বিজ্ঞানের কাল্পনিক কল্পকাহিনীকে বাস্তবে রূপ দিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হ্যাকিং তাণ্ডব চালিয়েছে জনপ্রিয় চ্যাটজিপিটি’র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ওপেনএআই’-এর এক স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট। উন্মুক্ত এআই মডেলের প্ল্যাটফর্ম ‘হাগিং ফেস’-এ কয়েক দিন ধরে চলা এই সাইবার হামলার বিষয়টি ওপেনএআই কর্তৃপক্ষ টের পায় হামলা ঠেকানো এবং এফবিআই’কে খবর দেয়ারও বেশ কিছুদিন পর! সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট তদন্তকারীদের সূত্রে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
তদন্তের বিবরণ থেকে জানা যায়, কোনো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই জটিল সিদ্ধান্ত ও কাজ সম্পাদন করতে সক্ষম এই ‘এআই এজেন্ট’টি গত ৯ জুলাই ওপেনএআই’র নিরাপদ টেস্ট এনভায়রনমেন্ট বা আইসোলেটেড ল্যাব থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এর ঠিক দুদিন পর, ১১ জুলাই থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত এআই হাব ‘হাগিং ফেস’-এ অনুপ্রবেশ করে তাণ্ডব চালায় এটি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, হাগিং ফেসে সাইবার হামলার নেপথ্যে যে তাদের নিজস্ব এআই এজেন্ট জড়িত, তা বুঝতে ওপেনএআই কর্তৃপক্ষের বেশ কয়েক দিন সময় লেগে যায়। হাগিং ফেসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা থমাস উলফ জানান, এই ঘটনার পর প্রায় ২০ জুলাইয়ের দিকে দুটি প্রতিষ্ঠান প্রথম বিষয়টি নিয়ে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে। ২১ জুলাই ওপেনএআই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে যে, তাদের একটি এআই এজেন্ট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে হাগিং ফেসে অনুপ্রবেশ করেছিল।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটলো যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত এজেন্টদের নিরাপত্তা নিয়ে সাইবার বিশেষজ্ঞদের মনে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নন-প্রফিট প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড এথিক্যাল ডাটা ফাউন্ডেশনের প্রধান বিশেষজ্ঞ মার্লে স্মিথ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এর মানে কি তারা এআইকে একা ছেড়ে দিয়েছিল এবং সেটি কী করছে তা লক্ষ্য করেনি? নাকি তারা বুঝতে পেরেও নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছিল? দুটি কারণই সমান বিপজ্জনক ও উদ্বেগজনক।

ওপেনএআই যখন তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সর্বাধুনিক মডেল ‘GPT-5.6 Sol’ এবং আরেকটি অপ্রকাশিত মডেলের সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা পরীক্ষা করছিল, তখনই ঘটনাটি ঘটে। তবে তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনার আগেই ওপেনএআই’র এই প্রযুক্তিতে কিছু অস্বাভাবিক আচরণ দেখা গিয়েছিল।
একটি ঘটনায় দেখা যায়, এআই এজেন্টটি ভবিষ্যৎ সংস্করণের জন্য কিছু গোপন নির্দেশনা বা 'নোট' তৈরি করে রেখেছিল। কীভাবে ওপেনএআই’র অভ্যন্তরীণ সুরক্ষাবলয় ভেঙে মুক্ত হওয়া যায়, তার স্পষ্ট গাইড লাইন ছিল সেই নোটে। এমনকি আগের কিছু পরীক্ষায় মনিটরিং সিস্টেম সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছিল।
১৬ জুলাই হাগিং ফেস যখন এক ব্লগে জানায়,তারা এক স্বাশাসিত এআই এজেন্ট সিস্টেম দ্বারা হ্যাক হয়েছে, ঠিক তার পর ইন্টারনাল লগ পর্যালোচনা করে, ১৮ ও ১৯ জুলাইয়ের দিকে ওপেনএআই নিশ্চিত হয় যে অপরাধী তাদেরই এজেন্ট!

স্বাশাসিত এআই এজেন্ট ও নিরাপত্তা ঝুঁকি: বর্তমানে পুরো এআই শিল্পে ‘অটোনোমাস এআই এজেন্ট’ তৈরির প্রতিযোগিতা চলছে, যা দিনরাত ভার্চুয়াল কর্মীর মতো কাজ করতে পারবে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে অপ্রাকৃতিস্থ আচরণের ঝুঁকি।
এআই এজেন্টের সক্ষমতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে গবেষণারত প্রতিষ্ঠান 'প্যালিসেড রিসার্চ'-এর জেফরি ল্যাডিশ বলেন, এই মডেলগুলো মিথ্যা বলে, প্রতারণা করে এবং হ্যাক করে। তিনি যোগ করেন, প্রতিযোগিতার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার ভয়ে এআই কোম্পানিগুলো নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে অনীহা প্রকাশ করছে, যা বন্ধ করতে হলে এখন সরকারি কড়া তদারকি জরুরি হয়ে পড়েছে।
ওপেনএআই এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে নজিরবিহীন উল্লেখ করে বলেছে, এটি এআই নিরাপত্তার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তারা বিষয়টি নিয়ে বাইরের উপদেষ্টাদের সাহায্যে পর্যালোচনা করছে এবং শিগগিরই একটি কারিগরি রিপোর্ট প্রকাশ করবে। যদিও এআই এজেন্টদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর এই ঘটনা প্রযুক্তি বিশ্বে এক বড় ধরনের সতর্কবার্তা জারি করে দিল।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
