পশ্চিমা দেশগুলোর প্রবল নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে রাশিয়ার মুদ্রা রুবল বেশ নাটকীয়ভাবে শক্তি ফিরে পেয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে যে অবস্থায় ছিল, এখন তার চেয়েও শক্তিশালী হয়েছে রুবল।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্যবসা ও অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ শুক্রবার (২০ মে) তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, রুবল গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে।
ইউক্রেনে আক্রমণ শুরুর করার পরপরই ইউরোপ এবং আমেরিকা মিলে রাশিয়ার উপর নানা ধরণের অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা দিতে শুরু করে।
এর জেরে রুবলের মান বেশ দ্রুত কমে যেতে থাকে। অনেকেই ধারণা করছিলেন রাশিয়ার মুদ্রা রুবল হয়তো দ্রুত মূল্যহীন হয়ে পড়বে।
এমনকি সংকট সামাল দিতে টানা দুই সপ্তাহ শেয়ার বাজার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় মস্কো। কেননা শেয়ার বাজার খুললেই রুবলের দাম নিচের দিকে নামতো।
কিন্তু মার্চ মাসের শেষের দিক থেকে রুবল আবারো ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। এর পেছনে অনেকে নানা কারণ বিশ্লেষণ করছেন। মুদ্রাটি যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, সেটি অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হয়ে হয়েছে।
তবে অনেকের মতেই রুবল ঘুরে দাঁড়ানোর মূল কারণ হচ্ছে রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানী। অর্থাৎ গ্যাস ও তেল রপ্তানি।
রাশিয়ার কাছ থেকে ইউরোপের দেশগুলো যে গ্যাস ও তেল ক্রয় করে সেটির মূল্য পরিশোধ করা হতো ইউরোতে। রাশিয়ার সাথে এটাই ছিল তাদের চুক্তি।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর, জ্বালানির মূল্য রুবলে পরিশোধ করার শর্ত দেয় রাশিয়া। এর ফলে রুবল ব্যবহার করে তেল ও গ্যাস কিনতে বাধ্য হয় অনেক ইউরোপীয় দেশ।
তাছাড়া চীন এবং ভারতের কাছে জ্বালানী বিক্রির মাধ্যমে রাশিয়ায় বৈদেশিক মুদ্রাও আসছে। এই দুটিকেই রুবলের শক্তি ফিরে পাওয়ার মূল কারণ হিসেবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাশিয়ার সেন্ট পিটাসবার্গ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক তাতিয়ানা রোমানোভা বিবিসিকে বলেন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার তেল-গ্যাস রপ্তানির পরিমাণ কমেছে একথা ঠিক। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় রাশিয়া সেটি পুষিয়ে নিচ্ছে।
তিনি বলেন, রাশিয়ার উপর নানা ধরণের নিষেধাজ্ঞা দেবার কারণে দেশটি অনেক জিনিস আমদানি করতে পারছে না এবং রাশিয়ার মানুষ আগের মতো বিদেশে যেতে পারছে না। ফলে তাদের ডলার ও ইউরোর চাহিদা কমে গেছে।
অন্যদিকে তেল-গ্যাস বিক্রি বাবদ অর্থ রুবলে কনভার্ট করে নেয়ায় রাশিয়ার মুদ্রার চাহিদা বেড়েছে। ফলে আমেরিকান ডলারের বিপরীতে রুবল শক্তি ফিরে পেয়েছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক তাতিয়ানা রোমানোভা।
এছাড়াও রুবলের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে রাশিয়ার সরকার দেশের ভেতরে আরো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।
প্রথমত, অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী রাশিয়ায় কর্পোরেট শেয়ার এবং সরকারি বন্ড ক্রয় করেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পরে তারা সেগুলো বিক্রি করে দিতে চাইবে সেটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু তারা যাতে সেটি করতে না পারে সে পদক্ষেপ নিয়েছে পুতিন সরকার। এর ফলে একদিকে যেমন রাশিয়ার স্টক ও বন্ড মার্কেটের পতন ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে, অন্যদিকে মুদ্রা দেশের বাইরে যেতে পারেনি।
দ্বিতীয়ত, ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার দ্বিগুণ বাড়িয়েছে।
তৃতীয়ত, যারা রুবল বিক্রি করে ডলার বা ইউরো কিনবেন না, অর্থাৎ রুবল সঞ্চয় করবেন, তাদের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে।
চতুর্থত, বিদেশি কোম্পানিগুলোর সাথে রাশিয়ার অনেক কোম্পানির ব্যবসায় আয়কৃত ডলার, ইউরো এবং ইয়েনের ৮০ শতাংশ রুবলে কনভার্ট করে নিতে হবে।
আরও পড়ুন: অস্ট্রেলিয়ায় এক দশক পর লেবার পার্টি ক্ষমতায়
এসব পদক্ষেপ রুবলের দরপতন ঠেকাতে সাহায্য করেছে।
এদিকে, বর্তমানে এক মার্কিন ডলার সমান ৬২ রুবল। বিশ্লেষকরা বলছেন, রুবল যেভাবে শক্তিশালী হচ্ছে তাতে এক ডলার সমান ৫০ রুবল হয়ে যেতে পারে।
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবশ্য চায় না যে রুবল বেশি শক্তিশালী হোক। কারণ, রুবল বেশি শক্তিশালী হলে তেল-গ্যাস রপ্তানি বাবদ রাশিয়ার আয় কমে যাবে।
তবে রুবল শক্তিশালী হওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক নয় এবং এটি কতটা দীর্ঘমেয়াদি হবে তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। বাজারে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এটি করা হয়েছে বলে ডলারের বিপরীতে রুবলের বিনিময়মূল্য খুব একটা বাস্তবসম্মত নয়।
একাত্তর/এসজে
