মঙ্গলবার রাতে রিভার প্লেটের বিখ্যাত এস্তাদিও মনুমেন্তালে আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজের ২০৮তম এবং শেষ ম্যাচে মাঠে নামবেন লিওনেল মেসি। দীর্ঘ ২১ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের ওজনের সমপরিমাণ সোনা হয়ে যিনি আলো ছড়িয়েছেন, সেই ৩৯ বছর বয়সী কিংবদন্তির বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে বিশেষ জার্সি তৈরি করেছে তাঁর স্পন্সর প্রতিষ্ঠান অ্যাডাস। বেনিনের বিরুদ্ধে ম্যাচে তিনি যে জার্সি পরে নামবেন, তাতে তাঁর নাম ও নম্বর মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে খাঁটি সোনার রঙে।
স্টেডিয়ামজুড়ে অশ্রুসজল চোখের ঘাটতি থাকবে না সেদিন। অ্যালবিসেলেস্তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ ১২৫ গোল করা খেলোয়াড় হিসেবে মাঠ ছাড়ছেন মেসি। তাঁর হাত ধরেই এসেছে দেশটির তৃতীয় বিশ্বকাপ এবং টানা দুটি কোপা আমেরিকার ট্রফি।
চলতি বছরের গ্রীষ্মে দলকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বজয়ের ট্রফি উপহার দেওয়ার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। ফাইনাল পর্যন্ত দলের যাত্রায় করেছিলেন ৮টি গোল, যদিও শেষ পর্যন্ত স্পেনের কাছে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের পর ব্যক্তিগত জীবনের বড় ট্র্যাজেডি নেমে আসে তাঁর জীবনে, বাবাকে হারান তিনি। শেষ পর্যন্ত তিনি উপলব্ধি করেন, দেশকে আর নতুন কিছু দেওয়ার নেই, আর সেখান থেকেই জাতীয় দল থেকে বিদায়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, মেসির শূন্যস্থান পূরণ করার সাধ্য কারও নেই। অনেকের চোখেই তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার; সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত এমন অবিশ্বাস্য প্রতিভার দেখা ফুটবল বিশ্ব হয়তো আর কখনোই পাবে না। কিন্তু সময়ের নিয়মে সেই ঐতিহ্যবাহী ১০ নম্বর জার্সি অন্য কাউকেই গায়ে জড়াতে হবে না এবং এই জাদুকর অধিনায়ককে ছাড়াই আর্জেন্টিনাকে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ শক্তি হিসেবে টিকে থাকার পথ খুঁজে নিতে হবে।

ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সির রাজকীয় ভার
আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আগেও একবার গিয়েছেন। ১৯৯৪ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনা যখন বুট জোড়া তুলে রাখেন, তখন জাতীয় দল এক চরম অস্থিরতা ও ব্যর্থতার যুগে প্রবেশ করেছিল। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ার পর ২০০২ সালে তারা গ্রুপ পর্বের গণ্ডিও পার হতে পারেনি। পরপর তিনটি কোপা আমেরিকার কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের, এমনকি ২০০৪ সালের ফাইনালে ব্রাজিলের দ্বিতীয় সারির দলের কাছে টাইব্রেকারে হারতে হয়েছিল। পাবলো আইমার, আরিয়েল ওরতেগা এবং হুয়ান রোমান রিকুয়েলমে, সবাই ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি গায়ে জড়িয়েছিলেন। তারা সবাই অসাধারণ খেলোয়াড় ছিলেন, কিন্তু সেই বিখ্যাত নম্বরের মানসিক চাপ শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য বড় ভার হয়ে উঠেছিল।
আর্জেন্টাইনদের কাছে ম্যারাডোনা ছিলেন এক দেবতার মতো; একজন প্রচণ্ড আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও সৃষ্টিশীল ফুটবলার, যিনি একা হাতে ১৯৮৬ সালে দলকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। তাঁর জুতোয় পা গলানো কারও পক্ষে সম্ভব, এমনটা ভাবাই কঠিন ছিল, যত দিন না ২০০৫ সালে মেসির অভিষেক হয়।
শুরুর দিকে ১০ নম্বর জার্সিটি রিকুয়েলমের কাছেই ছিল, ২০০৮ সালে মেসির সঙ্গে জুটি বেঁধে অলিম্পিক সোনা জিতেছিল তিনি। এরপর ২০০৯ সালে অবসর নেওয়ার সময় তিনি সেই ১০ নম্বর জার্সিটি তুলে দেন বার্সেলোনার সেই উঠতি তারকার হাতে। তবে ম্যারাডোনার উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে এবং ভক্তদের ভালোবাসা জয় করতে মেসির বেশ কিছু সময় লেগেছিল। কিন্তু শান্ত ও নিভৃতচারী এক তরুণ প্লে-মেকার থেকে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন এক অপ্রতিরোধ্য এবং ভীতিহীন দলনেতা।
মেসি ১০ নম্বর জার্সিটিকে সম্পূর্ণ নিজের করে নেন এবং সব জল্পনা-কল্পনা ছাপিয়ে স্বদেশে ম্যারাডোনার মতোই, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁর চেয়েও বেশি, জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তবে একই রকম অলৌকিক ঘটনা কি তিনবার ঘটতে পারে?
