চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আর যুদ্ধবিগ্রহের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই বিশ্বকাপের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সারছে ইরান ফুটবল দল। আগামী শনিবার মেক্সিকোতে নিজেদের বিশ্বকাপ বেস ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে উড়াল দেওয়ার আগে, বৃহস্পতিবার তুরস্কের মাটিতে নিজেদের শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে মাঠে নামছে পারসিয়ানরা। তবে ম্যাচটি নিয়ে বাড়তি গোপনীয়তা বজায় রাখছে দলটি। ইরানের ফুটবল ফেডারেশন বুধবার জানিয়েছে, মালির বিপক্ষে এই শেষ প্রীতি ম্যাচটি সম্পূর্ণ রুদ্ধদ্বার স্টেডিয়ামে, দর্শক এবং সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি ছাড়াই অনুষ্ঠিত হবে।
বাছাইপর্বের বৈতরণী পার করে সবার আগে বিশ্বকাপের টিকিট কাটলেও, গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে ইরান ভূখণ্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক বিমান হামলার পর থেকে দেশটির বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া নিয়েই চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তুরস্কের আন্টালিয়া সমুদ্র রিসোর্টে দুটি আলাদা কন্ডিশনিং ক্যাম্প করে তিনটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছে ইরান দল; যার মধ্যে নাইজেরিয়ার কাছে হারলেও কোস্টারিকা এবং গাম্বিয়াকে হারিয়েছে তারা। ফুটবল ফেডারেশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হেড কোচ আমির ঘালেনোইরের রণকৌশল ও ট্যাকটিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার গোপনীয়তা বজায় রাখতেই মালির বিরুদ্ধে ম্যাচটি সাধারণের অন্তরালে খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আমেরিকার মাটিতে সরাসরি ক্যাম্প করতে নিরাপত্তা ও ভ্রমণ জটিলতা থাকায় ইরান ফুটবল ফেডারেশন বেশ চতুরতার সাথেই ফিফাকে রাজি করিয়েছে। যার ফলে তাদের বিশ্বকাপ বেস ক্যাম্প আমেরিকার অ্যারিজোনার টুসন থেকে সরিয়ে মেক্সিকোর সীমান্ত শহর টিজুয়ানাতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এই মেক্সিকোর আস্তানা থেকেই তারা সীমান্ত পেরিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়ে ‘গ্রুপ জি’ তে নিজেদের প্রথম দুটি ম্যাচে নিউজিল্যান্ড (১৫ জুন) এবং বেলজিয়ামের মুখোমুখি হবে। আর গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মিশরের সাথে লড়তে তাদের যেতে হবে সিয়াটলে।

তবে মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও এখন বেশি চর্চা হচ্ছে হোয়াইট হাউসের কড়া নজরদারি নিয়ে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার প্রতিনিধি পরিষদের এক কমিটির শুনানিতে সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান ফুটবল দলের আমেরিকায় প্রবেশে ওয়াশিংটনের কোনো আপত্তি নেই।
কিন্তু দলের আড়ালে যদি কোনো রাজনৈতিক চাল চালা হয়, তবে তা বরদাশত করা হবে না। ফুটবলারদের সাথে আসা অফিশিয়াল বা স্টাফদের মধ্যে যদি ইরানের এলিট সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তবে তাঁদেরকে কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখতে দেওয়া হবে না।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমরা দলটির প্রতিনিধিদলের ভেতরে এমন একঝাঁক মানুষকে লুকিয়ে আসতে দেব না, যাদের খেলাধুলার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই এবং যাদের সাথে আইআরজিসি বা এই জাতীয় সংস্থার যোগসূত্র রয়েছে। আমরা এই বিষয়টির ওপর কড়া নজর রাখছি। উল্লেখ্য, বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা, উভয় দেশই আইআরজিসিকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে রেখেছে।

এই কঠোর নিয়মের গ্যাঁড়াকলে পড়ে গত এপ্রিলের শেষের দিকে ফিফা কংগ্রেসে যোগ দিতে গিয়ে বড়সড় ধাক্কা খেয়েছিলেন ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদি তাজ। এই এলিট সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগে কানাডা সরকার তাঁকে দেশে প্রবেশের ভিসা দেয়নি। মাঠের বাইরের এই রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি আর ভিসা জটিলতার মানসিক চাপ সামলে আগামী ১৫ জুন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ইরানের ফুটবলাররা কতটা নিজেদের মেলে ধরতে পারেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
