ব্রাজিল বনাম হাইতির ম্যাচকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে যখন পারদ চড়ছে, তখন ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর রাস্তায় বইছে সমর্থকদের ক্ষোভের ঝড়। মরক্কোর সাথে প্রথম ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করে হেক্সা মিশনের শুরুতেই হোঁচট খাওয়া সেলেসাওদের খেলা দেখে চরম হতাশ দেশের ফুটবলপ্রেমীরা।
শনিবার সকালে বাঁচা-মরার লড়াইয়ের আগে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ‘ও গ্লোবো’ রিও’র রাস্তায় নেমেছিল তাদের বিশেষ ‘ভালো খেলেছে নাকি খারাপ’ পোলিং টুল নিয়ে। আর তাতেই বেরিয়ে এসেছে এক নগ্ন সত্য। সমর্থকদের কাঠগড়ায় মূলত তিন তারকা, ক্যাসেমিরো, রাফিনহা এবং ইগর থিয়াগো। বিপরীতে পুরো দেশ এখন একযোগে দাবি তুলছে ১৭ বছরের বিস্ময় বালক এনড্রিককে শুরুর একাদশে নামানোর।

রিও’র রাস্তায় ২০ বছর বয়সী ছাত্র নাথান সান্তোস ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, অনুশীলনে এনড্রিককে যখন কড়া ট্যাকল করেছিল, তখন তো ক্যাসেমিরোকে বাঘের মতো লেগেছিল! কিন্তু আসল ম্যাচে ও তো শুধুই বিড়াল ছানা! মরক্কোর ব্রাহিম দিয়াজ যেভাবে মাঝমাঠে ফাঁকা জায়গা পেয়ে পাস বাড়াল, ক্যাসেমিরোর সেখানে থাকা উচিত ছিল। ওর জায়গায় ফ্যাবিনহোকে নামানোই এখন সেরা সমাধান।

নাথানের বন্ধু ২১ বছর বয়সী জোয়াও কান্দিদোর রাগ তো আরও চড়া, ক্যাসেমিরো এখন একটা ক্লান্ত, বুড়ো খেলোয়াড়। আক্রমণ করতে গিয়ে ও যখন বলটা হারাল, ক্যামেরায় দেখলাম মরক্কোর কাউন্টার-অ্যাটাকের গতির সাথে ও দৌড়ে কুলাতেই পারছিল না; টিভির স্ক্রিন থেকেই ও গায়েব হয়ে গেল! ও অত্যন্ত বাজে খেলেছে। ও গ্লোবোর অনলাইন পোলে ক্যাসেমিরোর পক্ষে পড়েছে রেকর্ড ৯৭ শতাংশ নেতিবাচক ভোট!

মরক্কো ম্যাচের পরিসংখ্যান বলছে, বার্সেলোনা উইঙ্গার রাফিনহা মাঠে ব্রাজিলের হয়ে সবচেয়ে বেশি দৌড়েছেন। কিন্তু সেই দৌড়াদৌড়ি সমর্থকদের মন ভরাতে পারেনি। ৫৩ বছর বয়সী প্রবীণ সমর্থক ওয়াল্টার সোয়ারেস বলেন, জাতীয় দলের জার্সিতে রাফিনহা বড্ড দুর্বল, ও নিজের প্রতিভার কিছুই দেখাতে পারছে না। আরেক সমর্থক ব্রুনো তেইশেইরা গ্লোবোর পোলে রাফিনহার অবস্থা দেখে তাজ্জব বনে গেছেন। অনলাইন পোলে ৯০ শতাংশ সমর্থক রাফিনহার পারফরম্যান্সকে ‘বাজে’ বলে রেটিং দিয়েছেন। ব্রুনোর কথায়, সবাই রাফিনহার বিপক্ষে ভোট দিয়েছে, আর আমার চোখে ওই ছিল মাঠের সবচেয়ে নিকৃষ্ট খেলোয়াড়।

ব্রেন্টফোর্ড স্ট্রাইকার ইগর থিয়াগোর কপালেও জুটেছে ৯০ শতাংশ নেতিবাচক রেটিং। ৩০ বছর বয়সী ব্রুনো ফ্রেইতাস সরাসরি আক্রমণ করে বলেন, ইগর থিয়াগো ছিল এককথায় ভয়াবহ। ও শুধু পেনাল্টি থেকেই গোল করতে পারে। ওকে এখনই বেঞ্চে বসিয়ে এনড্রিককে নামানো উচিত।
তবে ৬০ বছর বয়সী হকার হোসে লুইজ কিছুটা নরম সুরে থিয়াগোর পাশে দাঁড়িয়েছেন, সেন্টার ফরোয়ার্ড বদলানো দরকার ঠিকই, কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে এটা বিশ্বকাপে ওর ডেবিউ ম্যাচ ছিল। প্রথম ম্যাচে যে কেউ নার্ভাস হতে পারে, আমি ওর সেই নার্ভাসনেসকে সম্মান করি।
রিও’র রাস্তায় ঘুরে আরেকটি যে নামটি সবচেয়ে বেশি শোনা গেছে, তা হলো দলের প্রাণভোমরা নেইমার জুনিয়র। ৩৮ বছর বয়সী পেড্রো বার্সেলোসের মতে, ব্রাজিল দল হিসেবে খারাপ খেলছে। মাঝমাঠ বড্ড ছড়ানো, কোনো সংযোগ নেই। এই মুহূর্তে আমাদের নেইমারের মতো একজন সৃজনশীল খেলোয়াড় দরকার, যে একা সুযোগ তৈরি করতে পারে। ও ছাড়া আর কোনো আশা দেখছি না।

ক্লডিয়া সামিকো নামের এক নারী সমর্থকও আকুতি জানিয়ে বলেন, আমাদের মাঠে নেইমারকে বড্ড প্রয়োজন। রাফিনহা খুবই বাজে খেলছে, নেইমার ফিরলে দলের চেহারা বদলে যেত।
তবে রিও’র সমর্থকদের এই নেইমার-হাহাকার শুধু এক অলীক মরীচিকা হয়েই থাকছে। কারণ চোটের কারণে হাইতির বিপক্ষে নেইমারের মাঠে না থাকাটা এখন শতভাগ নিশ্চিত। নেইমারহীন এই ছন্নছাড়া ব্রাজিলকে ছন্দে ফেরাতে আনচেলত্তি শেষ পর্যন্ত এনড্রিকেরুণ বারুদ মাঠে নামান কিনা, নাকি ক্যাসেমিরো-রাফিনহাদের ওপরেই অন্ধ ভরসা রাখেন, তা দেখার জন্য এখন চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন রিও-র কোটি কোটি ফুটবল ভক্ত!
