ইউক্রেন যুদ্ধে সহায়তা করলে পশ্চিমাদের বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটে হামলার হুমকি দিয়েছেন রাশিয়ার এক শীর্ষ কর্মকর্তা। তার এ হুমকির পর মহাকাশে পরিভ্রমণরত বস্তুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে মহাকাশ বিষয়ক আইনজীবী ও এই ক্ষেত্রে কর্মরতদের মধ্যে।
বৃহস্পতিবার (২৭ অক্টোবর) জাতিসংঘকে উদ্দেশ্য করে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কন্সটান্টিন ভরনৎসভ বলেন, মহাকাশে আধা-সামরিক অবকাঠামো প্রতিশোধমূলক আক্রমণের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধে পশ্চিমা বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট দিয়ে সাহায্য করাকে 'অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা' বলে আখ্যা দেন তিনি।
পৃথিবীর ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনও দেশ অন্য দেশের স্যাটেলাইটে হামলা চালায়নি। ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে এ ধরণের পদক্ষেপ রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মিসিসিপি ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ল'র এয়ার এন্ড স্পেস ল' প্রোগ্রামের সহ-পরিচালক মিশেল হ্যানলন বলেন, 'এই হুমকি আমাদেরকে অভূতপূর্ব এক অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে। এরকম যে হতে পারে সে সম্ভাবনা আগে থেকেই ছিল, তবে এটি করার কথা এর আগে কেউ প্রকাশ্য বলেনি'।
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের জন্য ইলন মাস্কের স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে ইউক্রেন। এছাড়াও মহাকাশ থেকে যুদ্ধের ছবি তোলে মার্কিন স্যাটেলাইট প্রতিষ্ঠান ম্যাক্সার। আর ইউক্রেনে যোগাযোগের হাজার হাজার যন্ত্র নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের ইরিডিয়াম স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের ওপর।
ইরিডিয়ামের প্রধান নির্বাহী ম্যাট ডেশ রয়টার্সকে বলেন, 'যেকোনো কারণেই মহাকাশে কোনও কিছুর ওপর হামলার কথা বলা খুবই দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ। মহাকাশ খুবই নোংরা ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
স্যাটেলাইটের ওপর হামলা করা হলে মহাকাশ ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এ ব্যাপারে ইলন মাস্ক ও স্পেসএক্সের মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও কোনও জবাব পাওয়া যায়নি। এই মাসের শুরুতে ইউক্রেনে স্যাটেলাইট সেবা বন্ধের কথা বলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেন মাস্ক। পরে অবশ্য সে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন তিনি।
হ্যানলন বলেন, সশস্ত্র সংঘর্ষের নিয়ম অনুযায়ী, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্যাটেলাইটে হামলা করলে সেটিকে যুদ্ধের আহবান হিসেবে বিবেচনা করে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র জন কিরবি বলেন, মার্কিন অবকাঠামোর ওপর যেকোনো হামলার উপযুক্ত জবাব দেয়া হবে। তবে এ নিয়ে বিস্তারিত কোনও মন্তব্য করেননি তিনি।
সিকিউর ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশনের স্পেস পলিসি অ্যানালিস্ট ব্রায়ান উইডেন বলেন, এসবকিছুর আইনি ব্যাপারস্যাপার এই মুহূর্তে অনেকটাই অস্পষ্ট। যুদ্ধের সময় স্যাটেলাইটে হামলার ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি- শুরু করার মতো কিছু নেই আসলে।
জটিল ক্যালকুলাস
আইনজীবীদের মতে, রাশিয়া স্যাটেলাইটে হামলা করলে সেটি ১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তির লঙ্ঘন হবে কিনা সেটি বিতর্কিত বিষয়। ১৯৭২ সালের লায়াবিলিটি কনভেনশন অনুযায়ী, মহাকাশে কোনও দেশ কর্তৃক ক্ষয়ক্ষতি হলে তাদেরকে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই কনভেশনে সই করেছে রাশিয়াও।
গত বছর মহাকাশে নিজেদের একটি পুরনো স্যাটেলাইটে মিসাইল হামলা করে সেটিকে বিধ্বংস করে দেয় রাশিয়া। ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট হ্যাক ও জ্যামিংয়ের চেষ্টা করার অভিযোগ রয়েছে।
মহাকাশে বিপজ্জনক ধ্বংসস্তূপ সৃষ্টি করার জন্য স্যাটেলাইট বিধ্বংসী মিসাইলের বিরোধিতা করে আসছে পশ্চিমা বিশ্ব ও নভোচারীরা। গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ অবকাঠামো যেমন মানুষ বহনকারী স্পেস স্টেশন ও জিপিএস নেটওয়ার্কের জন্য বিপজ্জনক এসব ধ্বংসস্তূপ।
স্যাটেলাইট বিধ্বংসী মিসাইলের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ চালানো অনান্য দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত। এর মধ্যে সর্বশেষ পরীক্ষাটি চালায় যুক্তরাষ্ট্র, ২০০৮ সালে।
ভরনৎসভ নির্দিষ্টভাবে কোনও প্রতিষ্ঠানের নাম উচ্চারণ না করলেও, স্পেসএক্সকে রাশিয়া টার্গেট করে আসছে বলে দাবি করেছেন মাস্ক। রাশিয়া ইউক্রেনে স্টারলিংক স্যাটেলাইটের নেটওয়ার্ক জ্যামিংয়ের চেষ্টা করে আসছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্টারলিংকের মতো পরস্পর সংযুক্ত হাজার হাজার স্যাটেলাইট দিয়ে তৈরি নেটওয়ার্কের প্রশংসা করে আসছে মার্কিন সেনাবাহিনী। কেননা এক অংশে হামলা করা হলেও, এর পুরোটিকে একসাথে অকার্যকর করে দেয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
মার্কিন মহাকাশ বাহিনীর স্ট্র্যাটেজি এন্ড অপারেশন্সের উপ-প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফিলিপ গ্যারান্ট বলেন, এই ব্যাপারটি শত্রুর জন্য ক্যালকুলাসকে জটিল করে তুলেছে। অনেকগুলো স্যাটেলাইট থাকায়, কোনটিকে টার্গেট করতে হবে তা তারা বুঝতে পারেনা।
আরও পড়ুন: যেভাবে টুইটার চুক্তির অর্থায়ন করলেন ইলন মাস্ক
স্পেসএক্সের স্টারলিংক নেটওয়ার্কে প্রায় তিন হাজার স্যাটেলাইট রয়েছে। এছাড়াও রাশিয়া ও ইউক্রেনে চোখ রাখছে কয়েক ডজন মার্কিন বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট।
তাই 'একটি, দুইটি বা এক ডজন স্যাটেলাইট ধ্বংস করলেও তেমন কিছুই হবে না', বলেন উইডেন।
একাত্তর/এসজে