আর্জেন্টিনা আবারও যে একটি হতাশাজনক ট্রানজিশন বা উত্তরণকালীন সময়ের মধ্য দিয়ে যাবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। লিওনেল স্কালোনির বর্তমান স্কোয়াডের কাউকেই ঠিক এই মুহূর্তে মেসির ১০ নম্বর শার্টটির যোগ্য উত্তরাধিকারী বলে মনে হচ্ছে না।
সবচেয়ে নিরাপদ পছন্দ: হুলিয়ান আলভারেস

স্কালোনির জন্য সবচেয়ে সহজ পদক্ষেপ হবে হুলিয়ান আলভারেসকে ১০ নম্বর জার্সি দেওয়া। ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে যখন মেসি মাত্র ১০টি ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলেন, তখন আতলেতিকো মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড নিয়মিতই আক্রমণভাগে মেসির ভূমিকা পালন করেছেন।
আলভারেস সেই সুযোগে দারুণ নজর কেড়েছিলেন; সব মিলিয়ে ৭টি গোলে সরাসরি অবদান রাখেন তিনি। যার মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় পারফরম্যান্স ছিল ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ৪-১ গোলের বড় জয়ে। ম্যাচের চতুর্থ মিনিটেই দারুণ ফিনিশিংয়ে গোলের খাতা খোলেন তিনি, প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন এবং চমৎকার ডাইগোনাল রানে রক্ষণভাগকে বারবার তছনছ করেন।
সর্বোচ্চ স্তরে বড় ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতার বিচারে তাঁর চেয়ে ভালো প্রার্থী আর কেউ হতে পারে না। ম্যানচেস্টার সিটির ট্রেবলজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি এবং স্পেনে পাড়ি জমানোর পর দ্রুতই হয়ে ওঠেন আতলেতিকোর মূল চালিকাশক্তি। স্প্যানিশ ক্লাবটির হয়ে ১১০ ম্যাচে তাঁর গোল অবদান ৬৭টি। ২৬ বছর বয়সে তিনি এখন ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে আছেন, আর সে কারণেই এই গ্রীষ্মে বার্সেলোনা এবং আর্সেনাল দুটো ক্লাবই তাঁকে দলে ভিড়াতে মরিয়া ছিল। স্কালোনির সামনে আলভারেসের চেয়ে নিরাপদ বাজি আর নেই।
তবে এত কিছুর পরও, আলভারেসের মধ্যে মেসির মতো প্লে-মেকিং বা গেম তৈরির সেই সহজাত প্রবণতা নেই। উপরন্তু, সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে সেই অবিশ্বাস্য গোলটি ছাড়া পুরো বিশ্বকাপে তিনি আশ্চর্যজনকভাবে কিছুটা নিস্তেজ ছিলেন। জাতীয় দলের হয়ে ৬১ ম্যাচে ১৬ গোলের বিনয়ী রেকর্ড নিয়ে আলভারেসকে এখনও প্রমাণ করতে হবে যে তিনি বড় মঞ্চে নিয়মিত পারফর্ম করতে পারেন এবং ১০ নম্বরের যোগ্য হতে হলে তাঁর শারীরিক সামর্থ্য আরও বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে নিকটতম প্রতিচ্ছবি: নিকো পাজ

জাতীয় দলে নিকো পাসের সূচনা খুব একটা আলোড়ন তৈরি করতে পারেনি—১৩ ম্যাচে মাত্র ৩ গোল করেছেন, আর বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছেন খুব কমই। এর মূল কারণ হলো, স্টাইল ও খেলার ধরণে তিনি মেসির বড্ড কাছাকাছি।
একজন বুদ্ধিমান, শারীরিকভাবে দক্ষ এবং কৌশলগতভাবে অসাধারণ ১০ নম্বর খেলোয়াড়—যিনি এক নিমেষে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন এবং যিনি বাঁ পায়ের খেলোয়াড়—সেদিক থেকে পাসের হাতে মেসির ব্যাটন যাওয়াটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। ২২ বছর বয়সী এই তরুণ ইতালীয় ক্লাব কোমোর হয়ে ইতোমধ্যেই মেসির পথ অনুসরণ করছেন। ২০০৮ সালে বার্সেলোনায় মেসির পর সর্বকনিষ্ঠ আর্জেন্টাইন হিসেবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের একক ম্যাচে একাধিক গোল করানোর কীর্তি গড়ার পথে তিনি।
