একই দিন দেড় কিলোমিটারের ব্যবধানে দুই প্রধান দলের সমাবেশকে ঘিরে রাজনীতিতে উত্তাপ চলছে। রাজনীতির ময়দান ছড়িয়ে সেই উত্তাপ পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও। তবে উত্তাপের চেয়ে নগরবাসীর মধ্যে উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগই বেশি। এরইমধ্যে বদলে যেতে শুরু করেছে নগরের চিরচেনা দৃশ্যপট। চায়ের দোকান থেকে শপিং মল, সবখানেই মানুষের মধ্যে একটাই প্রশ্ন কী হবে ২৮ অক্টোবর।
আর এই উত্তাপের আরেকটা কারণ ২৮ অক্টোবর দিনটি। ২০০৬ সালের এ দিনটি ছিলো দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ভয়াল একদিন। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে দুইপক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে হয়েছিলো ভয়াবহ সংঘর্ষ। ১৭ বছর পর ফের সেই ২৮ অক্টোবরকে ঘিরে মুখোমুখি দুইপক্ষ।
সরকার পতন আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ঢাকা অচল করে দেয়ার ঘোষনা বিএনপি। অন্যদিকে মহাসমাবেশের নামে সন্ত্রাস প্রতিরোধের ঘোষনা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের।
২৮ অক্টোবর সরকার পতনের আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দিতে চাইছে বিএনপি। আর, আওয়ামী লীগ চাইছে আন্দোলনকারীদের সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে। তবে একই দিনে দু'দলের সমাবেশকে নিয়ে জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। রাজধানীর কর্মজীবী মানুষরাও রয়েছেন শঙ্কায়।
রাজধানীর খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা সোহরাব হোসেনের অফিস নতুন বাজার এলাকায়। তার প্রশ্ন শনিবার কী হবে? নিরাপদে বাসা থেকে বের হয়ে ফেরা যাবে তো? একাত্তরকে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো সমাবেশ করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা যেনো সাধারণের ভোগান্তির কারণ না হয়। আমাদের তো অফিসে যেতে হয়। কাজ করতে হয়। আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত কে করবে?’
২৮ অক্টোবর সরকার পতনের এক দফা নিয়ে বিএনপির ঢাকায় মহাসমাবেশের কর্মসূচির সাথে মিলিয়ে জামায়াতসহ কয়েকটি দলও কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকার কথা জানিয়েছে। বিএনপির ঢাকায় বসে পড়া বা আল্টিমেটামের ঘোষণা নতুন নয় বলে বলছেন সরকার দলীয় নেতারা। বিএনপি জামায়াতের এ ঘোষনায় কোনো কৌতূহল নেই বলে মন্তব্য তাদের।

এদিকে, বিএনপি বলছে, আলোচনার সব রাস্তা ক্ষমতাসীন দল বন্ধ করেছে । তারা বলছে, ২০১৪ সালে লোক দেখানো আলাপ সফল হয়নি বরং নির্বাচন একটি তামাশায় পরিনত হয়েছে। সরকার পতনের দাবি আদায়ের ‘এক দফার চূড়ান্ত আন্দোলনের’ অংশ হিসেবে শনিবারের ওই সমাবেশ গত ১৮ অক্টোবর আহবান করা হয়।
সেদিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, শনিবারের মহাসমাবেশ থেকে তাদের মহাযাত্রা শুরু হবে। সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত বিএনপি থেমে থাকব না।
একইদিন বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে শান্তি ও উন্নয়নের সমাবেশ ডেকেছে আওয়ামী লীগ। গত ২০ অক্টোবর সমাবেশের স্থান উল্লেখ করে ডিএমপি কমিশনার বরাবর চিঠি দেন দলের মহানগর দক্ষিণের দপ্তর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন রিয়াজ।
পর দিন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আরেকটি চিঠিতে নয়াপল্টনে জমায়েত হওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে আরেকটি চিঠি দেন ডিএমপি কমিশনারকে। তবে ডিএমপির পক্ষ থেকে কোনো দলকেই তখন সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
সমাবেশের দুই দিন আগে বৃহস্পতিবার জানা যায়, বুধবার দুই দলকেই সড়কের বদলে ময়দানে জমায়েত হওয়ার প্রস্তাব দিয়ে চিঠি দেয় মহানগর পুলিশ। বুধবার ডিএমপির পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়, বিএনপিকে যেখানে অনুমতি দেওয়া হবে সেখানেই সমাবেশ করতে হবে।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই বলছে, তারা সমাবেশের সব প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। এখন অন্য জায়গায় সমাবেশ তারা করতে পারবে না। আওয়ামী লীগ বলছে, বিএনপি কোনো বিশৃঙ্খলা করলে কঠোর হবে তারা। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, সরকার তাদের আন্দোলন দমন করতে চায়।
শনিবার যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়েতে ইসলামী শাপলা চত্বরে সমাবেশ করতে চাইলেও তাদের অনুমতি দেওয়া হবে না বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, গত বছরের ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার পতনের ঘোষণা দিয়েছিলো বিএনপি। আমার মনে হয় আওয়ামী লীগ শুধু নয়, দেশের মানুষের এটা নিয়ে (সমাবেশ) কোতূহল নেই। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মসূচির নাম দিয়ে সরকার পতনের ঘোষণা দিয়ে যদি কোনো সহিংসতা বা নাশকতা করা হয় তাহলে কিন্তু সরকার কঠোর হবে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘বাংলাদেশে নির্বাচন একটা তামাশা হয়ে গেছে। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আগামীকাল আলোচনা করবো। বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, পরশু করবেন। ওই সময় আলোচনা একটা এক্সকিউজ ছিলো।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন বিএনপি নামক দলটি এখন মাহুত ছাড়া পাগলা হাতি। বিএনপিকে বিশ্বাস করা যায় না, মন্তব্য করে জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ১৫ বছরে তারা নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করে ব্যর্থ হয়েছে। দুই কোটি মানুষের এই শহরে রাস্তা বন্ধ করে বসে পড়লে জনজীবন বিপর্যস্ত হবে। তবে দুই দলই তাদের কর্মসূচি বিষয়ে অনড়।
