দরিদ্র মানুষের সামাজিক ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আয় বাড়ানোর জন্যই 'কাজের বিনিময়ে টাকা- কাবিটা' এর মতো প্রকল্পগুলো গ্রহণ করে সরকার। কঠোর নির্দেশনা থাকলেও এ প্রকল্পের কাজ চলছে মেশিন দিয়ে। শ্রমিকদের কথা বলে তুলে নেওয়া হচ্ছে বরাদ্দের টাকা। এমনকি কাজ করা হচ্ছে নির্ধারিত সময়ের পরে।
২০২০-২১ অর্থ বছরে সরকারের কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) প্রকল্পের আওতায় নাটোর সদর উপজেলায় ৭১টি প্রকল্পে প্রায় এক কোটি সাড়ে ৯৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
করোটা খাল সংস্কার প্রকল্পের সভাপতি এবং দিঘাপতিয়া ৯নং ওয়ার্ডের মেম্বার মোজাফ্ফর হোসসেন বলেন, খাল খননের কাজ শুরু হয়েছে ১ জুলাই। কাজ শুরু করার আগে দুই দফায় টাকা উত্তোলন করেছেন তিনি। কাজ শেষ করলে বাকি টাকা দেবে পিআইও অফিস। খাল কাটতে ভেকু ব্যবহার করা যাবে না এবং শ্রমিক দিয়েই খাল কাটতে হবে, এমন কথা কেউ বলেনি তাকে। অফিসের সাথে কথা বলেই ভেকু দিয়ে খাল কাটা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে নাটোর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম রমজান বলেন, কাবিটা প্রকল্পে শ্রমিকের পরিবর্তে মেশিন দিয়ে মাটি কাটার অনেক ঘটনা ঘটছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে জানিয়েও সেসব বন্ধ হচ্ছে না। শ্রমিকের বদলে মেশিন দিয়ে মাটি কাটলে তা হবে বড় ধরনের দুর্নীতি এবং সরকারের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য আয় বৃষ্টির লক্ষ্য মুখ থুবড়ে পড়বে। এমন অনিয়ম সেসব প্রকল্পে হয়েছে সেসবের বরাদ্দকৃত অর্থ ফেরত হয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।
শরিফুল ইসলাম রমজান আরও বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা এবং জেলা ত্রাণ ও পূনর্বাসন কর্মকর্তার যোগসাজশে সকলেরই চোখের সামনে জনগণের অর্থ আত্মসাৎ হচ্ছে অথচ সবাই চুপচাপ চেয়ে চেয়ে দেখছে।
এদিকে প্রকল্পের টাকায় পুকুর বা জলাশয় ভরাট করার নিষেধাজ্ঞা থাকলেও চাঁদপুর গ্রামের 'উত্তরবঙ্গ শিশু উন্নয়ণ প্রকল্প' কার্যালয়ের পাশে পুকুর ভরাট চলছে এ প্রকল্পের টাকায়। এমনকি বাইরে থেকে মাটি কিনে ফেলা হচ্ছে এখানে। খরচ এক লাখ টাকা হলেও তুলে নেয়া হয়েছে বরাদ্দের তিন লাখ ২৮ হাজার টাকা।
এই প্রকল্পের সভাপতি পলাশ বারৈ বলেন, কত টাকা বরাদ্দ তিনি জানেনই না। অফিসের লোকজন তুষার নামে এক ঠিকাদার ঠিক করে দিয়েছে। তারা মাটি দিয়ে পুকুর ভরাট করে দিচ্ছে তাতেই তারা খুশি। তিনি শুধু চেক উত্তোলন করেন আর ঠিকাদারকে সব টাকা দিয়ে দেন।
এ বিষয়ে ঠিকাদার তুষারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্প কমিটির চাহিদা অনুযায়ী ১০০ ট্রাক মাটি ফেলা হচ্ছে আর টাকা আমরা নিয়ে নিচ্ছি। কমিটির লোকেরা আরও মাটি চাইলে তিনি তা দেবেন।
আরও পড়ুন: শেখ হাসিনার পাঠানো আম পেয়ে আমি অভিভূত: মোদি
আরেক প্রকল্প চন্দ্রকলা পূর্বপাড়া কেন্দ্রীয় গোরস্থানের প্রাচীর নির্মাণ ও মাটি ভরাট কাজে দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও কমিটি ও গ্রামবাসী জানে মাত্র এক লাখ টাকার কথা।
গোরস্থান কমিটির সভাপতি বিশারদ উদ্দিন বলেন, এক লাখ টাকা বরাদ্দের কথা শুনেছেন তিনি। প্রকল্প কমিটির সভাপতি ২ নাম্বার শ্রেণির ৭ হাজার ইট দিয়েছেন যার দাম ৭০ হাজার টাকা। বাকি কাজ গ্রামবাসী চাঁদা তুলে করেছে।
প্রকল্প কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামীম হোসেন বলেন, প্রকল্প সভাপতি আনোয়ার শুধু তার সই নিয়েছেন বরাদ্দ কত বা কিভাবে খরচ হচ্ছে কোন কিছুই তার জানা নাই।
এসব অনিয়মের কথা অস্বীকার করে প্রকল্প সভাপতি আনোয়ার বলেন, দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দের কথা সবাই জানে। কাজ চলমান আছে, গোরস্থান কমিটি আরও টাকা চাইলে দেবেন তিনি।
আরও পড়ুন: জলদস্যুদের সাথে কোস্টগার্ডের গোলাগুলি, অস্ত্রসহ আটক ৩
সূত্রধরপাড়ার রাস্তা সংস্কারের কাজে বরাদ্দ দুই লাখ ৮৪ হাজার টাকা। কিন্তু প্রকল্প সভাপতি হেলেনের মেম্বার জানেনই না কিভাবে হচ্ছে সেই কাজ।
এত অনিয়মের পরও প্রকল্পের তদারকিতে নিয়োজিত নাটোর সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ওমর খৈয়াম অনিয়মের পক্ষেই সাফাই গাইছেন। তিনি বলছেন, করোনার কারণে শ্রমিক না পাওয়ায় কিছু প্রকল্পে মেশিন দিয়ে মাটি কাটা হয়েছে। তবে তারা জানতে পেরে সেসব বন্ধ করে দিয়েছে।
একাত্তর/আরবিএস