ইউরোপের সেরা প্রতিযোগিতায় কোমোর ঐতিহাসিক ৪-১ গোলের জয়ে (আরবি লাইপজিগের বিরুদ্ধে) তিনি ২টি অ্যাসিস্ট করেছিলেন। ৯৫ শতাংশ নিখুঁত পাস, ৪টি সফল ড্রিবল এবং ১০টি গ্রাউন্ড ডুয়েল জয়ের মাধ্যমে পাস সেই ম্যাচে মাঠের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার শক্ত দাবিদার ছিলেন।
২০২৪ সালে রিয়াল মাদ্রিদ থেকে নিকো পাসকে সই করানোর পর থেকে কোমো এমন পারফরম্যান্সে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। সেস্ক ফ্যাব্রেগাসের অধীনে কোমোর দ্রুত উন্নতির নেপথ্যে বড় অবদান ছিল তাঁর। এমনকি আগামী গ্রীষ্মে রিয়াল মাদ্রিদ তাঁদের বাই-ব্যাক অপশন ব্যবহার করে তাঁকে আবার সান্তিয়াগো বার্নাবেউতে ফিরিয়ে নিতে পারে।
আগস্ট মাসে ফ্যাব্রেগাস বলেছিলেন, নিকো পাসের মধ্যে সব গুণ আছে। তাঁর অসাধারণ সাহস, ভিশন এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। মেসি নিজেও পাসের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, তাঁর মাথা খুব দারুণ কাজ করে এবং সে ফুটবলটা খুব নিখুঁত বোঝে, যা স্পষ্ট করে দেয় কেন তিনি আর্জেন্টিনার নতুন ভরসা।
তবে তাঁকে নিয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশার ক্ষেত্রে কিছুটা রাশ টানা প্রয়োজন। গলে শট নেওয়ার ভালো ক্ষমতা থাকলেও পাস হয়তো কখনোই মেসির মতো বিশাল পরিমাণের গোল স্কোরার হবেন না; তিনি কোনো দলের একক মূল নায়কের চেয়ে একটি দলের পুরো সিস্টেমের প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে বেশি কার্যকর। অবশ্য এটা দলের জন্য খারাপ নাও হতে পারে, কারণ তাঁর সৃষ্টিশীল ক্ষমতা দলকে একমুখী না করে আক্রমণভাগে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলবে।
নতুন ও সম্ভাবনাময় তারাকা: ফ্রাঙ্কো মাস্তান্তুওনো

আর্জেন্টিনার হাতে আরও একটি প্রতিশ্রুতিশীল বাঁ পায়ের সম্পদ রয়েছে, তিনি ১৯ বছর বয়সী উইঙ্গার ফ্রাঙ্কো মাস্তান্তুওনো। রিভার প্লেটের অ্যাকাডেমি থেকে উঠে আসা এই তরুণ গত গ্রীষ্মে ৪৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়ে ইউরোপীয় ফুটবলে পা রাখার পর প্রথম মৌসুমে কিছুটা কঠিন সময় পার করেছেন, লা লিগায় খেলেছেন মাত্র ২৩টি ম্যাচ।
তবে ক্লাবের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে; জাবি আলোনসোর অধীনে ব্যর্থতার পর আলভারো আরবেলোয়ার আমলে রিয়াল যখন একের পর এক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন মাস্তান্তুওনো নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারেননি। পরবর্তীতে আগস্টে রিয়াল তাঁকে ফিওরেন্তিনায় ধারে পাঠায়, আর এই নতুন পরিবেশ তাঁর জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে।
