মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের প্রথম সেমিফাইনালে একটি বিষয় নিশ্চিত, সেটি হলো জয়-পরাজয় হতেই হবে। কারণ, নকআউট পর্ব বলে কথা। সে কোন এক দলকে বাদ পরতেই হবে। তবে, সেই দলটি কে, তা এই মুহূর্তে কোটি টাকার প্রশ্ন।
বলার অপেক্ষা রাখে না, স্বাগতিক ভারতে এবারের আসরে শুরু থেকেই উড়ছে। টানা ৯ ম্যাচ জিতে দারুণ মেজাজে রয়েছে রোহিত এন্ড কোং। আত্মবিশ্বাসও তুঙ্গে। আসরের কোন দলকেই তাদের সামনে দাঁড়াতে দেয়নি টিম ইন্ডিয়া। কি ব্যাটে, কি বলে সবক্ষেত্রেই দুর্দান্ত পারফর্ম করতে দলটির এ-টু-জেড।
অন্যদিকে, নিউজিল্যান্ডও আছে দারুণ ফর্মে। আসরে বড় বড় স্কোর গড়ার জন্য দলটিকে নিয়ে আলাদাভাবে দেখছে ক্রিকেট ওঝারা। গত আসরের ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে সুপার ওভারে শিরোপা হারানো দলটিকে তাই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তাছাড়া দলটি ভারতীয় পরিবেশের সঙ্গে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছে।

সেমিফাইনালে ভারত ফেবারিট হলেও, বুকিরা কিউইদের পেছনেও বাজি ধরতে কসুর করছেন না। সেমির প্রথম লড়াইটা যে কারো হয়ে যেতে পারে। তবে যে দলই জিতুক না কেন, বেশ কিছু ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে মুবাইয়ের আইকনিক ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে। গ্যালারির দর্শকরা অনেক কিছুরই সাক্ষী হতে যাচ্ছেন।
টি-টোয়েন্টি ও ৫০ ওভার মিলিয়ে ভারত তাদের শেষ চারটি নকআউট ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরেছে। আবার নিউজিল্যান্ড গত তিনটি ওয়ানডে বিশ্বকাপে স্বাগতিকদের কাছে হেরে আসর থেকে ছিটকে গেছে। বুধবার ওয়াংখেড়েতে এসব রেকর্ডের যে কোন একটি ভেঙে যাবে।
বলা হচ্ছে, যদি প্রথম সেমিতে যে দলটি জিততে চাইছে, সে দলটিকে সবার আগে টস জিততে হবে। সেমির উইকেট নিয়ে এখনও কোন পূর্বাভাস পাওয়া না গেলেও, ওয়াংখেড়ে সব সময়ই বড় স্কোরের জন্য খ্যাত। এ কারণে টসে জেতা জরুরি। কারণ, এই উইকেটে টসে হেরে কোন দল তেমন সুবিধা করতে পারেনি।

এই বিশ্বকাপে ওয়াংখেড়েতে প্রথমে ব্যাট করে গড় স্কোর হয়েছে ৩৫৭ এবং তাড়া করা সময় ১৮৮। তবে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের সেই দানবীয় ডাবল সেঞ্চুরিটি না হলে, রান তাড়ার গড় আরও নিচে থাকতো। এই উইকেটে আগে ব্যাট করা দল পাওয়ার প্লেতে যে সুবিধা পায়, সেটি পরে ব্যাট করা দল পায় না।
ওয়াংখেড়েতে টসে জিতে ব্যাট করতে হলে দলটিতে প্রথম ১৫ ওভারে কোন ঝুঁকি নিলে চলবে না। দেখে শুনে খেলতে হবে। হাত খুলতে হবে ১৫ ওভারের পরে। কারণ এবার দেখা গেছে, এই মাঠে লাইটের নিচে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন ব্যাটাররা। তবে এই সমীকরণে ম্যাক্সওয়েলের ইনিংসকে বিবেচনায় রাখা যাবে না।
প্রথম ১০ ওভারের পরে সুইংয়ের অস্বস্তি কেটে গেলেও ১৫তম ওভার পর্যন্ত সীম মুভমেন্টের সমস্যা থেকে যায়। ধরুণ ভারত যদি টসে হেরে যায়, তাহলে রোহিত শর্মার কাছ থেকে ভারতের উচিৎ হবে বড় স্কোর আশা করা। নিউজিল্যান্ডের টপঅর্ডারের কাছ থেকে একই প্রত্যাশা করাও সমুচিত হবে না।

