বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে হলে ইংল্যান্ডকে আজ শুধু প্রতিপক্ষের ফর্মেরই মুখোমুখি হতে হবে না, বরং লড়তে হবে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা, বৈরী আবহাওয়া এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার ফুট উচ্চতার এক কঠিন ভৌগোলিক মরণফাঁদের বিরুদ্ধে।

সোমবার ভোরে, মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজটেকা স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের অন্যতম সহ-আয়োজক মেক্সিকোর মুখোমুখি হতে যাচ্ছে থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাত হাজার ফুটেরও বেশি উঁচুতে অবস্থিত এই এজতেকা স্টেডিয়াম মূলত স্বাগতিকদের জন্য এক দুর্ভেদ্য দুর্গ; যেখানে ৮৯টি ম্যাচ খেলে মেক্সিকোর জয়ের রেকর্ড ৭০টি, ড্র ১৭টি আর হার মাত্র দুটি!
এত উঁচুতে খেলার প্রধান সমস্যা হলো বাতাস পাতলা হয়ে যাওয়া, যার কারণে খেলোয়াড়দের রক্তে অক্সিজেন শোষণের ক্ষমতা কমে যায়। লিডস বেকেট ইউনিভার্সিটির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ডক্টর বার্নি ওয়েনরাইট বিবিসিকে জানিয়েছেন, এই উচ্চতায় খেলোয়াড়দের অ্যারোবিক ক্ষমতা প্রায় ১০ ভাগ কমে যায় এবং ক্লান্তি বা ফ্যাটিগ বাড়ে ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে ফুটবলারদের পেশিতে ল্যাকটেট তৈরি হয়ে দ্রুত ক্লান্তি ভর করবে এবং গতি কমিয়ে দেবে। সবচেয়ে বড় কথা, মস্তিস্কে অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে ম্যাচের কঠিন মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও ব্যাহত হতে পারে।

এখানেই শেষ নয়, মেক্সিকান সমর্থকরা ম্যাচের আগেই মাঠের বাইরে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। শেষ বত্রিশের ম্যাচে ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগে শত শত মেক্সিকান সমর্থক প্রতিপক্ষের হোটেলের সামনে গভীর রাতে আতশবাজি ফুটিয়ে ঘুম হারাম করে দিয়েছিল। থ্রি লায়ন্সরা এবার নিজেদের হোটেলের ঠিকানা গোপন রাখতে চাইলেও তা ফাঁস হয়ে গেছে, যা টুখেল বাহিনীর জন্য নতুন দুশ্চিন্তার কারণ। এর সাথে যোগ হয়েছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ম্যাচের সময় প্রচণ্ড বজ্রপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

ইংল্যান্ড যদি দুর্দান্ত ফর্মে থাকত, তবে হয়তো এই প্রতিকূলতাগুলো গায়ে লাগতো না। কিন্তু প্রথম ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে উড়িয়ে দেওয়ার পর ঘানার সাথে গোলশূন্য ড্র এবং পানামা ও ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে জোড়াতালি দেওয়া জয়ে টুখেলের দলকে বেশ দিশাহীন দেখিয়েছে। হ্যামস্ট্রিং চোট সত্ত্বেও মিডফিল্ডে ডেক্লান রাইসের খেলার সম্ভাবনা রয়েছে এবং রাইট-ব্যাকে রিছ জেমসের অনুপস্থিতিতে জেড স্পেন্সই ভরসা। আক্রমণে অবশ্য বুকায়ো সাকা ও অ্যান্থনি গর্ডনকে দলে ফেরাতে পারেন কোচ।
বিপরীতে হাভিয়ের আগুইরের মেক্সিকো দল যেন আকাশে উড়ছে। চার ম্যাচের সব কটিতে জিতে তারা এখনও টুর্নামেন্টে কোনো গোল হজম করেনি। স্ট্রাইকার রাউল জিমেনেস হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, আমরা পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ। ভাস্কো (আগুইরে) দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দল এক পরিবারের মতো খেলছে। আমাদের সামনে আকাশটাই সীমানা।

ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলালে ইংল্যান্ডের গায়ে কাঁটা দিতে বাধ্য। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে দিয়েগো মারাদোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের পর এই প্রথম আজটেকা স্টেডিয়ামে খেলতে নামছে ইংল্যান্ড। আর মেক্সিকো আজ পর্যন্ত এজতেকায় কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচ হারেনি (১০ ম্যাচে ৮ জয়, ২ ড্র)।
আর্জেন্টাইন সাময়িতী ওলে’র প্রেডিকশন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়ে অতিরিক্ত সময় বা টাইব্রেকারে গড়াতে পারে। সব প্রতিকূলতা জয় করে থ্রি লায়ন্সরা কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে পারে নাকি মেক্সিকান রূপকথার জন্ম হবে, ভোরে আজটেকাতেই মিলবে তার উত্তর!