ইতালীয় ক্লাবটির সমর্থকেরা এই তরুণকে লুফে নিয়েছেন। ১১ সেপ্টেম্বর ভেনেসিয়ার বিরুদ্ধে ৪-২ গোলের জয়ে তিনি এক দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করেন। বক্সের বাইরে থেকে দুটি দূরপাল্লার নিখুঁত শটে গোল করার পর, ডিফেন্ডারদের ফাঁক গলে বক্সে ঢুকে হ্যাটট্রিক পুরো করেন তিনি।
ঠিক মেসির মতোই, তিনি রাইট টাচলাইন থেকে খেলা শুরু করে ভেতরের দিকে কাট-ইন করে আসতে পছন্দ করেন এবং গোলপোস্টের সামনে অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন। প্রতিপক্ষের টাইট স্পেসের মধ্যে বল নিয়ন্ত্রণ রাখা এবং কম সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি নিয়ে ড্রিবল করার ক্ষমতা তাঁর দারুণ।
মাস্তান্তুওনোর কাঁধে ইতোমধ্যেই ১০ নম্বর জার্সির দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে; ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে এক বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে ম্যারাডোনার রেকর্ড ভেঙে সবচেয়ে সর্বকনিষ্ঠ আর্জেন্টাইন হিসেবে তিনি ১০ নম্বর জার্সি গায়ে চাপিয়েছিলেন। মেসির স্তরে পৌঁছানোর মানসিক চাপ যেখানে অনেক খেলোয়াড়কে চূর্ণ করে দিয়েছে, সেখানে মাস্তান্তুওনো এই চ্যালেঞ্জ বুক চিতিয়ে গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখেন। নিছক প্রতিভার বিচারে স্কালোনির বিবেচনার জন্য তিনিই সবচেয়ে রোমাঞ্চকর পছন্দ।
বাইরের দৌড়ে থাকা ঘোড়া: থিয়াগো আলমাদা

ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে মাস্তান্তুওনোর আগে থিয়াগো আলমাদারই আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি পরে নামার কথা ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে ইনজুরির কারণে তিনি ছিটকে যান। ফিটনেস সমস্যার কারণে ২৫ বছর বয়সী এই খেলোয়াড় সাম্প্রতিক স্কোয়াড থেকেও বাদ পড়েছেন, তবে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই স্কালোনির প্রিয় পাত্রদের একজন।
ভেলেজ সার্সফিল্ডের অ্যাকাডেমি থেকে উঠে আসা এই ফুটবলার কাতারে বিশ্বকাপজয়ী স্কোয়াডের অংশ ছিলেন। জাতীয় দলের হয়ে ২৫ ম্যাচে তিনি একজন কার্যকর অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার, সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার কিংবা দু উইংয়ের যেকোনো জায়গায় খেলতে পারেন। ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার হওয়া সত্ত্বেও তিনি বেশ শক্তপোক্ত, তাঁর স্ট্যামিনা চমৎকার এবং দ্রুত গতি ও দিক পরিবর্তন করে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভাঙতে তিনি পারদর্শী।
তবে তিনি এখনও ইউরোপ বা বিশ্বের এলিট শ্রেণীতে জায়গা করে নিতে পারেননি। এমএলএস-এ আটলান্টা ইউনাইটেডের হয়ে আলো ছড়ালেও ইউরোপীয় ফুটবলে নিজের ছাপ ফেলতে ব্যর্থ হন তিনি, লিওঁতে একটি ব্যর্থ লোন স্পেলের পর লা লিগায় আতলেতিকোর হয়ে পুরোপুরি ফ্লপ করেন।
দিয়েগো সিমিওনের রক্ষণাত্মক ফরমেশন আলমাদার স্টাইলের সাথে মেলেনি; লা লিগায় ২৭ ম্যাচে মাত্র ৩ গোল করে তিনি প্রথম একাদশে জায়গা হারাতে থাকেন। অবশেষে গ্রীষ্মকালীন দলবদলে লোকসান সয়ে আতলেতিকো তাঁকে ২০ মিলিয়ন ইউরোতে রিভার প্লেটের কাছে বিক্রি করে দেয়, যদিও চুক্তিতে বাই-ব্যাক ক্লজ রাখা হয়েছে।