আলোচনায় জামায়াত
২০১৩ সালের পর আলোচনার বাইরে থাকলেও চলতি বছরের ১০ জুন ঢাকায় সমাবেশ করে আবারও আলোচনায় আসে জামায়াত। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির মাঠে বেশ সরব যুদ্ধাপরাধের দাযে অভিযুক্ত দলটি।
চলতি বছরের ১০ জুন সর্বশেষ অনুমতি নিয়ে সমাবেশ করে দলটি এরপরই যতবারই অনুমতি চাওয়া হয়েছে তার একটিরও অনুমতি দেয়নি পুলিশ। ২৮ অক্টোবর শাপলা চত্বরে সমাবেশ করার অনুমতি চায় দলটি। তবে ডিএমপি স্রেফ না করে দিয়েছে। কারণ হিসেবে, তাদের নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন নেই।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, ২৮ অক্টোবর সমাবেশ বাস্তবায়ন করবে দলটি। মতিঝিল জায়গা না পেলেও তার আশপাশে যে কোনো জায়গায় নিজেদের শক্তি জানান দিবে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ ২৮ অক্টোবর শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশে সুশৃঙ্খলভাবে সমবেত হয়ে এক দফা দাবি কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাস্তবায়নের আন্দোলনকে বেগবান করার আহ্বান জানিয়ে এক বিবৃতিতে জানায়, সরকারের কোনো ধরনের উসকানিতে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য নির্বাহী পরিষদ দেশবাসী এবং সংগঠনের সর্বস্তরের জনশক্তির প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।
ডিএমপির কাছে সহযোগিতা চেয়ে যে আবেদন তারা করেছিলো তা নাকচ হওয়ার পর গণমাধ্যমে বার্তা পাঠায় দলটি। বার্তায় জামায়াত জানায়, জামায়াতে ইসলামী সাংবিধানিক অধিকার অনুযায়ী আগামী ২৮ অক্টোবর রাজধানী ঢাকা মহানগরীর শাপলা চত্বরে শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশ বাস্তবায়নে সহায়তা চেয়ে পুলিশ কমিশনারকে লিখিতভাবে জানিয়েছে। পুলিশের দায়িত্ব হলো শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা, বাধা দেওয়া নয়।
বৃহস্পতিবার অজ্ঞাত একটা স্থানে সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ও ছবি পাঠায় দলটি।
তারা বলছে, ২৮ অক্টোবর তারা শাপল চত্বরেই সমাবেশ করবে।
কী করবে বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে থাকা দলগুলো

সরকার পতনের লক্ষ্যে চলমান একদফা আন্দোলনের চূড়ান্ত কর্মসূচি নির্ধারণে ২৩ অক্টোবর গুলশানে বিএনপির নেত্রীর কার্যালয়ে গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে বিএনপি। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন শুরু হয়।
এ আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে রয়েছে ৬-দলীয় জোট গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২-দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, এলডিপি, লেবার পার্টিসহ ৩৬টি দল। বিএপির সঙ্গে থাকা দলগুলো মনে করছে, ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশ-পরবর্তী চূড়ান্ত আন্দোলন একটা পরিণতিতে যাবেই।
বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা গণতন্ত্র মঞ্চও ওইদিন মৎস্যভবন এলাকায় সমাবেশ করবে।
একই দিনে বিজয় নগরে সমাবেশ করবে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
২৮ অক্টোবর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ওইদিন কেউ যেনো কোনো ধরনের গুজব কিংবা জানমালের ক্ষতি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটাতে না পারে, সে ব্যাপারে বিশেষ নজরদারি বাড়িয়েছে পুলিশ। এরই মধ্যে বিভিন্ন আবাসিক হোটেলসহ বিভিন্ন জায়গায় পুলিশি অভিযান চালানো হচ্ছে।
ডিএমপির অপারেশন্স শাখার যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ঢাকা মহানগর পুলিশ মনে করে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ করা সবার গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে কেউ যদি সমাবেশকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি কিংবা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করে তাহলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। সমাবেশকে কেন্দ্র করে সব ধরনের পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে। যখন যে পরিস্থিতি উদ্ভব হবে, তখন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে ডিএমপি।
২৮ অক্টোবরকে ঘিরে সব ধরনের গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে র্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন বলেছেন, ঢাকায় রাজনৈতিক দলগুলোর সমাবেশকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়াবে তারা। যাতে কেউ নাশকতার জন্য আগ্নেয়াস্ত্র বা বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ে সমাবেশে ঢুকতে না পারে, সেজন্য ঢাকা শহরের প্রবেশপথে চেকপোস্ট বসাবে র্যাব। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও চেকপোস্ট বসানো হবে।
