কের পারদ আরও ছড়িয়েছে প্রতিপক্ষ নির্বাচনে এএফএ’র 'কৃপণতা' ও ব্যাবসায়িক চালবাজি নিয়ে। অভিযোগ উঠেছে, আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন কলম্বিয়ার একটি এজেন্সিকে দায়িত্ব দিয়েছিল এমন কোনো প্রতিপক্ষ খুঁজে বের করতে, যারা কোনো প্রকার 'ম্যাচ ফি' বা অর্থ দাবি করবে না! আর সেই ফাঁদে পা দিয়ে বেনিন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মেসির এই ঐতিহাসিক বিদায়ী ম্যাচের প্রতিপক্ষ হতে রাজি হয়, শুধুমাত্র ইতিহাসের পাতায় একটি যৌথ ছবির অংশ হওয়ার লোভে।

অবশেষে সব তিক্ততা আর দ্বিধা পেছনে ফেলে সতীর্থদের অনুরোধে শেষবারের মতো বুয়েনোস আইরেসের প্রায় ৮৫ হাজার গ্যালারিভর্তি দর্শকের সামনে নামতে সম্মত হয়েছেন মেসি। এই ঐতিহাসিক রাতে তাঁর সঙ্গে বিদায় নিতে পারেন দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী ৩৮ বছর বয়সী সহ-অধিনায়ক নিকোলাস ওটামেন্ডিও। এমনকি রদ্রিগো ডি পল ও জিওভানি লো সেলসোর মতো অভিজ্ঞ তারকাদেরও এই ম্যাচের জন্য বিশেষভাবে স্কোয়াডে ডাকা হয়েছে, যার অর্থ এটি হয়তো তাঁদেরও শেষ আন্তর্জাতিক উপস্থিতি হতে যাচ্ছে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপজয়ী সদস্য ও নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিরা মিলেমেশে এক নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে এদিন।
২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল ও ৬৮টি অ্যাসিস্ট নিয়ে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সেরা সব রেকর্ড এককভাবে নিজের নামে লিখে রেখে যাচ্ছেন মেসি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার চেয়ে যা ৬৯ গোল বেশি এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা হাভিয়ের মাসচেরানোর চেয়ে ৬১ ম্যাচ বেশি! ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কিংবা লুকা মদরিচের মতো দুই শতাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার বিরল মাইলফলক স্পর্শ করলেও, তাঁদের চেয়ে মেসি আলাদা, কারণ তাঁর ক্যাবিনেটে জ্বলজ্বল করছে একটি বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা এবং ফিনালিসিমার মতো রাজকীয় সব ট্রফি।
ইন্টার মিয়ামির সাথে ২০২৮ সাল পর্যন্ত চুক্তি থাকলেও বাবার মৃত্যুর পর ক্লাব ক্যারিয়ারও যেকোনো সময় থামিয়ে দেওয়ার আভাস দিয়েছেন মেসি। তবে মঙ্গলবার রাতের পর যাই ঘটুক না কেন, আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে মেসির শেষ রাতটি কেবল বিদায়ের অশ্রুতেই সিক্ত হচ্ছে না, বরং ফুটবল রাজনীতির নোংরা বাণিজ্যের কালো দাগ বুকে নিয়েই ইতি টানছে এক অনন্য যুগের!
তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