এর থেকে বোঝা যায় সিমিওনে আলমাদার প্রতিভাকে মূল্য দেন এবং নিজের জন্মভূমিতে তিনি আবার পুরনো ফর্ম ফিরে পেতে পারেন। আর্জেন্টিনায় ফিরে আসাটা তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের জন্য ইতিবাচক, কারণ স্কালোনি এখন নিয়মিত তাঁকে নজরে রাখতে পারবেন। রিভার প্লেটের হয়ে প্রথম ৫টি ম্যাচের মধ্যে ২টি গোল করে শুরুটাও ভালো করেছেন তিনি। ১০ নম্বর জার্সির জন্য তিনি হয়তো অনেকটাই বাইরের প্রার্থী, তবে গত চার বছরে তিনি স্কালোনির ভরসা অর্জন করতে পেরেছেন।
মেসি-উত্তর এক নতুন ভোরের অপেক্ষা

আর্জেন্টিনা যে মেসির মতো হুবহু কোনো উত্তরসূরি খুঁজে পাবে, তার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি। ইন্টার মায়ামির এই মহাতারকাকে ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ সিনেমার সেই ‘নিও’ চরিত্রটির সাথে তুলনা করা যায়, যিনি পদার্থ বিজ্ঞান এবং যুক্তির সব নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতিপক্ষের চেয়ে সবসময় ৫০ ধাপ এগিয়ে থাকতেন। সেই কারণে ১০ নম্বর জার্সি হস্তান্তরকে শুধু একজনের থেকে আরেকজনের হাতে ‘মশাল তুলে দেওয়া’ হিসেবে দেখা ভুল হবে। আর্জেন্টিনাকে কৌশলগতভাবে বদলাতে হবে এবং মেসির প্রভাব পুষিয়ে নিতে একাধিক খেলোয়াড়কে একযোগে দায়িত্ব নিতে হবে।
যদি আলভারেস আক্রমণের একদম সামনে থাকেন, তাঁর ঠিক পেছনে পাস এবং ডান দিকে মাস্তান্তুওনো থাকেন, তবে তাঁদের মধ্যে কে ১০ নম্বর পরছেন তা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তারা একে অপরের পরিপূরক হতে পারেন এবং মাঝমাঠ থেকে এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার সমর্থন যোগালে যেকোনো প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার ক্ষমতা আর্জেন্টিনার আক্রমণের থাকবে। রক্ষণে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো নতুন অধিনায়ক হতে যাচ্ছেন, আর তাঁর সঙ্গে জুটি বাঁধার জন্য লিসান্দ্রো মার্টিনেজ তো আছেনই।
এই তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে এবং আক্রমণভাগে লাউতারো মার্তিনেসের উপস্থিতি নিশ্চিত করে সাফল্যের ধারা বজায় রাখার ভিত্তিটা প্রস্তুত আছে, তবে মেসির এই বিদায়ই শেষ বিদায় নয়। বিশ্বকাপের পরই নিকোলাস ওটামেন্ডি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন এবং এমিলিয়ানো মার্তিনেস, লিয়ান্দ্রো পারদেস ও নিকোলাস তাগলিয়াফিকোও হয়তো খুব দ্রুত একই পথ অনুসরণ করবেন। রদ্রিগো ডি পল এবং জিওভানি লো সেলসোর বয়সও ত্রিশ পার হয়ে গেছে।
চিন্তার বিষয় আরও আছে, প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনির চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ডিসেম্বরে। তিনি চুক্তি বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে ঘিরে এখন এক ধরণের অনিশ্চয়তা কাজ করছে। এক নতুন ভোরের সূচনা হতে চলেছে এবং তা একাধিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে। মেসির অনুপস্থিতিতে এখন স্কোয়াডের প্রতিটি সদস্যকে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং অনুপ্রেরণা জুগিয়ে দলকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
তথ্যসূত্র: গোল ডটকম