২০১৯ সালের বিশ্বকাপ থেকে ভারতকে নকআউট করেছিলো নিউজিল্যান্ড। কিন্তু সে সময়ের চেয়ে ভারত এখন অনেক বেশি শক্তিশালী একটি দল। বিশেষ করে এই মুহূর্তে বিশ্বসেরা বোলিং লাইনআপ রয়েছে টিম ইন্ডিয়ার হাতে। আর ব্যাটিংয়ে আছে রোহিত, গিল, কোহলি, রাহুল ও আয়ারের মতো মারদাঙ্গা ক্রিকেটার।
ভারতের ভয়ংকর বোলিংয়ের বিরুদ্ধে নিউজিল্যান্ডের জন্য একটি সুযোগই আছে। আর সেটি হলো স্পিনার বরীন্ত্র জাদেজাকে টার্গেট করা। লিগ পর্বে জাদেজা কিউইদের বিরুদ্ধে ১০ ওভার বল করলেও একটি উইকেটও পাননি। ফলে কিউইদের বাঁ-হাতি ব্যাটাররা সেমিতেও জাদেজার ওপর চড়াও হতে পারেন।
ভারতের দলে ডান হাতি ব্যাটারদের ছড়াছড়ি, আর নিউজিল্যান্ডের দুই ওপেনার মিলিয়ে তিন থেকে চারজন বাঁ-হাতি ব্যাটার। ফলে কিউই ব্যাটারা ভারতের স্পিনের বিরুদ্ধে ভালো অবস্থানে থাকলেও, ভারতের জন্য হুমকি হতে পারেন কিউই স্পিনার মিচেল স্যান্টনার। এবারের আসরে তিনি ভালো করছেন।
মিচেল স্যান্টনারের বল আপাত দৃষ্টিতে নিরীহ মনে হতেই পারে, খুব রহস্যের কিছু নেই, খুব বড় টার্নও তিনি করান না।স্যান্টনারের মূল শক্তি লাইন লেন্থ ঠিক রাখা এবং ব্যাটারের মনে ঢুকে পড়া। এবারের বিশ্বকাপে ১৬ উইকেট নিয়েছেন স্যান্টনার যার মধ্যে ১৫ জনই ডান হাতে ব্যাট করেন।

তাই ভারতের ব্যাটাররা চেষ্টা করবেন স্যান্টনারের হাতে উইকেট না দিতে, তাকে দেখে শুনে খেলতে। ২০১৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের স্মৃতি ভারতের ক্রিকেটারদের মনে এখনও দগদগে ক্ষত হিসেবেই রয়েছে। সেই ম্যাচে ভারতের ব্যাটিংয়ের টপ অর্ডারে ভাঙ্গন ধরিয়েছিলেন ম্যাট হেনরি।
এবারের বিশ্বকাপেও ম্যাট হেনরি দারুণ শুরু করেছিলেন কিন্তু তিনি চোটের কারণে দল থেকে ছিটকে গেছেন। তার জায়গায় খেলবেন টিম সাউদি। চলতি বিশ্বকাপে টিম সাউদি বা ট্রেন্ট বোল্ট কেউই তাদের সেরাটা দিতে পারেননি। তাই ম্যাট হেনরির না থাকাটা হতাশাজনক।
অন্যদিকে, জসপ্রিত বুমরাহকে খেলা এখন যে কোনও ব্যাটারের জন্য কঠিন, বিশ্বের যে কোনও ব্যাটারই তার বলের মুখোমুখি হওয়ার আগে খানিকটা বাড়তি সতর্ক থাকবেন। এবারের বিশ্বকাপে ৯ ম্যাচ বল করেছেন তিনি ৩.৬৫ ইকোনমি রেটে। একই সাথে তিনি ৯ ম্যাচেই উইকেট পেয়েছেন।
আবার ভারতের অধিনায়ক রোহিত শর্মা প্রায় সব ম্যাচেই দলকে উড়ন্ত সূচনা এনে দেয়াতে বিরাট কোহলির মতো বিশ্বসেরা ব্যাটারদের ওপর থেকেই চাপ কমে যাচ্ছে। এ কারণে কোহলি ব্যাট হাতে প্রতিপক্ষের বলকে ইচ্ছামতো পেঠাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, তিনি আউট হতে না চাইলেও, তাকে আউট করা রীতিমতো কঠিন।
যদি টসে জিতে ভারত ব্যাটিং নেয়, তাহলে নিউজল্যান্ডের উচিৎ হবে রোহিতকে দ্রুত ফেরানো। তাহলেই তারা চাপে ফলতে পারবে কোহলিকে। সেই সঙ্গে ভারতের ডানহাতি ব্যাটারদের বিরুদ্ধে বাঁহাতি স্পিনার দিয়ে আক্রমণ শানাতে পারবে নিউজিল্যান্ড। সব মিলিয়ে নতুন এক সেমি দেখকে মুবাইয়ের ওয়াংখেড়ে।
