ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে তিল ধারণের জায়গা নেই। বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের উপচে পড়া ভিড় আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশের ঝলকানির মাঝেই ব্রাজিলের ট্র্যাকসুট পরে প্রবেশ করলেন ফুটবলের চতুর জাদুকর, ৬৭ বছর বয়সী কার্লো আনচেলত্তি।
ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল মাগাহায়েসের পরপরই এই ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড মঞ্চে আসতেই একযোগে উঠল শতাধিক হাত! মরক্কোর বিরুদ্ধে উদ্বোধনী ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করে হেক্সা মিশনের শুরুতেই হোঁচট খাওয়া দলের সবশেষ অবস্থা জানতে পুরো ফুটবলবিশ্ব যে কতটা ব্যাকুল, এক দৃশ্যেই স্পষ্ট।

তবে হাইতির চেয়ে র্যাঙ্কিংয়ে ৭৭ ধাপ এগিয়ে থাকা ব্রাজিলের এই হাই-প্রোফাইল কোচ মোটেও আতঙ্কিত নন; বরং শুক্রবার (বাংলাদেশ সময় শনিবার সকাল সাড়ে ছ’টা) সি-গ্রুপের গ্রুপের ম্যাচটিকে তিনি দেখছেন দলের কঙ্কাল সারিয়ে খোলনলচে বদলে ফেলার এক দারুণ সুযোগ হিসেবে।
উদ্বোধনী ম্যাচে মরক্কোর ইসমায়েল সাইবারির গোলে শুরুতে পিছিয়ে পড়ে চরম স্নায়ুচাপে ভুগছিল সেলেসাওরা। শেষ পর্যন্ত ভিনিসিয়াস জুনিয়রের জাদুকরী পারফরম্যান্সের ওপর ভর করেই এক পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়তে পেরেছিল তারা।
টুর্নামেন্টের অন্যতম ‘আন্ডারডগ’ ও দুর্বল দল হাইতির বিরুদ্ধে অবশ্য ব্রাজিলের সহজ জয়ই প্রত্যাশা করছে ফুটবল দুনিয়া, যারা নিজেদের প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল।

ফিলাডেলফিয়ায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আনচেলত্তি তাঁর ট্রেডমার্ক শান্ত ভঙ্গিতে বলেন, প্রথম ম্যাচেই কেউ বিশ্বকাপ জিতে যায় না। আমাদের আসল সমস্যাটা খুঁজে সমাধান বের করতে হতো। গত কয়েকদিন ধরে আমরা সেটাই খুঁজছিলাম এবং আমার বিশ্বাস, আমরা সঠিক সমাধান পেয়ে গেছি। এই দলটি বিশ্বমঞ্চে সমানে-সমানে লড়াই করার জন্য পুরোপুরি তৈরি।
আনচেলত্তি অকপটে স্বীকার করেছেন, প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের ওই বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী হলুদ জার্সির অতিপ্রাকৃতিক চাপ তরুণ খেলোয়াড়দের মানসিকতায় কিছুটা প্রভাব ফেলেছিল। তিনি বলেন, মরক্কো ম্যাচের প্রথমার্ধটা আমাদের জন্য বেশ অপ্রত্যাশিত ছিল। উদ্বোধনী ম্যাচে এই জার্সির যে বিপুল প্রত্যাশার চাপ, তা হয়তো ছেলেদের কিছুটা নার্ভাস করে দিয়েছিল। শুরুটা ভালো করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটাই বিশ্বকাপের শেষ কথা নয়।
তবে ড্রেসিংরুমে খেলোয়াড়দের নিজেদের মধ্যকার ভুলত্রুটি নিয়ে আলোচনাকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কোচ। প্রথম ম্যাচে যারা ছন্দের বাইরে ছিলেন, তাদের দল থেকে ছুঁড়ে ফেলার পক্ষে নন তিনি। ইতালিয়ান এই গুরু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মরক্কোর বিরুদ্ধে প্রথমার্ধে যারা ভালো করতে পারেনি, তাদের আমাদের আরও সুযোগ দিতে হবে। প্রথম ম্যাচে আমাদের দলের কেউই তাদের সেরাটা দিতে পারেনি। তবে শুরুর ম্যাচগুলো কখনোই বিশ্বকাপের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করে দেয় না।

সমর্থকদের বড় একটা অংশ চিন্তিত, আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিলের কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশলগত বা ট্যাকটিক্যাল পরিচয় গড়ে উঠছে না। এই সমালোচনার জবাবে চতুর কোচ এক গাল হেসে বলেন, আমি কোনো একক পরিচয় চাই না। আমি চাই আমার দলের একাধিক কৌশলগত রূপ থাকুক, যেন প্রতিপক্ষ আমাদের সহজে পড়তে না পারে। তবে হ্যাঁ, হাইতি ম্যাচে আমরা কিছু পরিবর্তন করতে যাচ্ছি। আমাদের দলের ভারসাম্য এবং খেলার মান আরও উন্নত করতেই হবে।
দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখতে পারেনি সেলেসাওরা। ট্রফিবিহীন ব্রাজিলের এই দীর্ঘ খরা মেটানোর যে বিপুল চাপ শুধু লাতিন আমেরিকা নয়, পুরো বিশ্বের কোটি কোটি সমর্থকদের কাছ থেকে তাঁর ওপর আসছে, তা খুব ভালো করেই জানেন আনচেলত্তি।
তাই সংবাদ সম্মেলন শেষে মঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার সময় এক সাংবাদিকের করা কঠিন প্রশ্নের জবাবে চিরাচরিত রসিকতায় মেতে ওঠেন এই বুড়ো গুরু, যা ড্রেসিংরুমের হালকা মেজাজেরই ইঙ্গিত দেয়। এখন দেখার বিষয়, ড্রেসিংরুমের এই আত্মবিশ্বাস আর ট্যাকটিক্যাল রদবদল হাইতির বিরুদ্ধে মাঠে কতটা আগুন ঝরাতে পারে!
