স্বামী যখন সংসারের প্রতি নজর দিচ্ছেন না, ঠিক তখন তিন সন্তানকে নিয়ে আলাদা হন গৃহবধূ মাহিনুর বেগম। ১০ বছর আগে স্বামীর সংসারে নানা বঞ্চনার শিকার হয়ে টিকতে পারছিলেন না। স্বামীকে ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হন তিনি। এখন কে টানবে চারজন মানুষের সংসার?
কিন্তু থেমে যায়নি পরিবারের গল্পটা। এই গল্পকে বহুদূর টেনে নিয়ে গেছেন মাহিনুর বেগম। সংসারের এই করুণ পরিণতিতে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও দমে যাননি তিনি। হুট করেই ভাবলেন অন্তত একটা কাজ তিনি বেশ ভালো পারেন, যেটার সাহায্যে উপার্জন সম্ভব। জমানো কিছু টাকায় কিনে ফেললেন একটি সেলাই মেশিন। চিন্তা ছিল একটাই, সংসারটা বাঁচাতে হবে।
ধীরে ধীরে কাজ পাওয়া শুরু করলেন মাহিনুর বেগম। কাজের পরিমাণ যখন বাড়তে থাকলো, একা কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না তিনি। তারপরের গল্পটা শুধুই এগিয়ে যাওয়ার। একে একে এখন ২৫ টি সেলাই মেশিনের মালিক এক সময়ের অসহায় সেই গৃহবধূ।
তারপর আর ঘুরে তাকাতে হয়নি মাহিনুর বেগমের। পরিবারের দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে শুরু করা সাভারের গেন্ডার আর এ এম ফ্যাশনের বর্তমান সদস্য সংখ্যা আজ প্রায় ত্রিশ জন। এরা সবাই আজ স্বাবলম্বী। বড় বড় পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানের পোশাক তৈরির অর্ডারের কাজ করে দেন তারা।
আরও পড়ুন: নিত্যপণ্যের দাম একটার কমলে আরেকটার বাড়ে
বিপদকে শক্ত হাতে মোকাবেলা করে মাহিনুর বেগম শুধু নিজেই ঘুরে দাঁড়াননি, বরং তার সংগ্রামী স্বত্ত্বার আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন ত্রিশজনেরও অধিক প্রাণে।
ছোট পোশাক কারখানা হলেও মাহিনুর বেগম তাঁর কর্মীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি, ভাতা, বিশ্রাম, নামাজের জায়গা, শিশুদের দুগ্ধপান করার ব্যবস্থা করেছেন। ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান নয়, যেন একটি পরিবার তৈরি করেছেন মাহিনুর বেগম। ভাড়া বাড়িতে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই কর্মী ছাটাই না করে ঠিকমতো বেতন-ভাতা দিয়ে যাচ্ছেন এই ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা। এতে খুশি আর এ এম ফ্যাশনের নারী শ্রমিকরা।
মাহিনুর বেগমের পাশে ছিলেন তার সন্তানরা। মাকে সহায়তা করে তারাও আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে মায়ের প্রতিষ্ঠানেই কাজ করছেন তারা। সুবিধাবঞ্চিত নারীদের সুযোগ তৈরিতে নিভৃতে তাদের মায়ের ইতিবাচক কাজ ছড়িয়ে যাক আরো মায়ের প্রাণে, এমনটাই বললেন তারা।
করোনা মহামারিতে মাহিনুর বেগম হারিয়েছেন প্রায় ৩০ লাখ টাকার পুঁজি। তারপরও আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি। আবার চেষ্টা করছেন নতুন এক সাফল্যের গল্প লেখার।
একাত্তর/টিএ
