এক না এক সময় সেভেরোদোনেৎস্কের পতন অবশ্যম্ভাবী হলেও, ইউক্রেনের জন্য এই শহরের নিয়ন্ত্রণ হারানোর যন্ত্রণা মোটেও কম নয়।
কয়েক সপ্তাহ ধরে রাশিয়ান আক্রমণের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল সেভেরোদোনেৎস্ক। আর্টিলারি শেল ও বিমান হামলার আঘাতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে পুরো শহর।
শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনীয় কমান্ডাররা স্বীকার করেই নিয়েছেন, এই ধংসস্তুপকে আগলে ধরে রাখতে গেলে অনেককে প্রাণ হারাতে হবে।
শনিবার (২৫ জুন) রাশিয়া সেভেরোদোনেৎস্ক দখলে নেয়ার খবর নিশ্চিত করার পর এক বক্তৃতায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, 'নৈতিকভাবে ও মানসিকভাবে' এটি তার দেশের জন্য একটি কঠিন দিন ছিল।
লুহানস্ক অঞ্চলের এই অন্যতম শহরের নিয়ন্ত্রণ দখল করা রাশিয়ার অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্যকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে এসেছে। পুরো ইউক্রেনকে দখল করে নেয়ার উদ্দেশ্যে ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে মস্কো বৃহত্তর ডনবাস অঞ্চল দখলের দিকেই পূর্ণ মনোনিবেশ করে আসছে।
দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক নিয়ে গঠিত ডনবাসের যেকোনো একটিকে দখল করতে পারলেই পুতিন তার দেশের জনগণের সামনে সত্যিকারের একটি অর্জন উপস্থাপন করতে পারবেন। অভিযানের শুরুর দিককার ব্যর্থতা ভুলিয়ে দিতে যেটি তার জন্য খুবই জরুরি।
তবে সম্পূর্ণ লুহানস্ক নিয়ে নেয়ার সম্ভাবনা বাড়তে থাকলেও, তা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। রাশিয়ার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে লিসিচানস্ক শহর, যা এখনও পুরোপুরি ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে।
সেভেরোদোনেৎস্ক থেকে সরে যাওয়ার পর ইউক্রেনীয় সেনারা এই লিসিচানস্কেই আশ্রয় নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে লিসিচানস্ক কেনো গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝতে হলে এই অঞ্চলের ভৌগলিক অবস্থান ও যুদ্ধে এখন পর্যন্ত এই ভূমিকা বুঝতে হবে।

সেভেরোদোনেৎস্ক ও লিসিচানস্ক শহর সিভেরস্কি দোনেৎস নদীর পাড়ে অবস্থিত। ডনবাস অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই নদীর পাড়ে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ করতে হয়েছে রাশিয়াকে। এক মাস আগে এই নদী পার হতে গিয়েই তাদেরকে হারাতে হয়েছে পুরো একটি ব্যাটালিয়ন।
সেভেরোদোনেৎস্ক ও লিসিচানস্ক শহরের মধ্যে সব সেতু ধ্বংস করে ফেলায় রাশিয়ানদের অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর ওপর লিসিচানস্ক পাহাড়ের ওপর অবস্থিত হওয়ায়, লুহানস্কে শেষ ইউক্রেনীয় দুর্গ দখল করা আক্ষরিক অর্থেই পাহাড় জয় করার সমান হবে রাশিয়ার জন্য।

ইন্সটিটিউট ফর দ্যা স্টাডি অব ওয়ার-এর ২৪ জুনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লিসিচানস্কে ইউক্রেনীয় সেনারা উঁচু জায়গায় অবস্থা নেবেন, যা তাদেরকে আরও কিছু সময়ের জন্য রাশিয়ান আক্রমণ প্রতিহত করতে সহায়তা করবে, যদি না রাশিয়া তাদেরকে ঘিরে ফেলে।
তবে রাশিয়া সেটাই করছে বলে এখন পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে। দক্ষিণ দিক থেকে ইউক্রেনীয় সেনাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে তারা।
রাশিয়া সমর্থিত বিচ্ছিনতাবাদী যোদ্ধাদের দাবি, লিসিচানস্ক ও সেভেরোদোনেৎস্ককে রক্ষা করার সব ইউক্রেনীয় চেষ্টা 'অর্থহীন ও ব্যর্থ'।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই মুহূর্তে রাশিয়ার শেষ লক্ষ্য কী? তারা কি ডনবাস দখল করে ইউক্রেনকে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য করার মাধ্যমে লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক অঞ্চল দখল করতে চায়?
রাশিয়ান বাহিনী যদি ক্লান্ত হয়ে পড়ে থাকে তাহলে সেটা হওয়া সম্ভব, যেমনটা মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এটিকে রাশিয়ায় 'সাফল্য' বলে চালানো যাবে এই বলে যে, রাশিয়ার 'বিশেষ সামরিক অভিযান' ডনবাসকে 'স্বাধীন' করেছে।
ইউক্রেন চাপের মুখে পড়ে শান্তি ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এটি মেনে নেবে বলে রাশিয়া আশা করছে। তবে সেটি হওয়ার সম্ভাবনাও কম।
তবে পুতিনের অন্য লক্ষ্য হতে পারে তিনি যা শুরু করেছেন সেটি শেষ করার মাধ্যমে পুরো দক্ষিণাঞ্চল দখল করে নেয়া এবং কিয়েভের দখলের উদ্দেশ্যে আবারও হামলা চালানো।
এসব প্রশ্নের উত্তর একমাত্র একজন ব্যক্তিই জানেন, আর তিনি হলেন পুতিন। তবে সরাসরি নিজের পরিকল্পনা জানান না দিলেও, তার বক্তব্য থেকে সে বিষয়ে আঁচ করা যায়।
আরও পড়ুন: চীনকে টেক্কা দিতে ছয়শ' বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে জি৭
জুনের শুরুর দিকে এক বক্তৃতায় নিজেকে পিটার দ্যা গ্রেটের সাথে তুলনা করে পুতিন তার ইউক্রেন অভিযানকে পিটারের সম্প্রসারণবাদী যুদ্ধের সাথে তুলনা করেন। এর মাধ্যমে এক প্রকার তিনি স্বীকারই করে নিলেন যে, ভূমি দখলই তার এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।
যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়া কিছু গুরুতর ভুল করে বসে। ইউক্রেনের জনগণ যে সহজে অস্ত্রের কাছে নতি স্বীকার করবে না তা রাশিয়া ভাবতে পারেনি। তবে ডনবাসে দখলের নিরন্তর প্রচেষ্টা থেকেই বোঝা যায়, নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে রাশিয়া, আর একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করতে সতর্ক তারা।
একাত্তর/এসজে
